আলোকচিত্রী কেভিন কার্টারের কথা অনেকেরই জানা। একটি হৃদয়বিদারক আলোকচিত্রের কারণে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু এর দুই মাসের মাথায় আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। ছবিটিতে দেখা যায়, দুর্ভিক্ষপীড়িত সুদানে এক মৃতপ্রায় শিশুর পেছনে একটি শকুন বসে আছে। শিশুটি মারা গেলেই শকুন তাকে খুবলে খাবে। কেভিন ছবিটি তুলেছিলেন, পুরস্কারও পেয়েছিলেন কিন্তু এ বাস্তবতা তাকে প্রতি মুহূর্ত পীড়িত করেছে। বর্তমানে আমাদের চারপাশে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা আমরা ক্যামেরাবন্দি করি। সেটি পোস্ট করি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একটু পরপর লক্ষ করি সেটা কতজন দেখল, কে কী মন্তব্য করছে। কোন ভিডিও কতবার ভিউ হলো। এখন ভিউ কম হলে আমরা পীড়িত হই কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতা আমাদের তাড়িত করে না।
সময়টা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের। সেখানেই লেখালেখি, ছবি তোলা ও পোস্ট করার হিড়িকে সেখানেই চলে প্রদর্শনী। এমনকি বছর তিনেক আগে টেলিভিশনে টক শো হতো আর এখন ফেসবুক লাইভে নানা ধরনের আলোচনা হয়। ছোট পরিসর থেকে শুরু করে বড় পরিসরেও কাজগুলো হয়ে থাকে। ফেসবুকের বাইরে ইউটিউবও এখন নানা আলোচনা ও ‘খবরের চ্যানেল’ হয়ে উঠেছে। খবর ব্যাপারটা একসময় ছিল সংবাদপত্রের এবং পরে টেলিভিশন চ্যানেল সে জায়গাটা নেয়। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের দিনগুলোয় সে জায়গা নিয়েছে ইউটিউব। আর এক্ষেত্রে সংবাদ বা খবরের বস্তুনিষ্ঠতার তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ‘ভিউ’। অর্থাৎ কনটেন্টটি কতজন দেখলেন। যত বেশি ভিউ তার মান যেন তত বেড়ে যায়। তবে পুরো বিষয়টিই ‘জনপ্রিয় ধারা’র জন্য প্রযোজ্য। সত্যি বলতে এর বাইরে বেশির ভাগ কনটেন্টেরই কোনো দাম নেই। অথচ একটা বৃহৎ শ্রেণীর জন্য এসব কনটেন্টই হয়ে উঠছে তথ্যের উৎস। এছাড়া এর পেছনে কাজ করে ব্যবসায়িক মনোভাব।
কভিড-১৯ মহামারীর সময় ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিকমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ বেশি সময় দিয়েছে। ফলে ২০২০-২১ সালে মেটার কর্ণধার মার্ক জাকারবার্গ বুঝলেন যে এখানে মানুষকে আরো বেশি টেনে আনতে পারলে তার জন্য বিষয়টি লাভজনক। ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি হলো নানা ধরনের ট্রেন্ড, নানা ধরনের গেম। এর মধ্য দিয়ে মেটা সংগ্রহ করল ব্যবহারকারীদের তথ্য। বিশ্লেষণ করল তাদের আচার-আচরণ। তারপর সে অনুসারে উন্নত হলো মেটার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। মানুষের চাহিদা অনুসারে এরপর মেটা তৈরি করেছে মার্কেটপ্লেস আর এখন একজন ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুসারে সে মেটায় নানা কনটেন্ট দেখতে পারে। এজন্য নিজেকে কোনোকিছু বলতে বা কমান্ড দিতে হয় না।
মেটার তিনটি প্লাটফর্ম—ফেসুবক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ এক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা পালন করে। আর মার্কেটপ্লেস মূলত তৈরি হয়েছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে। এর মধ্যেই মেটা নিয়ে এসেছে প্রফেশনাল মোড। এটি ব্যবহারের মাধ্যমে একজন সাধারণ ব্যবহারকারীও কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে একজন পেশাদারি গ্রাহক হতে পারবেন এবং তার পোস্ট করা কনটেন্টের মাধ্যমে মেটা থেকে আয় করার সুযোগ তৈরি হবে। মেটার এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে এর ভোক্তাদের আরো সহজে যুক্ত করা এবং বেশি সময় ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারীদের একটা সাধারণ মানসিক ধারা হলো, তারা তাদের পোস্ট যত বেশিসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে চান। এটা মূলত মানুষ জাতিরই একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি আর সেটিকে মাদকের মতো ব্যবহার করছে সামাজিকমাধ্যমগুলো। মেটার আগে একই ধারায় কাজ শুরু করেছিল ইউটিউব।
ইউটিউব একটা সময় সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য ছিল গান শোনা ও সিনেমা দেখার মাধ্যম। পৃথিবীর নানা অঞ্চলের নানা ভিডিও যুক্ত করা হয়েছে এতে। এখানে গান যেমন শোনা যায়, ফিজিক্সের নানা জটিল তত্ত্বও বিশ্লেষণ করে অনেকে আপলোড করে থাকেন। এসব দেখে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হন। কিন্তু নানা ধরনের ভিডিও যুক্ত করার কারণে মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়ার সুযোগ আছে এখানে। একটি কৌতুক প্রচলিত আছে যে একজন ছাত্র কোনো একটা জটিল বিষয় বোঝার জন্য ইউটিউবে ঢুকল। দেড় ঘণ্টা পর সে ‘কীভাবে জিরাফের সঙ্গে কথা বলা যায়’ শিরোনামের একটি ভিডিও দেখছে। মনোযোগ সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি ইউটিউব কত বিচিত্র ধরনের ভিডিও রাখে তার উদাহরণ হিসেবে এ কৌতুককে উপস্থাপন করা যায়। এখন কথা হলো, ইউটিউবে একজন তার গুগল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ভিডিও আপলোড করতেই পারে। কিন্তু তা তো সবাই দেখবে না। এ কারণে প্রত্যেক ব্যক্তি চেষ্টা করবে তার ভিডিওকে অনন্য করে তুলতে। এটা স্বাভাবিক, কিন্তু ইউটিউব যখন থেকে এসব কনটেন্টের ভিউ দেখে টাকা দেয়া শুরু করল তখন থেকে প্রতিযোগিতা বেড়ে গেল। এখন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এমন ভিডিও তৈরি করে বা করতে চায় যার জন্য তারা ভালো-মন্দ বিবেচনা করে না।
ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের একটি সাধারণ প্রবৃত্তি হলো, কোথাও কিছু ঘটলে তা দাঁড়িয়ে দেখা। রাজধানী ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে বছর পাঁচেক আগেও কোনো ক্যানভাসার পাণ্ডা কি হারগিলার তেল বিক্রি করছে দেখলেও অনেক মানুষ জমে যেত। এখন সেই দিন বা সেই প্রবণতা কমে যাচ্ছে। এখন কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটলে সেটিকে কেন্দ্র করে মানুষ জড়ো হওয়ার ঘটনা দেখা যায়। আগে মানুষ কেবল নিজে দেখত, এখন সে দৃশ্যধারণ করে। হাতে একটা স্মার্টফোন থাকার কারণে কাজটা সহজ হয়ে গেছে। কোনো কিছু দেখলেই সেটা ধারণ করার ইচ্ছা জাগে। তারপর সেটা পোস্ট হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এক্ষেত্রে ঘটনা আরো বড় হলে তো কথাই নেই।
সম্প্রতি কয়েকটি স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা আমাদের আলোড়িত ও চিন্তিত করেছে। কিন্তু বিস্ফোরণের স্থানগুলোয় দেখা গেছে মানুষ দাঁড়িয়ে তাদের সেলফোন নিয়ে ব্যস্ত। সবাই ছবি তুলতে চায়। সবাই ভিডিও করতে চায় এবং তারপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে পোস্ট। কেউ কেউ আবার ফোন হাতেই হয়ে যান সাংবাদিক। রিপোর্ট করার মতো ফেসবুকে শুরু করেন লাইভ। ঘটনার ভয়াবহতা তাদের মাথায় কাজ করে না কিংবা তারা চান সবার আগে বিষয়টি নিজের অ্যাকাউন্টে আপলোড করতে। ফলে তৈরি হয় অযথা ভিড় আর সে কারণে ব্যাহত হয় উদ্ধারকাজ। এমন অনেক সময়েই ঘটেছে যে মানুষের ভিড়ের কারণে সেখানে দমকলের পৌঁছতে দেরি হয়েছে।
এ ঘটনা প্রথম দেখা যায় বনানী অগ্নিকাণ্ডের (২০১৯) সময়। সেখানে বহু মানুষ জড়ো হয়েছিল এবং তাদের অন্যতম একটা কাজ ছিল স্মার্টফোনে ভিডিও ধারণ করা। চট্টগ্রামে বিস্ফোরণের ঘটনায়ও একটি ফেসবুক লাইভের অংশ ভাইরাল হয়, যার শেষাংশে দেখা যায় পুনর্বার বিস্ফোরণে ভিডিও ধারণকারীও আক্রান্ত হন। অকুস্থলে থাকার কারণে ওই ব্যক্তির করা ভিডিও একটি দলিল হিসেবে কার্যকর কিন্তু বাইরে থেকে এসে ভিডিও করার একটি অন্যতম কারণ ভিউ। এখন নানা ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে এ ধরনের ভিডিও পোস্ট করে অল্প সময়ে ভিউ ও লাইক কামানোর প্রবণতা দেখা যায়। কেননা যত বেশি ভিউ তত বেশি অর্থ রোজগার করা যাবে। উদ্ধার কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করার কোনো চেষ্টা এদের মধ্যে দেখা যায় না।
সাভারে রানা প্লাজার ঘটনা এখনো দগদগে হয়ে আছে অনেকেরই মনে। ২০১৩ সালে ট্র্যাজেডিটি ঘটেছিল। তবে এ ঘটনা আরো একটি কারণে স্মরণীয়। সে সময় উদ্ধারকারী ফায়ার সার্ভিস টিম, সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় বহু মানুষ অংশ নিয়েছিল। উদ্ধারকারীদের তরফে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ প্রশংসিত হয়েছিল। ১০ বছর আগে আমাদের হাতে এখনকার মতো এত স্মার্টফোন ছিল না। তাই ভিডিও ধারণেরও সুযোগ ছিল না। স্মার্টফোন সহজলভ্য হওয়াকে ভিডিও ধারণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার একমাত্র কারণ হিসেবে উল্লেখ করলে ভুল হবে। তবে এখন এই যে সহানুভূতি কমে কেবল ভিউ বাড়ানোর চেষ্টা, তার পেছনে অন্যতম কারণ ভিউ থেকে টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা। এর বাইরে জনপ্রিয় হওয়ার বাসনাও কাজ করে।
কভিড-১৯ চলাকালীন একটা চর্চা শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন গানের সঙ্গে নেচে বা গান নিজে গেয়ে সেটি ভিডিও করে আপলোড করা। এ নিয়ে তৈরি হয়েছিল বিশেষ কিছু ফেসবুক গ্রুপ। সেখানে নানা ধরনের প্রশংসা ও উৎসাহ থেকে বিষয়টি আরো বাড়তে থাকে। ফলে অনেকে বড় পরিসরে এ কাজ করার জন্য বেছে নেন ইউটিউব। কারো কারো নিজস্ব ফেসবুক পেজ খোলাও বাকি থাকেনি। সমস্যা হলো কভিড-১৯ শেষে। দেখা গেল একই ধারার ‘গান কভার’, ‘ডান্স কভার’ দিয়ে ভিউ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তারা নতুন নতুন কনটেন্টের খোঁজ শুরু করলেন। এখন তাই দুর্ঘটনাও একটা কনটেন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখা শুরু হয়েছিল কেভিন কার্টারকে দিয়ে। শেষ করা যাক ‘নাপাম গার্ল’ দিয়ে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে বোমার কবলে পড়েছিল বহু মানুষ। এ সময় একটি মেয়ের গায়ে আগুন ধরে যায় এবং সে নগ্ন হয়ে দৌড়াতে শুরু করে। সে ছবি তুলেছিলেন নিক উথ। ছবিটির ৫০ বছর পূর্তিতে তিনিও এ নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ করেছেন। কার্টার বা উথের আক্ষেপের মূল জায়গাটা সহানুভূতির। তাদের উভয়ের ছবিই ছবি হিসেবে যেমন ছিল ভালো তেমনি এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল সচেতনতা। আর মনে রাখা দরকার, তারা ছিলেন সামান্য কয়েকজন মানুষ যাদের কাজই ছিল দুর্ভিক্ষ যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরার। কিন্তু এখন দল বেঁধে ভিউ বাড়াতে গেলে সেখানে কেবল সমস্যাই তৈরি হবে। একবিংশ শতাব্দীতে জীবনযাপনের কঠোরতার কারণে মানুষের সহমর্মিতা এমনিই কমে যাচ্ছে। দুর্ঘটনায় মানুষের সাহায্যে না গিয়ে সেটাকে নিজের লাভের বাহন করা এর একটি দৃষ্টান্ত। এভাবে চললে বিশৃঙ্খলা চূড়ান্তে পৌঁছতে বেশি সময় লাগবে না। ভিউ বাড়ানোর চর্চা না করে তাই সহমর্মিতা বাড়ানোর চর্চা জরুরি।
মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক










