জ্বালানি হলো অর্থনীতির চালিকাশক্তি। জ্বালানি খাতকে সেবা খাত হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে দেশের সাধারণ মানুষ লাভবান হবে। এর মাধ্যমে তাদের জীবনমান বাড়বে। অর্থনীতিও সচল হবে। কিন্তু বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের বাণিজ্যিকীকরণের ফলে মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে। এদিকে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েই চলেছে সরকার। ডলার সংকট, জ্বালানি ঘাটতি ও রক্ষণাবেক্ষণকাজের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার একটি বিপুল অংশ অব্যবহৃত থাকায় লোডশেডিং বাড়ছে। বিদ্যুৎ আমদানি করেও লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ আমদানিতেও বাড়ছে ব্যয়। বসিয়ে রাখা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ না কিনলেও নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ। দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। চাহিদার অনুপাতে উৎপাদনও বাড়াতে হবে। এত ব্যয় করে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরও বিদ্যুৎ আমদানি করা খুবই দুঃখজনক। তাহলে দেশে এত অর্থ ব্যয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়িয়ে লাভ হলো কী? 

বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নের প্রধান বাধা সরকারের নীতি-পরিকল্পনায় বড় ধরনের বিভ্রান্তি। সরকার ভোক্তার স্বার্থ না দেখে প্রতিযোগিতাবিহীন বিনিয়োগে উন্নয়ন করে এবং গণশুনানি ছাড়া মূল্যহার বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যবসায়িক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ কারণেই আর্থিক ও বিদ্যুৎ উভয় সংকটই তৈরি হয়েছে। বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম চড়া, সেই মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। মানুষের আয় বাড়েনি। এখন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষি ও শিল্পপণ্যের দাম বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বাড়বে। বিদেশীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চেয়েও জরুরি হলো সহায়ক নীতি এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় ১০-২০ শতাংশ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাই যথেষ্ট। এর বেশি সক্ষমতা মানে বিপুল আর্থিক বোঝা। কাগজে-কলমে যে সক্ষমতা এখন আছে সেটা অনেক বেশি। আরো বেশি হলে কীভাবে অ্যাফোর্ড করা হবে তা বোধগম্য নয়। এর ফলে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাড়বে। পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যেমন বিদ্যুৎ নিতে না পারলেও ৫ হাজার কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ দিতে হয়েছে। ভারতের আদানিকেও মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হবে।

সক্ষমতা থাকার পরও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারাটা সরকারের কাঠামোগত সমস্যা হিসেবেই দেখছেন অনেকে। তারা বলছেন, বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিই যদি করতে হবে, তাহলে এত ব্যয় করে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলো কেন? আমদানি করতে হলে বাংলাদেশের প্রথমে দামি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করা উচিত। কারণ এগুলো বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে চাইলেও সব বিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। 

দেশে ২০২৩ সালের জুন নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ২৪ হাজার ৯১১ মেগাওয়াট। ওই অর্থবছরে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট। পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত ২০ হাজার ৪১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা উন্নয়ন হবে এবং গ্রিডে আসবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি পরিকল্পনাধীন রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বিদ্যুৎ বাজার উন্নয়নে সহযোগিতা দিচ্ছে। বর্তমানে আমদানি হয় ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট। ধারণা করা যায়, পরিকল্পনামাফিক বিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানো হলে অচিরেই অফপিক পিরিয়ডে চাহিদা পূরণে আর বিদ্যুৎ উৎপাদন করার প্রয়োজন হবে না। সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা আর ব্যবহার হবে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ানো নিয়ন্ত্রণহীন এবং মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন কমিয়ে আর্থিক ঘাটতি মোকাবেলা করা হবে। এতে জনগণের দুর্ভোগ বাড়বে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ২ এপ্রিলের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে ১৩ হাজার ৭০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ৭১ মেগাওয়াট। আর ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৬৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর মধ্যে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ১০ মেগাওয়াট, ভেড়ামারা (এইচভিডিসি) কেন্দ্র থেকে ৪৯০ মেগাওয়াট ও ত্রিপুরা থেকে ১৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়েছে।

সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে—এমন পরিকল্পনা থেকে দেশে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল অন্তত ডজনখানেক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ততই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক এসব প্রকল্প। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম বেশি থাকায় বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন খরচ বেশি হচ্ছে। তবে প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এখনো সাশ্রয়ী মূল্যে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভারতে কয়লা থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ৫-৮ টাকা, চীনে এ ব্যয় ৪-৬ এবং পাকিস্তানে ১০-১২ টাকা। বাংলাদেশের বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করতে বর্তমানে ইউনিটপ্রতি ১৪-১৫ টাকা পড়ছে। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। আগামীতে এ ব্যয় খুব বেশি তারতম্য হওয়ার সুযোগ নেই।

জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকুচিত করছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বেশি সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করা যায়। বিএনইএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানি গ্যাস ও কয়লা বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ যে পরিমাণ দাঁড়াবে তার চেয়ে সৌরবিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ বাংলাদেশে কম হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে বের হওয়ার উপায় থাকলেও সে পথে এগোচ্ছে না সরকার। পরিকল্পনামাফিক সৌরবিদ্যুৎ উন্নয়ন হলে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক গ্রিড বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে এবং জ্বালানি আমদানি ব্যয় হ্রাসে এ বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেক্ষেত্রে অব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ায় বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয় বাড়বে। তাই জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। 

সরকার বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক উন্নয়নের কথা বললেও প্রকৃত অর্থে বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন ঘটেনি। বরং বিশাল বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। অযৌক্তিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনও এখন কম করা হচ্ছে। বাস্তবে দেখা যায়, সক্ষমতা উন্নয়নে যথাযথ মান রক্ষা না হওয়ায় চাহিদার তুলনায় উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের ক্ষমতা পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। এতে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

দেশে একটা সময়ে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল না। এখন সক্ষমতা রয়েছে কিন্তু জ্বালানির অভাবে উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কারণ নিজস্ব জ্বালানি গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে গুরুত্ব কম দেয়া হয়েছে। এর আগে গ্যাস ও কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ ছিল। আর এখন যন্ত্রপাতি থাকলেও গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ কম। ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়ছে। 

তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিশেষত রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের কারণে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনার কারণে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে ২০১১-১২ সালের দিকে বলা হয়েছিল, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু হলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমে আসবে। যদিও সেই পরিকল্পনা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা যায়নি। অন্যদিকে চুক্তি নবায়ন করে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং চালু না থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। 

বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে হলে দেশীয় জ্বালানি সম্পদ উত্তোলন এবং অনুসন্ধানে তৎপরতা বাড়াতে হবে। দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ কমছে এবং এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা আরো বাড়ছে এবং সামনে আরো বাড়বে। সুতরাং এটাকে কমিয়ে আনতে হলে দেশীয় জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমাতে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে জ্বালানি বহুমুখীকরণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে নজর দিতে হবে।