চব্বিশের অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়েছে। ওই সময়ে যেমন বাংলাদেশ প্রত্যাশিত ছিল তার কতটা অর্জিত হলো? এমনকি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে জুলাইয়ের পর কিছু ঝুঁকিও ছিল। দুই বছর পর জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন বলে মনে করছেন?
জুলাই অভ্যুত্থানের পর একটি দিক সফলকাম হয়েছে। মোটামুটি নিরপেক্ষ একটি জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সংসদে সরকার ও বিরোধী দল তাদের মতামত রাখছে। অতীতে নির্বাচনের পরপরই হরতাল কিংবা বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির এক ধরনের হুমকি পাওয়া যেত। বর্তমানে এমনটি নেই। সমঝোতার ভিত্তিতে সরকারি ও বিরোধী দল গণতন্ত্র চর্চা করছে। এটি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য যেমন ভালো তেমনি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়।
আর ঝুঁকির বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেকগুলো বিষয় আসবে। ক’দিন আগেই বণিক বার্তা জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে একটি কনক্লেভের আয়োজন করে। এটি একটি বিষয়। এছাড়া ভূরাজনীতিসহ আরো অনেক বিষয় রয়েছে। সরকার ও সাধারণ মানুষকে এগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং আস্তে আস্তে সমাধান করতে হবে। এগুলো রাতারাতি সমাধানের অবকাশ নেই, বরং ঝুঁকি রয়েছে।
হেনরি কিসিঞ্জার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদটিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করেছিলেন। আপনিও বাংলাদেশে এ পদটির গুরুত্ব নিয়ে লেখালেখি শুরু করা প্রথম দিককার একাডেমিকদের একজন। কেন আপনার মনে হয় এ পদ দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আমি ভাবছিলাম, কীভাবে জাতিকে নতুন কিছু দেয়া যায়। তখনই অজিত দোভালের কথা মাথায় চলে এসেছিল। ওই সময় তার কথাই বেশি হতো। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হতো। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার নামটাও উচ্চারিত হতো। আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য এমন মানুষই দরকার। সেটার জন্য আগে পদ তৈরি করতে হবে। এদিক বিবেচনা করেই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদ তৈরির কথা ভেবেছিলাম। এ নিয়ে লেখালেখি করেছিলাম। তখন পরিচিত সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, এ পদবি সামরিক বাহিনীর কাউকে দিয়ে পূরণ করাই তো উচিত। আমি এভাবে ভাবার পক্ষে নই। সামরিক বাহিনী থেকেও হতে পারে, এর বাইরেও হতে পারে। পাকিস্তান ও আরব আমিরাতের মতো অনেক দেশে এ পদে সিভিলিয়ান কেউই ছিলেন। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সামরিক বাহিনী থেকে নিযুক্ত হতে পারেন। কিন্তু নিরাপত্তা উপদেষ্টার ক্ষেত্রে এটা শর্ত হওয়া ঠিক হবে না। এরপর পত্রিকায় লিখেছি, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আর নিরাপত্তা উপদেষ্টা এক নয়।
দেশের প্রথম জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। তার দু-একটি অর্জনের মধ্যে কোনটিকে ভালো বলা যায়? তাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উপদেষ্টা আর বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি। সর্বশেষ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হয়েছেন। সেক্ষেত্রে তার পদের মূল্যায়ন কীভাবে হবে? জাতিসংঘে তার সভাপতিত্ব আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন। আবার একজন কূটনীতিক হিসেবে তিনি প্রথম সারির। বিশেষত রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টাই করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তেমন সফলতার সুযোগ পেয়েছেন কিনা সেটি প্রশ্নবিদ্ধ। কাজ করারই বা কতটা সুযোগ পেয়েছেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশ সফর করেন। ড. ইউনূসও বলেছিলেন রোহিঙ্গারা পরের ঈদ নিজের দেশে গিয়ে করবেন। এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি ছিলেন ড. খলিলুর রহমান। কয়েকটি ঈদ চলে গেল। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আমরা সফল হলাম না কেন?
ওই সময় ড. ইউনূসের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিলাম। চট্টগ্রামের ভাষায় তিনি যখন রোহিঙ্গাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন তখন ব্যক্তিগতভাবে আমার দ্বিমত শুরু থেকেই ছিল। অনেকগুলো বিষয়েই ছিল। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলাম, এটা সম্ভব না। চীনকে বাদ দিয়ে এ ইস্যুর সমাধান হবে বলে মনে হয়নি। এখানে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ সমস্যা সমাধানে চীনের সহযোগিতায় মিয়ানমারকে বোঝাতে হবে। আবার এটাও সত্য, আমরা যা-ই করি না কেন তা যুক্তরাষ্ট্র জানে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের সহযোগিতা আমরা নেব। তবে যুক্তরাষ্ট্রকেও জানাব। বাংলাদেশের মঙ্গলের জন্যই তা করতে হবে।
ওই সময় আরাকান বা রাখাইনের সঙ্গে করিডোর তৈরির আলাপ ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। এ উদ্যোগ এগোল না কেন?
আমি যেভাবে দেখি, এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পরিকল্পনা হয়তো যুক্ত ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমেই তা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রেখেছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যেকোনো ধরনের সংঘাত এড়াতে তারা ভূমিকা রেখেছে। আমাদের তরফে সংঘাতের উসকানি দিলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীও পাল্টা জবাব দিত। আর সংঘাত বাঁধলে একসময় চীনের হস্তক্ষেপ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ত। তখন তারা মিয়ানমারেরই পক্ষ নিত। কারণ মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। যেমন তারা সবসময় উত্তর কোরিয়ার পক্ষে থাকে। উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে চলে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ পাবে—এটি চীনের নিরাপত্তার জন্য একটি ঝুঁকি। তাই মিয়ানমারের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও চিড় ধরতে পারত।
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের তিনদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি করে। এত তড়িঘড়ি করে কেন এ চুক্তি করতে হলো? অনেকেই এ চুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। আপনি এটিকে কীভাবে দেখছেন? বিশেষত প্রতিরক্ষা চুক্তিটি?
আমি প্রথম থেকেই এটিকে বাড়াবাড়ি বলে আসছি। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল চুক্তিটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্বে ছেড়ে দেয়া। দেশের স্বার্থ বিবেচনা করলে এমনটি করা ঠিক নয়। হতে পারে কোনো শর্তের অংশ হিসেবে তারা বাধ্য হয়ে এ চুক্তি করেছেন। আমি শুরুতেই বলেছি, এ চুক্তি নির্বাচিত সরকারকে বেকায়দায় ফেলবে। এ সুযোগে সমাধানটাও বলে নিতে চাই। সরকার যদি চায় তাহলে এখনো চুক্তির বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারবে। বিরোধী দলেরও এখানে ভূমিকা আছে। তারা যদি এ চুক্তির স্পষ্ট রিভিউ দাবি করে তাহলে জনগণেরও সমর্থন পাবে। আর সরকারেরও চুক্তির বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার সদিচ্ছা আছে। সরকারের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকায় একা হয়তো কিছু করতে পারছে না। কিন্তু বিরোধী দল এমনকি সাধারণ মানুষ দাবি তুললে তারা দরকষাকষির একটা সুযোগ পাবে। যুক্তরাষ্ট্রও অভ্যন্তরীণ চাপের বিষয়টি বুঝতে পারবে। এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সংবেদনশীল। তাই তারা চুক্তি পর্যালোচনা করবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র দেখছে সবই ঠিক আছে। এজন্য আমি তাদের পক্ষকে সমালোচনা করি না। কারণ আমাদের দিয়ে তারা নিজ স্বার্থ ঠিকভাবে আদায় করে নিচ্ছে। কূটনীতিতে এখন আমাদের এমন প্রতিনিধি প্রয়োজন যিনি দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের মধ্যে সাম্য আনতে পারবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এমন দক্ষ কূটনীতিকের অভাবই আমাদের ভোগাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া গেলেন। সেখানে উষ্ণ সংবর্ধনা পেলেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ সফরের মাধ্যমে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সম্ভাবনা কেমন?
আসিয়ানভুক্ত দেশ যেমন ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় বাণিজ্য সম্ভাবনা অনেক। এসব দেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণের দিকে আমাদের এগোতে হবে। আমাদের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিপর্ব চলছে। এলডিসি উত্তরণ সরকার তিন বছর পেছানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৯ সালে আমরা আর কোনো অজুহাতে গ্র্যাজুয়েশন আটকাতে পারব না। এ প্রস্তুতিপর্বে আমাদের সামনে অপার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ ব্যবসায় মহলকেও এখানে বিনিয়োগ আকর্ষণে উদ্যোগী হতে হবে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাড়ানো দরকার। শুধু আলোচনা করলে হবে না। এলডিসি উত্তরণের পর আমাদের অনেকগুলো সমস্যা দেখা দেবে। তার চাপ কমাতে হলেও যতগুলো সম্ভব মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে ফেলতে হবে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলাপ করেছেন। চীন সফরেও হয়েছে। আসিয়ান ও চীনের সঙ্গে আরো ভালো সমঝোতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য কীভাবে এগোনো জরুরি?
রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়া উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। দেশটি অনেক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়াও দিয়েছে। তারা তাদের ভূমিকা রেখেছে। এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমার—এ তিন দেশকে সমন্বিতভাবে সমাধান করতে হবে। বাকিদের তো এখানে কোনো লাভ নেই। তবে ইকোনমিক করিডোর হলে মালয়েশিয়া এগিয়ে আসতে পারে। শুধু রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে বলে মনে করি না।
রোহিঙ্গা সংকট এখন আর ভূ-আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক সংকটও। নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসের মতো জটিল সমস্যাও এর সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এ ইস্যুকে আমরা এখনো বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে রাখছি। এর নিরসনে আমাদের কৌশলগত ও কূটনৈতিক দুর্বলতা কোথায়?
কূটনৈতিক মহলে প্রচেষ্টার ঘাটতি নেই। তবে যেমনটি বলেছি, এটাকে এখনো বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বরং বৈশ্বিক আলোচনার বিষয় হিসেবে দেখা যায়। বৈশ্বিক সংকটে অনেক অংশীজনের স্বার্থ জড়িত থাকে। সব অংশীজনের স্বার্থ যখন এক হবে তখন বিষয়টা বড় বলে বিবেচিত হতে পারে। আপাতত এটাকে অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবেই দেখছি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কারণে আমরা বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও জাতিসংঘ থেকে অনুদান পাচ্ছি। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেয়ার জন্য আমরা সহযোগিতা পাচ্ছি। কিন্তু মূল সমস্যা সমাধানের জন্য মিয়ানমারকে বোঝাতে হবে। তা করতে হবে চীনের সহযোগিতা নিয়ে।
মালয়েশিয়ার পর প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করলেন। চীন সরকার অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছে। এটাকে আমরা ব্যবহার করতে পারি। অর্থনৈতিক আঙ্গিক থেকে বলছি না। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের আঙ্গিকে বিবেচনা করছি। চীন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে করিডোর হয়ে গেলে কাজটা সম্ভব। কারণ এ করিডোরের প্রস্তাবে বাংলাদেশ রাজি হলে মিয়ানমার একটি বড় অংশীদার। ওই সময় দেশটির সঙ্গে প্রচুর আলোচনা হবে। এভাবে অনেকটা এগোনো যাবে। চীন তো করিডোরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। তখন তারা মিয়ানমারকে বোঝাবে যে এ সুবিধা যেহেতু আমরা পাচ্ছি তোমরা রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান করো।
জুলাইয়ে অভ্যুত্থানের প্রাথমিক সূচনা তরুণদের কর্মসংস্থানের দাবির মাধ্যমে। দেশে বিপুল জনসংখ্যার বড় একটি অংশই বেকার। বাজারে পর্যাপ্ত চাকরি নেই। আপনি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিল্পসংযুক্ত করার ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি কোথায়? আন্তর্জাতিক বাজারের দক্ষতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ জনসম্পদ গড়তে পারছি না কেন?
দুটো বিষয়। প্রথমত দেশে গবেষণার অভাব। এখানে অর্থায়নের চেয়ে ইচ্ছের অভাবটাই বড়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বন্ধু এবং আমার অনেক ছাত্র রয়েছে যারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত। তাদের মধ্যে অনেকেই ভাবেন নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের অংশ হতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসবেন। এজন্যই তারা রাজনৈতিক দলে সময় দেন বেশি। এদের একটি বড় অংশ শিক্ষাদানে সত্যিই আন্তরিক। আমি নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮ বছর ছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা বলে, নিজ আগ্রহে গবেষণা শুরু করতে হবে। একসময় গবেষণা অনুদান বরাদ্দ আসবেই।
দ্বিতীয়টি হলো গবেষণালব্ধ জ্ঞানটি শিক্ষার্থীদের এমনভাবে দিতে হবে যাতে তারা সত্যিই কর্মমুখী হতে পারেন। বেকারত্ব আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। যে সরকারই আসুক না কেন, বেকারত্ব তাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসবে। ক্ষমতাচ্যুত সরকার এ ধাক্কায় সরেছে। বর্তমান সরকারকে বিষয়টি বুঝতে হবে। কর্মসংস্থানের দাবিতে এমন অস্থিতিশীল পরিবেশ যেন তৈরি না হয় সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে।
শিক্ষার্থীদেরও এখানে কিছু দায় নিতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের অবদানকে আমরা প্রশংসা করছি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মব কালচার যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সেটিকে প্রতিহত করার জন্য তাদের ভূমিকা নিতে হবে। একটি সম্মানজনক ও সংহতিপূর্ণ পরিবেশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়তে হবে। তাতে জ্ঞানের আদান-প্রদান সহজ হবে।
মোটা দাগে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের কয়েকটি সমস্যার কথা যদি বলতেন?
শিক্ষা খাতের প্রধান সমস্যা পাঠ্যক্রম। শিক্ষকরা পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ বিষয় পড়াচ্ছেন। শুধু পাঠ্যপুস্তকে পাঠদান সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব ও ব্যবহারিক বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসতে হবে। আমি ভূরাজনীতি পড়াই। ইউটিউব ব্যবহার করে ইরান, ইসরায়েল, গাজা, সুদান, ইউক্রেন এমনকি রাশিয়ার উদাহরণও দেখাতে পারছি। যখন শিক্ষার্থীরা নিজ চোখে এসব দেখতে পায় তখন শেখাটা সহজ হয়ে যায়। ওয়ান ওয়ে পাঠদান এড়াতে হবে। যখন শিক্ষক-শিক্ষার্থী মাধ্যমে পাঠদান হবে তখন শিক্ষার্থীরা বিতর্কের সুযোগ পাবে। পড়ার মাঝেই বিতর্কের সুযোগ দিতে হবে। এভাবে মেধার চর্চা হবে। শিক্ষার্থীরা আসলেই পড়া বুঝতে পারছে কিনা তা নিশ্চিত হতে পারবেন শিক্ষক। শিক্ষকদের ভালো মানের গবেষণাতেও আগ্রহী হতে হবে।
গুগল স্কলারে শিক্ষকদের সাইটেশন আছে কিনা এর তাগাদা রাখতে হবে। ইউরোপে এখন থ্রি পেপারস পিএইচডি বলা হয়। যতদিন পর্যন্ত তিনটি পেপার প্রকাশ হবে না অথবা প্রকাশের জন্য স্বীকৃতি পাবে না ততদিন থিসিস ডিফেন্স দিতে পারবেন না। এ ধরনের সংস্কৃতি আমরা তৈরি করতে পারি। তাহলে দেশে ভিসির শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে এত তর্ক হওয়ার সুযোগ থাকবে না। এটা বলে নেয়া ভালো, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ দিলেই প্রসঙ্গটি আসে। যদিও অনেকেই যোগ্য। তাছাড়া শিক্ষক নিজে গবেষণার যন্ত্রণার মাঝে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাও উচ্চ পর্যায়ে যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে। সেখানে শিক্ষকদের গবেষণার তথ্য থাকে। শিক্ষকদের প্রোফাইলে তাদের প্রকাশনার তালিকা হালনাগাদ করতে বলা উচিত। শিক্ষকরা যেন তাদের প্রকাশিত গবেষণাপত্র বাড়ান সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে বাড়তি চাপ দিতে হবে। উৎসাহ ও প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। এটিও একটি বিপ্লব। জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিপ্লব। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছেন অর্থাৎ উপাচার্যদের এ বিপ্লবের শুরু করতে হবে।










