২০২৪ সালের জুলাইয়ের ‘গণ-অভ্যুত্থানের’ একটি দলিল হিসেবে জুলাই ঘোষণাপত্র সাব্যস্ত হয়েছে। ২৮টি অনুচ্ছেদসংবলিত এ ঘোষণাপত্র একটি ‘ঐতিহাসিক দলিল’ হয়ে থাকবে। ২৭ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ ঘোষণাপত্রকে আগামী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে সন্নিবেশিত করা হবে। একই অনুচ্ছেদে জুলাই ‘গণ-অভ্যুত্থান’কে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়। ২৮ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘৫ আগস্ট ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে বিজয়ী বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে এ ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হলো।’ এখানে প্রশ্ন হলো, এ ঘোষণাপত্রে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন কতটুকু হয়েছে? আমরা কি এ ঘোষণাপত্রকে জন-আকাঙ্ক্ষার দলিল হিসেবে দেখতে পারি?

২০২৪ সালের এ যুগান্তকারী ঘটনাকে যখন ‘জুলাই-বিপ্লবের’ বদলে ‘জুলাই-গণঅভ্যুত্থান’ নাম দেয়া হয়, তখনই প্রশ্ন দেখা দেয়—সরকার কি জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলক হিসেবে এ ঘোষণাপত্রকে দেখতে চায়? বিপ্লব মানেই যদি হয় সব অব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তন, তাহলে ‘বিপ্লব’ বলতে অসুবিধা কোথায়? এর মানে কি সব অব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তনে সরকার আগ্রহী নয়? ২১ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের ফ্যাসিবাদবিরোধী তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের অভিপ্রায় প্রকাশিত হয়।’ সত্যিকার অর্থে যদি ফ্যাসিবাদ, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের অভিপ্রায় থাকে, তাহলে বিপ্লব বলতে অসুবিধা কোথায়? ‘জুলাই-বিপ্লব’ না বলার মধ্য দিয়ে পুরনো ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার লুক্কায়িত অভিপ্রায় আছে কিনা এ প্রশ্ন অবান্তর নয়। সব ব্যবস্থাকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করার দৃপ্ত শপথই বিপ্লবী চেতনা। সব প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিমুক্ত করার ইচ্ছাটাই বিপ্লবী প্রয়াস। অথচ জুলাইকে বিপ্লব শব্দ থেকে মুক্ত করার মধ্য দিয়ে এ ঘোষণাপত্রকে সাধারণ এক ঘোষণাপত্রে রূপান্তর করা হয়েছে। ১৬ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ছাত্র-জনতার উত্তাল গণবিক্ষোভ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।’ ১৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এটি ‘জনগণের গণতান্ত্রিক লড়াই।’ কোনো অনুচ্ছেদেই এ লড়াইকে বিপ্লবী বলা হয়নি। এই ‘না বলাটা’ সুপরিকল্পিত ও ইচ্ছাকৃত। গণবিক্ষোভ যদি গণ-ভ্যুত্থানে রূপ নিতে পারে, গণ-অভ্যুত্থান কেন বিপ্লবে রূপ নিতে পারবে না? এটা কেন শুধু ‘গণতান্ত্রিক’ লড়াই হিসেবে থাকবে? এর মানে পাশ্চাত্যের নিওলিবারালিজম ধারণার মধ্যে আটকে থাকার অভিপ্রায় প্রকাশিত হয়েছে এ ঘোষণাপত্রে। মনে রাখা দরকার, অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক লড়াই হয় না, অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে বিপ্লব হয়। অথচ নিছক গণতান্ত্রিক লড়াই বলে যে ভাষা ব্যক্ত হয়েছে তাতে এ আন্দোলনকে নিয়মতান্ত্রিক সাধারণ আন্দোলনে রূপ দেয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে এমন ভাষা প্রয়োগ পশ্চিমা ভাবাদর্শকে লালন করার নামান্তর। শুধু গণতান্ত্রিক লড়াই নামে প্রচার করা হলে চলমান ব্যবস্থাকে কোনো প্রশ্ন করা হয় না। এতে পুঁজিবাদী শোষণমূলক বৈশ্বিক পদ্ধতির মধ্যে এ দেশকে আটকে রাখা হয়। এ থেকে বেরিয়ে আসার কোনা অভিপ্রায় লক্ষ করা যায় না।

ঘোষণাপত্রের ১২ অনুচ্ছেদে বিদেশী রাষ্ট্রের অন্যায়, প্রভুত্ব, শোষণ ও খবরদারিত্বের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষের ন্যায়সংগত আন্দোলনকে সমর্থন দেয়া হয়েছে এবং নিষ্ঠুর শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে এমন আন্দোলন দমনের তৎকালীন উদ্যোগকে নিন্দা করা হয়েছে। ৬ নং অনুচ্ছেদে ‘দেশী-বিদেশী চক্রান্তে সরকার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত’ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তা সত্য হলেও দেশী-বিদেশী চক্রান্তের দিক খুবই ক্ষুদ্র আকারে প্রকাশ করা হয়েছে এবং বিদেশী খবরদারিত্বকে অনেক বেশি অস্পষ্ট করা হয়েছে। অথচ এ সত্য প্রকাশ করা উচিত ছিল যে বাংলাদেশ শুধু ভারতের প্রভুত্ব ও খবরদারিত্বের শিকার হয়নি, বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নীলনকশা ও খবরদারিত্বের শিকার হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার নীলনকশা ও চক্রান্তকে মোকাবেলা না করে ফ্যাসিবাদমুক্ত, শোষণমুক্ত ও দমন-পীড়নমুক্ত রাষ্ট্র গঠন যে সম্ভব নয় তার কোনো বিন্দুই এ ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত হয়নি।

জন-আকাঙ্ক্ষার উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এ দেশ ও দেশের জনগণকে দেশী ও বিদেশী শোষণ এবং আধিপত্যের হাত থেকে রক্ষা করে জনমুক্তির পথ সুগম করা। অথচ কোনো অনুচ্ছেদেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশা মোকাবেলার কথা বলা হয়নি। ভারত বা আমেরিকার মতো কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের অনুগত হয়ে এ দেশ চলতে পারবে না। এমনকি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের অন্যায্য প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি পরিচালিত হবে না—এমন অঙ্গীকার এ ঘোষণাপত্রে আসেনি। শুধু তা-ই নয়, বিদেশী চক্রান্তের অংশ হিসেবে ইসলামোফোবিয়া সৃষ্টি করে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে এ দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দমন করার যে রাজনৈতিক অভিলাষ তার বিরুদ্ধে আমাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়নি।

আরো গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এ ঘোষণাপত্রে স্বচ্ছ ইতিহাসবোধ সৃষ্টি করা হয়নি। ১ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ের সুদীর্ঘকালের ধারাবাহিকতায় এ ভূখণ্ডের মানুষ দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল।’ এখানে পাকিস্তানের শোষণ, বঞ্চনা ও গণহত্যার বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে সুস্পষ্ট করা হয়েছে, দীর্ঘ ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, অত্যাচার ও গণহত্যার বিরুদ্ধে এ ভূখণ্ডের মানুষের সুদীর্ঘ লড়াই ও আত্মত্যাগকে উল্লেখ করা হয়নি। ১৭৭০ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ব্রিটিশসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে যে লাখ-লাখ মানুষ মারা গেছে (যা প্রকারান্তরে ঔপনিবেশিক গণহত্যা), তার বিরুদ্ধে একটি কথাও লেখা হয়নি।

অথচ ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের শাসকদের, প্রশাসকদের ও জমিদারদের শিখিয়েছিল কীভাবে শোষণ করতে হয়, কীভাবে অত্যাচার করতে হয়, কীভাবে মনোপলি ব্যবসা করতে হয়, খীভাবে আন্দোলন দমন করতে হয় আর কীভাবে জনগণকে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করতে হয়। সুদীর্ঘকালের বঞ্চনা, বৈষম্য আর নিপীড়নের সূতিকাগার ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন। অথচ সেই ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বক্তব্য না রাখা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছে, জীবন দিয়েছে তাদের আন্দোলন-সংগ্রামকে মহিমান্বিত না করার মধ্য দিয়ে আমাদের সুস্পষ্ট ইতিহাসবোধ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সুস্পষ্ট ইতিহাসবোধ থেকে বঞ্চিত করা মানে আমাদের শোষণ ও বৈষম্যবিরোধী চেতনা হ্রাস করা। এতে জন-আকাঙ্ক্ষার খণ্ডিত অংশ চিত্রিত হয়েছে।

জন-আকাঙ্ক্ষার ইতিবাচক দিক হিসেবে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের’ শহীদদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং শহীদদের পরিবার, আহত যোদ্ধা ও আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে প্রয়োজনীয় সব আইনি সুরক্ষা দেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধের উপযুক্ত বিচারের কথা বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ ২৩, ২৪)। তবে পিলখানা ও শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের বিচারের কথা উল্লেখ না করা ছিল জন-আকাঙ্ক্ষাবিরোধী।

এটা সত্য যে জন-আকাঙ্ক্ষার অংশ হিসেবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছে (অনুচ্ছেদ ২৫)। এর মানে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব একটি নির্বাচন উপহার দেয়া। সংস্কারকে ‘সাংবিধানিক’ ব্র্যাকেটের মধ্যে দেখানো মানে বর্তমান সরকার কোনো বৈপ্লবিক সংস্কার করতে রাজি নয়। আবারো পুরনো ব্যবস্থার মধ্যেই কি চলে যাচ্ছে আমাদের রাজনীতি আর রাষ্ট্র ব্যবস্থা? এতে কি শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব? এ দেশে শোষণ আর বৈষম্য যেভাবে জগদ্দল পাথর হয়ে অবস্থান করছে, পুরনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে তা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।

ঘোষণাপত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের কথা উল্লেখ নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিদ্যমান স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী কাঠামো সংস্কারের কোনো বক্তব্য এখানে রাখা হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোয় যে ক্রিমিনাল ও দুর্নীতিবাজদের পুনর্বাসন করা হয় তা উৎপাটনের জন্য কোনো কথা বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি সততা আর গণতন্ত্রের চর্চা না হয়, তাহলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে আবারো। সেই আশঙ্কাকে উল্লেখ করে রাজনৈতিক সংস্কারের আলাপ এখানে না আনা ছিল দুঃখজনক। অথচ ২২ নং অনুচ্ছেদে ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধের কথা বলা হয়েছে। প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়নি। আমরা আশা করব, সরকার এসব সীমাবদ্ধতা চিহ্নিতপূর্বক জুলাই ঘোষণাপত্র সংশোধনে যথোপযোগী উদ্যোগ নেবে।

ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়