প্রতিটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উপাদান জনসংখ্যা। উপাদানটি রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে নাকি বোঝাস্বরূপ তা নির্ভর করে ওই রাষ্ট্রের সম্পদের পরিমাণের ওপর, যেমন ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ। এদিক থেকে বলা যায়, বাংলাদেশের জন্য জনসংখ্যা একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি।

ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে জনবহুল দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। সম্পদের তুলনায় জনগণ বেশি হওয়ার ফলে সীমিত হয়ে এসেছে নাগরিক সুবিধার পরিসর। প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে শুরু করে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত নাগরিকদের জীবন। উপরন্তু কভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে বেড়েছে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি। যদিও একসময় দেশের জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে এসেছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৩ সালে দেশে মোট জনসংখ্যা ছিল ১৭ কোটি ২৯ লাখের কিছু বেশি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৪৭ লাখে। অর্থাৎ বর্তমানে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। এ বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা না গেলে তা দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। ব্যাহত হবে কাঙ্ক্ষিত জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন। সরকারের এদিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে তাদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। এজন্য তরুণদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আদায় করে নেয়ার জন্য খুবই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কেননা দেশের জনসংখ্যায় তরুণদের হার এখন সবচেয়ে বেশি। তবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার পরও সেভাবে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন করতে পারছে না। কারণ তরুণদের তথা কর্মক্ষম জনসংখ্যার অধিকাংশই শ্রমবাজারে নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ডাটাবেজ সিইআইসি ডাটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার (লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট) ছিল ৫৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ২০২৩ সাল শেষে তা নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ১৬ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা রয়েছে, তরুণদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে না পারলে বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন কঠিন হবে।

সাধারণত ১৫-৬৪ বছর বয়সীদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হিসেবে ধরা হয়। এ হিসেবে দেশের জন্য জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের অনুকূল সময় ২০৩৭-৩৮ সাল পর্যন্ত বলে মনে করেন জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ এ সময় পর্যন্ত দেশে কর্মক্ষম মানুষ বেশি থাকবে। কিন্তু এরপর দেশের জনসংখ্যা তারুণ্যনির্ভর থাকবে না। তাই তরুণদের যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে কর্মে নিয়োজন করা জরুরি। প্রয়োজনে এর জন্য বিনিয়োগ ও নীতিগত পরিবর্তনও আনতে হবে।

একটি দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার অন্যতম পূর্বশর্ত প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ। দেশে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে এখনো বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বৈষম্য বিরাজমান সর্বক্ষেত্রেই। আয়বৈষম্য এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের খাবার গ্রহণের তালিকা ছোট হয়ে এসেছে। সুচিকিৎসা থেকে শুরু করে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার অভাবে সাধারণ জনগণের জীবনমানের সেভাবে উন্নয়ন হয়নি। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব মৌলিক চাহিদাজনিত ঘাটতি পূরণ করা জরুরি। এজন্য জনগণের জীবনমান উন্নয়নে জোর দিতে হবে। উন্নয়ন কেবল শহরকেন্দ্রিক না হয়ে হতে হবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ঘিরেও। জনসংখ্যার পেছনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিশেষ করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য খাতে।

জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করার অন্যতম মাধ্যম সুষ্ঠুভাবে শিক্ষাদান ও প্রশিক্ষণ। কর্মক্ষম জনবলকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষত কারিগরি শিক্ষায় জনগোষ্ঠীকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পৃথিবীর যে দেশ যত বেশি তার জনগণকে শিক্ষার সংস্পর্শে আনতে পেরেছে সে দেশ তত বেশি মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে। যেহেতু শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তাদের অধিকার, কর্তব্য, দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে।

এদিকে বর্তমানে দেশে পুরুষের চেয়ে নারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি। ২০২৩ সাল শেষে দেশে নারীর সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার। আর পুরুষের সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার। সে অনুযায়ী, ২০২৩ সাল শেষে দেশে নারীর সংখ্যা ছিল পুরুষের তুলনায় ৩২ লাখ ২০ হাজার বেশি। গাণিতিক মডেল পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে নারী ও পুরুষের সংখ্যার ব্যবধান আনুমানিক ৪০ লাখের কাছাকাছি। সুতরাং নীতিগত বিষয়েও পরিবর্তন আনা দরকার। কারণ নারীদের সংখ্যা বেশি হলেও দেশের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম।

আবার যেসব নারী কর্মে নিযুক্ত, কর্মক্ষেত্রে সমান দক্ষতা ও মেধার পরিচয় দেয়ার পরও দেশের অর্থনীতিতে তাদের অংশগ্রহণের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো দূর করা যায়নি এখনো। নানা ধরনের মানসিক ও পারিপার্শ্বিক বাধা দূর করার পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে এখনো তেমন একটা অগ্রগতি দেখা যায়নি। মোট জনসংখ্যার এত বিপুল পরিমাণ অংশকে শ্রমবাজারের বাইরে রেখে প্রকৃতপক্ষে কখনই জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন করা যাবে না। তাই নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো দূর করতে হবে।

তবে যতই দক্ষ করে গড়ে তোলা হোক না কেন, মোট আয়তনের অনুপাতে জনসংখ্যা সামঞ্জস্যহীনভাবে বাড়তে থাকলে খাদ্যশৃঙ্খলে চাপ পড়ে, যা খাদ্য অনিরাপত্তা তৈরি করে। দিন দিন দরিদ্র জনগণের সংখ্যা বাড়ে। জীবনমান হয় নিম্নমুখী। এ প্রেক্ষাপট বিচারে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ করা জরুরি। দেশে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনতে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিবার-পরিকল্পনা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আবারো কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।