বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, অথচ চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে আমরা এখনো প্রায় পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে শুধু মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে। অথচ ব্লাড প্রেসার মাপার যন্ত্র, গ্লুকোমিটার, সিরিঞ্জ বা স্যালাইন সেটের মতো সহজ জিনিস আমরা চাইলে স্থানীয়ভাবে সহজেই উৎপাদন করতে পারি। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে দেশীয় উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র শিল্প বিকাশ পাবে।
এ উদ্যোগ শুধু আমদানিনির্ভরতা কমাবে না, বরং প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় রফতানি বাজার তৈরি করবে। প্রতিটি অঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট পণ্যে বিশেষায়িত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) গড়ে তোলা যেতে পারে, ‘এক-গ্রাম-এক-পণ্য’ মডেলের ভিত্তিতে। কোনো এলাকায় সিরিঞ্জ উৎপাদন, অন্য এলাকায় গ্লুকোমিটার বা ল্যাব কিট তৈরি হলে পুরো দেশজুড়ে উৎপাদনের একটি বৈচিত্র্যময় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে, নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত করবে ও স্থানীয় দক্ষতাকে কাজে লাগাবে।
বাংলাদেশে স্থানীয় মেড টেক শিল্প বিকাশের পথে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক নীতিগত প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। প্রথমত, সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অভাবে চিকিৎসা সরঞ্জামকে কখনই অগ্রাধিকার খাত হিসেবে দেখা হয়নি; ফলে নীতি ও প্রণোদনা কাঠামো তৈরি হয়নি। দ্বিতীয়ত, ওষুধ ও প্রসাধনী আইনের সঙ্গে মিলিয়ে চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে মেডটেকের বিশেষ চাহিদা পূরণ করে না। তৃতীয়ত, গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতে সরকারি বরাদ্দ অপ্রতুল, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা উদ্ভাবনী অর্থায়নের সুযোগ সীমিত। ফলে উদ্যোক্তারা শুরুতেই নিরুৎসাহিত হন। চতুর্থত, দক্ষ বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ান তৈরির কোনো জাতীয় পরিকল্পনা নেই; বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে এ খাতে একটি ব্রেইন ড্রেইন" তৈরি হয়েছে। এছাড়া পেটেন্ট ও মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের দুর্বল ব্যবস্থা স্থানীয় উদ্ভাবকদের নিরুৎসাহিত করেছে। গত কয়েক দশকে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো স্বাস্থ্য খাতকে মূলত চিকিৎসা অবকাঠামো ও ওষুধ আমদানির ওপর সীমিত রেখেছে; তারা দেশীয় মেডটেক শিল্প গড়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়নি। রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির অভাব, অগ্রাধিকার নির্ধারণে ভুল, সরকারি ক্রয়ে দুর্নীতি ও বৈদেশিক সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতার সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে পূর্ববর্তী সরকারগুলো এ খাতের সম্ভাবনাকে অবহেলা করেছে এবং বাংলাদেশকে আমদানিনির্ভর অবস্থায় রেখেছে।
জাতীয় মেডটেক কৌশল অনুযায়ী একটি বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তুললে অন্তত ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, আর পুরো খাত সচল হলে এক লাখের বেশি চাকরি সৃষ্টি হবে। স্থানীয় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা এ খাতে সরাসরি অবদান রাখতে পারবেন, তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দরজা খুলবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ দেশেই থেকে যাবে। এ লক্ষ্যে নীতিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ। যেমন একটি আধুনিক ও আলাদা মেডটেক নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা, যাতে দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু হয়; গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল গঠন করা, যাতে নতুন উদ্ভাবন বাজারে আনতে উদ্যোক্তারা সহজে অর্থায়ন পান; বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও সরকারের মধ্যে কার্যকর ট্রিপল-হেলিক্স সহযোগিতা নিশ্চিত করা, যাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়; এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, যাতে স্থানীয় উদ্ভাবকরা উৎসাহ পান। পাশাপাশি ‘এক-গ্রাম-এক-পণ্য’ মডেল অনুযায়ী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ গড়ে তোলার মাধ্যমে সারা দেশে উৎপাদনের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা হবে। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলে মেডটেক শিল্প কেবল কর্মসংস্থানই তৈরি করবে না, বরং স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও রফতানি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বিএনপি সরকার পরিচালনার প্রথম ১৮ মাসে যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, স্থানীয় মেডটেক শিল্প হতে পারে তার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হলে স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি খাতকে গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। এর মাধ্যমে অর্থনীতি বড় হবে। ঠিক যেমন কোস্টারিকা কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে মেডটেক রফতানিকারক শক্তিতে রূপ নিয়েছে, বাংলাদেশও চাইলে আগামী এক দশকে ১০ বিলিয়ন ডলারের মেডটেক রফতানি শিল্প গড়ে তুলতে পারে। একইভাবে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। দেশটি ১৯৪৭ সালের পর স্বাধীনতার শুরুর দিক থেকেই স্থানীয়ভাবে সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি উৎপাদনে বিশ্বখ্যাত, বিশেষ করে শিয়ালকোট শহর এরই মধ্যে একটি বৈশ্বিক মেডিকেল ইন্সট্রুমেন্ট হাব হিসেবে স্বীকৃত। পাকিস্তান প্রতি বছর শত শত মিলিয়ন ডলারের সার্জিক্যাল পণ্য রফতানি করে, যা তাদের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও বড় উৎস। বাংলাদেশেরও একই ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে, যদি সঠিক নীতি, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা-সমর্থন কাঠামো তৈরি করা যায়।
এখনই সময় সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার। স্থানীয়ভাবে সহজ চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন শুধু স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নয়, বরং কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক গণতন্ত্র—সব কিছুর জন্য একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে।
বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত কর্মসূচিতে যেমন তারেক রহমান স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন, বিশেষ করে নারী ও যুবশক্তিকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মক্ষেত্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মেডটেক শিল্প সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি বাস্তব ও কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। এ শিল্পে নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত করা এবং তরুণ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ও প্রযুক্তিতে শিক্ষিত যুবকদের কাজে লাগানো হলে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে একসঙ্গে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার: বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা










