পাখি প্রকৃতির অংশ। সম্মিলিত কলতান ও আকাশজুড়ে বিরামহীন ডানা মেলে এ প্রাণী তাদের অস্তিত্বের জানান দেয়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাখির অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আবাস হারাচ্ছে পাখি। সেই সঙ্গে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উচ্চক্ষমতার ফ্লাডলাইটের কারণে রাত আর দিনের পার্থক্য না বোঝায় পাখির কলকাকলিও এখন আর আগের মতো শোনা যায় না। ক্রমাগত আবাসস্থল হারানোয় বাস্তুসংস্থান ও জীবনচক্রে ব্যাঘাত ঘটায় দিনে দিনে পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, পাখিপ্রেমীদের কাছে রাজশাহী মূলত ‘বার্ডশাহী’ নামে পরিচিত। কারণ দেশে থাকা ৭১৪ প্রজাতি পাখির মধ্যে প্রায় সাড়ে তিনশরই দেখা মেলে এ অঞ্চলে। আর নগরঘেঁষা পদ্মার চর তো পাখির নিরাপদ আবাস। বিপন্ন পাখিও সেখানে ঠাঁই খুঁজে নিয়েছে। নিরাপদে ফিরত পরিযায়ী পাখিও। কিন্তু শহরের ঝলমলে সে আলো আজ তাদের দিক ঘুরিয়েছে। দিন দিন কমছে পাখির সংখ্যা। বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে পরিবেশবিজ্ঞানীরা মত দিচ্ছেন। কিন্তু সেদিকে নগর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি নেই। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল এলাকাসহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। এতে পাখির বাসস্থান হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মার চরে ২৭৯টি পাখির প্রজাতি দেখা গেছে। এর মধ্যে ১৩২টি আবাসিক, ১২৬টি পরিযায়ী, ২১টি যাযাবর, নয়টি বিপদগ্রস্ত ও পাঁচটি অতিবিপন্ন। এছাড়া পাঁচটি মহাসাগরীয় অঞ্চলের পাখি চোখে পড়েছে। এখন পদ্মার চরে ‘রিভার সিটি’ বাস্তবায়ন হলে চরের এসব পাখির আবাস হুমকিতে পড়বে। মূলত এমন চিত্র সারা দেশেই দেখা যাচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটায় শুধু যে পাখির বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে সেটি নয়, এর ফলে পরিবেশে জীববৈচিত্র্যেরও ক্ষতি হচ্ছে। 

পাখির প্রজাতি রক্ষায় প্রজননের সুযোগ রাখতে হবে। কিন্তু পদ্মার চরে খাবারের প্রাচুর্য থাকলেও বাসা তৈরির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় এটি ব্যর্থ হচ্ছে। এছাড়া রাতের বেলায় যেকোনো আলো পাখিদের জন্য ক্ষতিকর। এতে তাদের জীবনচক্রে প্রভাব পড়ে। এর ফলে তাদের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বংশবিস্তার না হওয়ায় পাখির প্রজাতিগুলো বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। নগরের যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পাখির আবাস সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু রাজশাহীতে এটি উপেক্ষা করা হয়েছে। এ কারণে সড়কে অবস্থিত বড় গাছগুলো অনায়াসে কেটে সড়কবাতি বসানো হচ্ছে। 

রাজশাহী পাখির হটস্পট হওয়ায় আগে নগরীর রাস্তায় নানা জাতের পাখির দেখা মিলত। কিন্তু বর্তমানে কাক, চড়ুই, শালিক ছাড়া আর তেমন কোনো পাখির দেখা মেলে না। ফলে পাখিপ্রেমীদের কাছে রাজশাহী বার্ডশাহী নামে পরিচিতি পেলেও তা ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে। অবশ্য বিশ্বজুড়েই পাখির আবাস কমে যাচ্ছে। ‘স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস বার্ডস’ নামে বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে পাখির সংখ্যা সঠিকভাবে বলা যায় না। তবে ১১ হাজার প্রজাতির পাখি আছে। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ বা ৫ হাজার ২৪৫ প্রজাতির পাখির সংখ্যা কমছে। প্রাকৃতিক আবাসস্থল কমে যাওয়ায় বা আবাসস্থল বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ায় পাখি কমে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার আটটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা এ গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ বস্তুত ছোট দেশ, জনসংখ্যা অনেক বেশি। পাখির বাসা কমে আসছে, বিচরণের মতো জায়গা কম। যে কারণে আমাদের দেশে একমাত্র সুন্দরবন ছাড়া পাখির নির্বিঘ্ন আবাসস্থল নেই। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সারা দেশে পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণের বিকল্প নেই। না হলে আমাদের জীববৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে পড়বে। আগে একটা সময় বসতবাড়ির সামনে পুকুর ছিল, পেছনের বাগানে পাখির আবাস থাকত। এখন দেখা যায় গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতে পুকুর নেই, বাগান নেই, তাই পাখিরও দেখা মেলে না। কারণ পাখির আবাস ও খাবার দুটিই নষ্ট হচ্ছে। এতে সারা দেশেই পাখির সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। মানুষের অসচেতনতার কারণে পুকুর ভরাট, গাছ নিধনের পাশাপাশি পাখির অভয়ারণ্য হুমকির মুখে পড়ছে। এছাড়া নদী থেকে বালি তুলে পুকুর, ডোবা-নালা, কৃষিজমি ভরাট করা হচ্ছে। বাগানের গাছ কেটে বহুতল বাড়ি বানানো হচ্ছে। যেখানে সেখানে ইটভাটা নির্মাণ হচ্ছে। নদীর মধ্যে জেগে ওঠা চরে দিন দিন চাষাবাদ বাড়ছে। অতিরিক্ত ফসল ফলাতে এসব খেতে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহৃত হচ্ছে। পাখির উৎপাত ঠেকাতে সবজিবাগানে ব্যবহৃত হচ্ছে কারেন্ট জাল। এ কারণে পাখির বিচরণস্থল দিন দিন কমছে।

রাজধানী ঢাকায়ও গাছগাছালি কমছে। ফলে পাখির আবাসস্থল কমছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী রিসার্চ ল্যাবরেটরির এক গবেষণায় ঢাকা শহরে পাখির ‘হটস্পট’ হিসেবে বিবেচিত এলাকাগুলোর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় ঢাকায় পাখির প্রজাতির মধ্যে অসমবিন্যাস এবং ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয় পাখির প্রজাতির সমবিন্যাসের বিষয়টি উঠে এসেছে। এ গবেষণায় ঢাকায় প্রতি বছর পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে পাখির আবাসস্থল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

আমারা প্রত্যাশা করি জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সরকারিভাবে পাখি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এজন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগের বন্যপ্রাণী শাখা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষক—সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করে শহরে পাখির উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে সারা দেশেই বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ধরে রাখা সম্ভব। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে সেটিই আমাদের কাম্য।