পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে পণ্যের দামের এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। দাম নির্ধারণে পরিবহন ব্যয় উৎপাদনের মোট ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত থাকে। স্বাভাবিকভাবেই মহাসড়কের চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পণ্যের দামেও। আর মহাসড়কে বিশৃঙ্খলার পেছনেও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়। চাঁদাবাজির মূলে আছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোই। সড়কে চাঁদাবাজি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ার পরও বিগত সরকারের আমলে সড়ক পরিবহন আইনকে পাশ কাটিয়ে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের সংগঠন মিলে বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। চাঁদাবাজির নাম বদলে তারা শ্রমিক সংগঠনের কল্যাণ ও পরিচালন ব্যয় বাবদ চাঁদা আদায় শুরু করেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেকেই ধারণা করেছিলেনে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে মহাসড়কে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। সরকার পরিবর্তনের পর কেবল চাঁদাবাজির হাতবদল হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইনে এভাবে চাঁদা তোলার ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আগের মতোই এখনো চাঁদাবাজি চলছে। এ চাঁদাবাজির প্রভাবে বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তাই বাজর নিয়ন্ত্রণে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারকে শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের নামে রাস্তায় অর্থ আদায় বন্ধ করতে হবে। মহাসড়কে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা উচিত।

পরিবহন খাতে তিন পদ্ধতিতে চাঁদা তোলা হয়। এগুলো হচ্ছে এক. দৈনিক মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদা, দুই. বাস-মিনিবাস নির্দিষ্ট পথে নামানোর জন্য মালিক সমিতির চাঁদা এবং তিন. রাজধানী ও এর আশপাশে কোম্পানির অধীনে বাস চালাতে দৈনিক ওয়েবিল বা গেট পাস (জিপি) চাঁদা। প্রথমে মালিকানা ব্যবস্থা ভেঙে দিতে হবে। তাতে মালিক নেতাদের চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে। যানবাহন চালানোর বিষয়টি চাকরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থাৎ নিয়োগপ্রাপ্ত চালক হতে হবে। এটা হলে শ্রমিক নেতাদের ক্ষমতা কমে যাবে। বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থায় নানা সুবিধাভোগী চক্র তৈরি হয়ে গেছে। চাঁদাবাজি বন্ধে সরকারকেও পদক্ষেপ নিতে হবে।

গত ৫ মার্চ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশ করা এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এ চাঁদার ভাগ পান দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ও পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা। গবেষণায় আরো এসেছে, দেশের বৃহৎ বাস কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনার সঙ্গে রাজনীতিবিদরা সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। এদিকে শ্রমিক সংগঠনের পরিচালন ব্যয় বাবদ আদায় করা চাঁদাবাজির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সড়ক আইনে শ্রমিক সংগঠনের কল্যাণ বা পরিচালন ব্যয় বাবদ টাকা তোলায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে একটি নির্দেশনা জারি করে দেশজুড়ে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। সড়ক আইন লঙ্ঘন ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে যারাই জড়িত ছিলেন তদন্ত করে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা উচিত।

যে অর্থ পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা হিসেবে নেয়া হয়েছে, সেই অর্থ বাড়তি বেতন-ভাতা হিসেবে দিলে শ্রমিকরা লাভবান হতেন। বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণ শ্রমিকরা এর সুফল পাচ্ছেন না। লাভের গুড় কতিপয় শ্রমিক নেতা ও সংগঠনের পকেটে যায়। শ্রমিক সংগঠন বা নেতাদের দায়িত্ব পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় নয়, তারা যাতে শ্রমিকদের উপযুক্ত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেন, সেটি নিশ্চিত করা। পরিবহন খাতে অবৈধ চাঁদা বন্ধ করতে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায়কে বৈধতা দেয়া হয়েছে, তা অচিরেই বন্ধ হওয়া উচিত। এ খাতে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। মালিকরা যে অর্থ চাঁদা হিসেবে দিচ্ছেন, সেই অর্থ তারা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা হিসেবে দিতে দোষটা কী? এ খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা তুলনামূলকভাবে কম এবং বেশির ভাগ শ্রমিককে জীবনধারণের জন্য অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। এটিও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দ্বিতীয়ত, কোন শ্রমিক সংগঠন বৈধ, কোনটি অবৈধ তা নিরূপণ করবে কে? এক সরকারের আমলে যে সংগঠনকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে, পরের সরকার সানন্দে সেই সংগঠনকে বৈধতা দেবে। এ চক্র থেকেও পরিবহন শ্রমিকদের বেরিয়ে আসতে হবে। পরিবহন মালিকদেরও বুঝতে হবে সাধারণ শ্রমিকরাই খাতটিকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলে এ খাতে নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজি যেমন কমবে, তেমনি যাত্রীসেবাও বাড়বে। পরিবহনসহ সব সেবা খাতের চাঁদাবাজি কঠোর হাতে বন্ধ করতে হবে। শ্রমিকদের কল্যাণে যদি পরিবহন-মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো সত্যি কিছু করতে চায়, তার উত্তম উপায় হলো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, চাঁদার নামে অবৈধ উপার্জনের পথ বেছে নেয়া নয়।

সড়কপথের ওপর ভর করেই দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। অধিকাংশ মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসা নির্ভরশীল সড়কপথের ওপর। তাই যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে বাড়ছে বাস-ট্রাকের চাহিদা। এ খাতের ব্যবসায়ীরা পরিবহন নিবন্ধন শুরু করেন উৎকোচ দেয়ার মাধ্যমে। অফিসের উৎকোচ সড়কে নেমে হয়ে যায় চাঁদা। পরিবহনের চাকা ঘুরলেই নেতা, পুলিশ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, শ্রমিক-মালিক সংগঠন—টাকার ভাগ যায় সব টেবিলে। এ বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বারবার উঠে এসেছে। এছাড়া দেশে বাজার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা রয়েছে। উৎস থেকে পণ্য পাইকারি বাজার পর্যন্ত আসতে বেশ কয়েকবার হাতবদল হয় এবং প্রতি হাতবদলের সঙ্গে বাড়তে থাকে পণ্যের দাম। এ পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেক মানুষ যুক্ত। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ থেকেও নানা সময়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টায়নি। উল্টো পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে বাজারের প্রতিটি পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে লাগামহীন হয়ে ওঠে নিত্যপণ্যের দাম। ফলে দেখা যায়, সরকার পণ্যের দাম বেঁধে দিয়ে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নামিয়ে বাজারে অভিযান ও তদারকি বাড়িয়েও দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারে না। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে চাঁদাবাজির উৎপাত কমে আসবে বলে ধারণা করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু বাস্তবে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার অন্যতম প্রধান কারণ চাঁদাবাজি, তাই অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই এ সমস্যার একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। শক্তিশালী মালিক ও শ্রমিক সংগঠনসহ পরিবহন সংস্থাগুলোকে অবশ্যই সৎ ব্যক্তিদের দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করতে হবে, যারা এ খাতকে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রভাব থেকে বাঁচাতে পারে। পরিবহন খাতে রাজনৈতিকীকরণ বন্ধসহ চাঁদাবাজির সব পথ বন্ধ করতে হবে সরকারকে। তাহলেই দেশের মানুষ এর সুফল পাবে।