যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়নের পেছনে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকাই অধিক। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও উন্নয়ন যাত্রায় যতটা এগিয়েছে, তাতে ভূমিকা রেখেছে উচ্চশিক্ষা।

উচ্চশিক্ষা একদিকে জনসংখ্যাকে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তরে ভূমিকা রাখে। এতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে না। বরং দক্ষ জনশক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোয় অবদান রাখতে পারে। কিংবা দক্ষ জনশক্তি রূপান্তরের মাধ্যমে শোভন কর্মসংস্থানে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যায়। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবনে সহায়ক হয়। তবে এজন্য উচ্চশিক্ষার কাঠামোগত সম্প্রসারণ জরুরি নয়। প্রয়োজন হলো মানসম্মত উচ্চশিক্ষা। এটি ছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয় না। এতে কেবল সার্টিফিকেটসর্বস্ব জনসংখ্যা বাড়তে থাকবে। বেকার তালিকায় উচ্চশিক্ষিতের হার বাড়তে থাকে, যেমনটি দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে।

অনুন্নত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটা পরিমাপক হলো শ্রমবাজারের সঙ্গে এর সংযোগ না থাকা। অর্থাৎ কর্মমুখী ও যুগোপযোগী শিক্ষার অভাব। বাংলাদেশের উচ্চ স্তরের শিক্ষায় এ সমস্যা বর্তমানে প্রকট। যদিও গত তিন দশকে এ শিক্ষার পরিসর উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, দূরশিক্ষণ ব্যবস্থার প্রসার এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের সুযোগ বাড়ার ফলে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এ উচ্চশিক্ষা কর্মসংস্থানের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএসের) তথ্য মতে, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় আট লাখের বেশি বেকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বেকারত্বের হার ১০ শতাংশের ওপরে, যা সব স্তরের শিক্ষার মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ যত বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা, তত বেশি বেকারত্ব এমন একটা চিত্র দেখা যাচ্ছে।

আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় চাকরি পান না। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতি তিনজন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকের একজন দুই বছর পর্যন্ত বেকার থাকেন। দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকার ফলে তাদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং কর্মজীবনে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এরূপ পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার একটি বড় অসামঞ্জস্য রয়েছে, যেটি আগেও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এখনো অনেক ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। বাস্তব দক্ষতা বা কর্মমুখী শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় এমন দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না।

দ্বিতীয়ত, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পর্যাপ্ত হারে বাড়ছে না। শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের গতি ধীর হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সীমিত। এর পরও বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানও দক্ষ মানবসম্পদ নেই বলে দাবি করে। যার কারণ কর্মমুখী শিক্ষার অভাব।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল কর্মজীবী মানুষ, দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থী এবং প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ না পাওয়া মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে লাখ লাখ শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করছেন। কিন্তু এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান, মনিটরিং ও পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত শ্রেণী কার্যক্রমের অভাব, পর্যাপ্ত শিক্ষক সংকট এবং পরীক্ষায় নকলের অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সমালোচকদের মতে, যদি মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী না করা হয় তবে বিপুলসংখ্যক ডিগ্রিধারী তৈরি হলেও তারা কার্যকর মানবসম্পদে পরিণত হবে না।

বিশ্বের অনেক দেশে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করছে। তাই মূল প্রশ্ন পদ্ধতি নয়, বরং বাস্তবায়ন ও তদারকির। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, শক্তিশালী মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম চালু করা গেলে এ ব্যবস্থাকে কার্যকর করা সম্ভব।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে মানসম্মত করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, অনলাইন ও অফলাইন শিক্ষার সমন্বিত ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি ও ডিজিটাল মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, কোর্সগুলোকে আরো কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে—বিশেষ করে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং পেশাভিত্তিক শিক্ষায় জোর দেয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা খাতেও সংস্কার জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্প খাতের সঙ্গে সমন্বয় করে পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে। ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং উদ্যোক্তা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এজন্য শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ এবং বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর নীতি প্রয়োজন। সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করলে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ভবিষ্যতে এতে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজন হবে দক্ষতা। শিক্ষা ব্যবস্থা যদি দক্ষতা, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে গড়ে না ওঠে তবে সত্যিকার অর্থে দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারবে না।