এ যাত্রা অবশ্য পুরোপুরি সুখকর নয়। সকালে ও বিকালে যাত্রীরা গাদাগাদি করে আসা-যাওয়া করে। অল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছা যায় বলে অনেকেই এর ওপর নির্ভর করে।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড বা ডিএমটিসিএলের ভিশন অনুযায়ী মেট্রোরেলের মূল লক্ষ্য সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন এবং নগরীর সংযোগ বাড়ানো। এর সঙ্গে ‘স্টে কানেক্টেড’ থিমটি এ উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা যতক্ষণ ঘরের বাইরে থাকি ততক্ষণ পরিবারের সবাই দুশ্চিন্তায় থাকে। রাজধানীতে জননিরাপত্তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিশ্চিত করা যায়নি। বরং পরিস্থিতির সার্বিক অবনতি ঘটেছে। তাই মেট্রোরেলে যাতায়াত অনেকের জন্য স্বস্তিকর।

ঢাকার যানজট সংকট বহু পুরনো। ধারণা করা হয়েছিল, মেট্রোরেল চালু হলে সড়কে যানজট অনেকাংশে কমে আসবে। তাতে যারা সড়কে যাতায়াত করবে তাদের ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমবে। বাস্তবে হয়েছে উল্টোটি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমাদের আরো মেট্রো দরকার। ‘স্টে কানেক্টেড’ ধারণাটি প্রথম প্রচারিত হয়েছিল গ্রামীণফোন প্রবর্তনের সময় থেকে। ধারণাটি ভিন্ন ছিল। টেলিফোনের মাধ্যমে সবকিছুতে সংযুক্ত থাকার কথা বলা হয়। এ ধারণার প্রয়োজন এখন সবাই অনুভব করতে পারছে। মেট্রোরেলও একই ধরনের সংযুক্তি নিশ্চিত করে। যাতায়াত সুবিধা বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে এটির প্রভাবের কথা বলতেই হয়। কারণ মেট্রোতে যাতায়াত অনেক ধরনের আতঙ্ক কমিয়েছে। অনেক নারী মেট্রোতে চড়ার পর মোবাইলে যোগাযোগ করেন। তখন একটা ভরসা হয়। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছার নিশ্চয়তা দেয়া যায়। যাত্রাপথে বড় কোনো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে না এ আস্থাও থাকে। প্রতিদিনই যাতায়াতের ক্ষেত্রে যোগাযোগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোন জায়গায় কখন পৌঁছব আর কতক্ষণে কোনো কিছু শেষ করা যায়, এ সময়জ্ঞানটুকুর জন্য যাতায়াত ব্যবস্থাও মসৃণ হতে হবে।

একটি মজার বিষয় এখানে বলে নেয়া জরুরি। মেট্রোর বগিতে এক পাশে বয়স্ক, গর্ভবতী কিংবা কোলে শিশু নিয়ে আসা যাত্রীদের বসার জন্য তিনটি আসন রাখা আছে। বিশেষ বিবেচনার এ আসনগুলো সবসময় যাত্রীতে পূর্ণ থাকে। অনেক তরুণ বয়সের মানুষ দিব্যি সেখানে বসে আছে। তাদের সামনেই অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি কষ্ট করে যাত্রা করছেন। যদিও তারা জানেন এ আসনগুলো বিশেষায়িত, তবে তাদের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ থাকে না। কেউ যদি তাদের বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন করেন তখন তারা এমন ভান করেন যেন তিনি এমনটাই করতেন। মনোযোগ ছিল না বলে আসন ছাড়েননি। অনেকে বিরক্ত হন। আবার অনেকে ঘুমিয়ে পড়েন বা ক্লান্তির ভান করে বসে থাকেন। কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার অজুহাত দেন।

বাংলাদেশের বাইরে যেসব দেশে মেট্রোর মতো যাত্রীসেবা আছে সেখানে বিষয়টি এমন নয়। আমাদের আচরণের পরিবর্তন ঘটেনি। গণপরিবহনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সৌজন্যতা দেখানোর কিছু নিয়ম আছে। আমরা এখনো সেগুলো আয়ত্ত করতে পারিনি। সাধারণ ভদ্রতাও অনেকে দেখাতে রাজি নন। এ ধরনের আচরণের পরিবর্তন ঠিক কবে হবে তা বলা যাচ্ছে না। অনেক সময় যাত্রীদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ঝগড়ার পর্যায়ে চলে যায়। এমনটি যে পার্শ্ববর্তী যাত্রীদের অস্বস্তি বাড়ায় সেদিকে তাদের ভ্রুক্ষেপ থাকে না। অবশ্য সবাই এমন নয়। অনেকে পর্যাপ্ত সৌজন্যতাই দেখিয়ে থাকেন।

মেট্রোরেল পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। এজন্য এটিতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। যাতায়াতের সময় উচ্চস্বরে কথা বলা, মোবাইলের স্পিকার চালু করে গান শোনা থেকে বিরত থাকতে হবে। এমনকি এ পরিবহনের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। বিশেষত জোর করে ট্রেনে ওঠা বা নামার চেষ্টা করা ঠিক নয়। জরুরি কোনো পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে এবং আশপাশের মানুষের মধ্যেও তা না ছড়িয়ে কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা নিন। নিজের টিকিট বা এমআরটি পাস নিরাপদে সংরক্ষণ করুন। এটি অন্যের সঙ্গে বিনিময় করা ঠিক হবে না।

মেট্রোতে চলাফেরা শুধু নিয়ম মানার বিষয় নয়, এটি নাগরিক সচেতনতা ও সভ্যতার পরিচয়। আমরা যদি সবাই শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে মেট্রো ব্যবহার করি, তাহলে যাত্রা হবে নিরাপদ, আরামদায়ক এবং সবার জন্য আনন্দদায়ক। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ‘স্টে কানেক্টেড’ শুধু যোগাযোগে থাকা নয়; বরং নির্ভরযোগ্য তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ সেবা, নতুন সুযোগ ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনার সঙ্গে সবসময় সংযুক্ত থাকা। ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা কিংবা বিনিয়োগকারী—সবার জন্যই নিয়মিত তথ্যপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত থাকা এখন সময়ের দাবি।

‘স্টে কানেক্টেড’-এর মাধ্যমে মানুষ সরকারি নীতিমালা, আইন ও বিধিমালার পরিবর্তন, ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা, বিনিয়োগের সুযোগ ও বিভিন্ন সেবার সর্বশেষ তথ্য দ্রুত জানতে পারে। এতে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয়, সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হয় এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমে। বিশেষ করে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত তথ্যপ্রাপ্তির মাধ্যমে তারা নতুন নীতিমালা সম্পর্কে অবগত থাকতে পারেন, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদনসংক্রান্ত পরিবর্তন জানতে পারেন, বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন এবং ব্যবসার ঝুঁকি কমাতে পারেন। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে ওঠে, যা ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাই ‘স্টে কানেক্টেড’ মানে শুধু সংযুক্ত থাকা নয়; এটি জ্ঞান, সেবা, সুযোগ ও উন্নয়নের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত থাকার একটি অঙ্গীকার।

মেট্রোতে যাতায়াত করতে পারায় নারীরা নানাভাবে উপকৃত হচ্ছেন। জাপানের বিভিন্ন শহরে অফিস সময় বা ব্যস্ত সময়গুলোয় শুধু নারীদের জন্য বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা চালু থাকে। এগুলো গণপরিবহনে নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য চালু হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট বগিতে এ ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। ভারতের দিল্লির প্রায় সব মেট্রো ট্রেনে একটি সম্পূর্ণ কোচ নারীদের জন্য সংরক্ষিত। এছাড়া প্রবীণ, গর্ভবতী নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ও নারী নিরাপত্তাকর্মীও নিয়োজিত থাকেন। দুবাইয়ের মেট্রোতে নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা কেবিন আছে। কোনো পুরুষ যাত্রী এসব কেবিনে প্রবেশ করলে তাকে জরিমানা দিতে হয়। তাই অনেকে ভুল করে চলে এসেছেন এমন অজুহাতে এসব কেবিনে ঢুকতে পারেন না। মেক্সিকোয় ব্যস্ত সময়ে নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা বগির ব্যবস্থা করা হয়। স্টেশনের ভিড়ে নারীর ভোগান্তি কমাতে আলাদা প্রবেশপথের ব্যবস্থাও আছে। এমন আরো কিছু উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান, মিসরসহ কয়েকটি দেশের কিছু রুটে নির্দিষ্ট সময়ে নারীদের জন্য বিশেষ বা পৃথক কোচের ব্যবস্থা রাখা হয়। একইভাবে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, হংকংসহ অনেক দেশে নারীদের জন্য আলাদা কোচ নেই। সেটি যাতায়াতের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা অবশ্য নয়। কারণ স্টেশনগুলোয় সর্বত্র সিসিটিভি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা, কঠোর আইন প্রয়োগ ও দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ওপর বেশি জোর দেয়া হয়।

নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা বিশ্বে অস্বাভাবিক নয়। তবে কোন দেশ আলাদা কোচ চালু করবে আর কোন দেশ সবার জন্য সমান ব্যবস্থার মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে তা তাদের নিজস্ব নীতি, সামাজিক বাস্তবতা ও যাত্রীদের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে। মেট্রোরেলে নারীদের জন্য আলাদা কেবিন রয়েছে। কিন্তু এখনো বিশেষায়িত কোচ নেই। এ কোচের প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু বিষয়টিকে টেকসই সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে হবে।

ফেরদাউস আরা বেগম: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), বিল্ড