বাংলাদেশের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কিউএস র‍্যাংকিংয়ে অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছে। যদিও অপেক্ষাকৃত নিচের দিকে তাদের মান। তবুও এই যে প্রবেশ করতে পারা এটাও কিন্তু একটা অর্জন বলব আমি। বিশ্বমানের শিক্ষার কথা যদি বলি আমরা, উদাহরণস্বরূপ কিউএস র‍্যাংকিং কীসের ওপর জোর দেয়? গবেষণা ও বৃত্তি, একাডেমিক সুনাম, শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত, কাজের মর্যাদা, নিয়োগদানে ফলাফল, বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা, বিদেশী শিক্ষার্থীর অনুপাত, বিদেশী শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা—এসব। যদি এ ক্রাইটেরিয়াগুলো দেখি, আমরা তাহলে কোন স্তরে আছি? আমাদের রিসার্চের সংখ্যা এখন কিছুটা বেড়েছে। কয়েকটা ইউনিভার্সিটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পাবলিকেশনের সংখ্যা বাড়িয়েছে, মানও বেড়েছে। কিন্তু আমি বলব, এখনো আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। টাইমস হায়ার এডুকেশনকে বলা হয় কিউএস থেকে একটু বেটার। সেখানে বাংলাদেশের কয়টা ইউনিভার্সিটি স্থান পেরেছে?

দ্বিতীয়ত, আমরা যেটা বলছি শিখন অভিজ্ঞতা এবং ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত। এখানে আমরা ভীষণভাবে পিছিয়ে আছি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও যেমন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো বেশি। প্রতি ২০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষকের মানদণ্ড সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই পূরণ করতে পারছে না। এখানে আমাদের অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের শুধু চাকরি পেলেই হবে না, কতটা ভালো প্রতিষ্ঠানে তারা চাকরি পেয়েছে, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনায় আমরা ভীষণভাবে পিছিয়ে। বিদেশী শিক্ষার্থীর সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষার্থীর রেশিও যদি বের করতে যাই, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে হবে শূন্য। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে, সেটাও অতি নগণ্য। তার পরও যেটা বলব, এসব ছাত্রও খুব একটা বেশি দেশ থেকে যে এসেছেন এমন নয়। আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে এবং আমাদের প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ থেকে। এক্ষেত্রেও আমাদের পরিস্থিতির উন্নতি করা প্রয়োজন।

ইউরোপ-আমেরিকা বা অন্য উন্নত দেশ থেকে আমাদের এখানে শিক্ষার্থী আসবে তা চিন্তা করা বাহুল্য।৷ কিন্তু আমরা প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতে পারি এবং বিশ্বের কম উন্নত দেশগুলো থেকে শিক্ষার্থী আনার বিষয়ে আমাদের চেষ্টা করতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো, ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাকাল্টি ও লোকাল ফ্যাকাল্টি। বাংলাদেশে কে পড়াতে আসবেন? আমরা কি তাদের যথাযথ সম্মানী দিতে পারব?

আমি আইইউবিএটির কথা বলি। আমাদের কিছু বিদেশী শিক্ষক আছেন যারা সামান্য টাকা নিয়েই পড়াচ্ছেন। কিন্তু সম্মানী দিয়ে বিদেশ থেকে শিক্ষক আনার জন্য যে টাকা প্রয়োজন তা বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে।

তবে এক্ষেত্রে একটা ভালো সুযোগ রয়েছে। সেটা হলো অনলাইনে কিছু বিদেশী শিক্ষককে নিয়োজিত করা এবং এটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় করছে। এখানে আমাদের শ্রম দিতে হবে। আমরা আবারো বলি, আমাদের ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শিক্ষক আনতে হবে তা নয়। আমাদের অঞ্চলের শিক্ষকদের আমরা চাইলে নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু আমরা পদক্ষেপ নিতে পারছি না,৷ এর জন্য সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। ভিসা ব্যবস্থার কিছুটা উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।

আমরা বলছি চারটি ক্রাইটেরিয়ার কথা। চারটির মধ্যেই আমাদের করণীয় আছে। ড. লুৎফর রহমান বলেছেন ইউজিসির কথা। আমাদের অবশ্যই অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল এ বিষয়ে বেশ এগিয়েছেন। যেহেতু গুণগত মানের কথা বলছি এবং জাতীয়ভবে তারাই দায়িত্বপ্রাপ্ত। সুতরাং আমার ধারণা ছিল ব্র্যাকের প্রেসিডেন্ট কিংবা সিনিয়র কেউ এখানে (সম্মেলনে) উপস্থিত থাকবেন।

এখন অ্যাক্রেডিটেশনে সমস্যা কী! যেসব ক্রাইটেরিয়া অ্যাক্রেডিটেশনে আছে সেগুলো আমরা অনেকেই কিন্তু পরিপূর্ণ করতে পারছি না। একটা ভালো পদ্ধতি চালু করতে পেরেছি। সেটা হচ্ছে ফলাফলভিত্তিক পড়াশোনা, যেটা আমাদের শিক্ষার গুণগত ও এমপ্লয়ি বাড়াতে যথেষ্ট সাহায্য করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, পদ্ধতিটি আমাদের খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়েই শুরু হয়েছে এবং যেখানে শুরু হয়েছে, যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যতটা গুণগত মানসম্মত হওয়া দরকার ছিল সেটাও হচ্ছে না।

আইকিউএসি হয়েছে, যার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়ন করা, কিন্তু সেটাও কম বিশ্ববিদ্যালয়েই কাজ করছে। তাদের কাজের পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়কে এই আইকিউএসি যথাযথ গুরুত্ব ও অর্থায়ন করতে হবে।

গবেষণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, আমরা দেখেছি গবেষণার প্রতি আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে। অর্থের সমস্যাও রয়েছে। তবে গবেষণায় অনীহাই বড় সমস্যা। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য টাকা দিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু তা যথাযথ ব্যয় হচ্ছে না। বিশ্বমানের গবেষণাপত্র যদি আমরা চাই, সেক্ষেত্রে গবেষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে এবং তাদের মোটিভেট করতে হবে। কেন তারা গবেষণা করতে চান না!

গবেষণার জন্য শিক্ষকদের যথাযথ সময়ের ব্যবস্থা করতে হবে, কোর্সের সংখ্যা কমাতে হবে৷ তাদেরকে প্রশিক্ষণ ও মোটিভেশন করার জন্য অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা আইইউবিএটিতে ছোটখাটো একটা ব্যবস্থা রেখেছি যেখানে প্রতিটি ইনডেক্স জার্নালে লেখা প্রকাশ হলে সম্মানী দিই এবং পাবলিকেশন করার জন্য সব সাপোর্ট দিয়ে থাকি। তাই আমি বলব, শিক্ষকদের যোগ্যতা নেই তা নয়, দক্ষতা নেই, সেটাও নয় তবে যোগ্যতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে। তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

একটা বিষয় নিয়ে আমরা খুব আলোচনা করি। গুণগত মানের সাসটেইনেবিলিটি প্রয়োজন। আমরা কিউএস র‍্যাংকিংয়ে দেখছি, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিচ্ছে, আবার বের হয়েও যাচ্ছে। কারণ সাসটেইনেবিলিটি নেই। সাসটেইনের বিষয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। আমি মনে করি, ছাত্র-শিক্ষকদের মেধা আছে যা দিয়ে বৈশ্বিক মানের উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু দরকার হচ্ছে আন্তরিক প্রচেষ্টা ও প্রতিশ্রুতি।

ড. আব্দুর রব: উপাচার্য, আইইউবিএটি

[‘উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক শিরোনামে বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন ২০২৪ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]