মধ্যবিত্ত শব্দটি আমাদের পরিচিত, বহুল প্রচলিত। মধ্যবিত্ত বললে যে চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশকের সৃজনশীল ব্যক্তি, বিশেষত সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃষ্টি। আয়ের দিক থেকে সচ্ছল, যাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের পর সপ্তাহে একটা ‘সিনেমায় যাওয়া’, ছয় মাসে না হলেও বছরে একবার দার্জিলিং বা পুরি ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ থাকে তারাই মধ্যবিত্ত। এরা নয়টা-পাঁচটা অফিস করে জামা-জুতো খুলে আয়েশ করে চা খায়। তারপর পান মুখে দিয়ে বন্ধুদের আড্ডায় গিয়ে বসে। বাড়ি ফিরে গিন্নির বাড়া ভাত খায়। আর গিন্নিরাও উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন না। চাকরির বালাই গিন্নিদের ছিল না, একটা-দেড়টা চাকরও থাকত। না থাকলেও দুপুরের মধ্যে সব কাজ শেষ করে এরা ভাতঘুম দিতেন বা একটা ‘‌নভেল’ নিয়ে কাত হতেন। কখনো বা পাশের বাড়ির গিন্নির সঙ্গে আড্ডা। 

এ পর্যন্ত লেখার শব্দচয়ন ও ভাব, দুটোতেই কলকাতার সুর স্পষ্ট। কেননা এই যে মধ্যবিত্তের কথা বলা হচ্ছে এরা পূর্ববঙ্গে ছিল না। যা-ও একটা শ্রেণী ছিল, তার ব্যাপ্তি খুবই কম। গত শতকের ত্রিশ বা চল্লিশের দশকে রমনার আশপাশে অধ্যাপকদের পরিবারগুলো কিছুটা এ ধারার ছিল। তাদের স্মৃতিকথা থেকেই পাওয়া যায় এ পরিচয়, জীবনযাপন। কিংবা সেক্রেটারিয়েটের একটু ওপরতলার কেরানি পরিবার। এর বাইরে পূর্ববঙ্গ এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের স্বরূপ ভিন্ন। কেননা পূর্ববঙ্গে সচ্ছলতা নানা কারণে আসেনি আর ওই ফিল্মি কিংবা কেতাবি ‘মধ্যবিত্ত’ মূলত ঔপনিবেশিক কলকাতায়/কলকাতার সৃষ্টি। সেই যে ‘‌কয় পাতা ইংরাজি শিখল, রাইটার্সে একটা চাকরী হলো’, তখন থেকেই এ শ্রেণীর উদ্ভব। সেকালে তাদের পরিচিতি হয়েছিল ‘ভদ্রলোক’ বলে। মধ্যবিত্ত ট্যাগটা এসেছে আরো পরে।

সে যাই হোক। পূর্ববঙ্গের—যা বাংলাদেশ হয়ে গেছে—স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সাহিত্য বা সিনেমায় উপর্যুক্ত মধ্যবিত্তের ছাপ কম। হয় উচ্চবিত্ত পাওয়া যায়, নয় নুন পান্তার জোগাড় করে আর কিছু থাকে না এমন মানুষদের কথাই বেশি এসেছে। মধ্যবিত্ত বলতে গত দশকেও যাদের বোঝানো হতো, আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য রেখে সুখে দিন গুজরান করা সেই মানুষেরা স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনাকালে ছিল না। কিন্তু এর পরপর কলকাতার হাওয়া কিংবা শাসক ও শাসন পরিবর্তনে একটা নতুন ধরনের শ্রেণী তৈরি হয়েছিল। পুরোপুরি তৈরি না হলেও একটা কাঠামো দেয়া হয় যাদের মধ্যবিত্ত বলা চলে। সাহিত্য থেকেই প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম দিককার উপন্যাসে (শঙ্খনীল কারাগার, নন্দিত নরকে ইত্যাদি) এদের পাওয়া যায় না। মাহমুদুল হকেও নেই। আবুল ফজলের ‘পরাবর্তন’ যে পরিবারকে দেখায় তা আমাদের মানসে থাকা ‘মধ্যবিত্ত’ নয়। জহির রায়হানের ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ তো বরং নিম্ন মধ্যবিত্তের কথাই বলে। শওকত আলীতে আছে (দলিল, ওয়ারিশ) কিন্তু তারা সচ্ছল হলেও দিনশেষে হিসাব মেলাতে বসতে হয়। 

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের সিনেমার দিকে যদি নজর দিই সেখানেও সুখী মধ্যবিত্তের ছাপ নেই। নারায়ণ ঘোষ মিতার ১৯৭৪ সালের ‘আলোর মিছিল’ সিনেমায় আমরা বরং দেখি মানুষের লোভী হয়ে ওঠার গল্প। অর্থাৎ, সে সময়টিতেও মানুষ মাঝামাঝি অবস্থানে থাকতে চাইত না। প্রায়-মধ্যবিত্ত কিছু মানুষ ছিল তারাও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বড় হওয়ার চেষ্টা করত। আর বাকিরা বেকারত্ব, অর্থাভাব, অনিয়মের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। মধ্যবিত্তকে যদি একটি শ্রেণী হিসেবে ধরতে হয় তবে বাংলাদেশে তাদের দেখা মেলে হুমায়ূন আহমেদের পরবর্তী সময়ের উপন্যাসগুলোয়। উপন্যাস জীবনেরই প্রতিচ্ছবি এবং বাস্তব অনুসরণ করেই উপন্যাসের গল্প তৈরি হয়।

আশির দশকের শেষ দিক থেকে মধ্যবিত্ত একটি শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল বাংলাদেশে। পরিবারটি সচ্ছল, কিঞ্চিৎ সাহিত্যচর্চা করে, মাসান্তে সিনেমা দেখে, পরিবারের ছেলেটি স্নাতকোত্তরে পড়ছে, মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে স্নাতক পড়তে পড়তে ইত্যাদি। সংসার সচ্ছল এবং এই পরিবারের কর্তারা শেষ বয়সে হয়তো এক টুকরো জমি কিনে ফেলতে পারেন। সামর্থ্য হয় আরকি। সরকারি চাকরি বা ভালো বেসরকারি চাকরির গুণে এ ধরনের অনেক পরিবার ঢাকা এমনকি মফস্বলেরও ছিল। বাংলাদেশে চল্লিশ বছরের আশপাশের নাগরিকদের মধ্যে নব্বই দশকের একটি নস্টালজিয়া দেখা যায়। তারা মধ্যবিত্তের এ গল্পগুলো বলেন। পরিমিত চাওয়া-পাওয়া ও সচ্ছলতার গল্প। তার সঙ্গে থাকে শৌখিনতা, শিল্পচর্চার কথা। বস্তুত, নব্বইয়ের দশকের আপাত শান্ত ঢাকার নাগরিক জীবনে গণতন্ত্রের ছোঁয়া ও মফস্বলে তার প্রভাবের কারণে শিল্প, কলা ও সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। এ বিষয়গুলোতে অবদান ও অংশগ্রহণ ছিল মধ্যবিত্তের। কিন্তু এসব টিকে ছিল গত দশক পর্যন্ত। এরপর থেকে শুরু হয়েছে মধ্যবিত্তের ক্ষয়। 

মধ্যবিত্তের যে ‘আইডিয়া’টা আমাদের মধ্যে আছে সেই মধ্যবিত্তের অস্তিত্ব এখন আর নেই। কেননা সচ্ছলতা নেই। আমাদের জিডিপি বাড়ছে বলে আমরা শুনি, মাথাপিছু আয় বাড়ার কথা শুনি কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে এর প্রভাব দেখা যায় না। মূল্যস্ফীতির কারণে সে চিড়ে-চ্যাপ্টা। মধ্যবিত্তের ধারণার মধ্যে একটি বড় অংশ ছিল সঞ্চয়। কিন্তু এখন মধ্যবিত্ত সঞ্চয় করতে পারে না। না পারার কারণ তার খরচ বৃদ্ধি। ঢাকা শহরের মধ্যবিত্তদের আয়ের একটি বড় অংশ বাড়ি ভাড়ায় খরচ হয়। কখনো সেটা পরিবারের আয়ের ৪০ শতাংশ। এরপর আসে পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ। দুই ক্ষেত্রেই খরচ কেবল বেড়ে চলছে। এর ফলে থাকছে না সঞ্চয়। বাংলা ভাষার সেই পুরনো প্রবাদ ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ এককালে নিম্নবিত্ত বা সোজা কথায় দিনমজুরদের ক্ষেত্রে প্রচলিত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো এখন এ দশা তথাকথিত মধ্যবিত্তের।

‘তথাকথিত মধ্যবিত্ত’, কেননা এখন আদতে মধ্যবিত্ত বলতে কিছু নেই। তাদের ক্ষয় চলছে। এ ক্ষয় দুই রকম। প্রথমত মধ্যবিত্ত বলতে যে অর্থনৈতিক শ্রেণীকে বোঝানো হতো তাদের সংখ্যা কমছে। বিশ্বজুড়ে একটি পরিচিত অর্থনৈতিক ঘটনা হলো—গরিব মানুষ আরো গরিব হচ্ছে এবং ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে। এ মাসের শুরুতেই বণিক বার্তার একটি রিপোর্টে দেখা গেল মহামারীর মধ্যেও দেশে ধনীর সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে আমরা দেখেছি মহামারীর মধ্যে বহু ‘মধ্যবিত্ত’ শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কেননা তাদের আয় কমে গেছে। মধ্যবিত্ত জীবনযাপন ধরে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ‘মধ্যবিত্ত’ ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। এজন্য তৈরি হয়েছে দুটি শব্দবন্ধ—উচ্চ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত। এ দুটো শব্দবন্ধ আমাদের বুঝিয়ে দেয় আদতে মধ্যবিত্ত বলতে কিছু নেই। থাকলে নতুন দুটো আইডিয়া চালু করতে হতো না।

সাহিত্য ও সিনেমায় মধ্যবিত্তকে এক রকম মহান করে দেখানোর চেষ্টা ছিল, এখনো আছে। তবে স্বল্পদৈর্ঘ্যের হলেও মধ্যবিত্তের সত্যিই একটা ইতিবাচক ইতিহাস আছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে সাহিত্য, রাজনীতিতে তাদের অবদান ছিল। এ দেশের বহু নীতিনির্ধারক উঠে এসেছেন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। যেকোনো আন্দোলনেও তারা থাকতেন পুরোভাগে। কিন্তু সেই মধ্যবিত্ত এখন গা বাঁচিয়ে চলে। অন্যদিকে টিকে থাকাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। কেননা নুন আনতে পান্তা ফুরানোর কারণে জ্ঞানচর্চার ক্ষমতা তার থাকে না। শিল্প-সাহিত্য চর্চায়ও আর মন নেই। এটাই মধ্যবিত্তের দ্বিতীয় ক্ষয়। অর্থাৎ নৈতিক দিক থেকে তারা ক্ষীয়মাণ। মধ্যবিত্তরা নিজেরাই তাদের এ শ্রেণীতে টিকে থাকতে চায় না। উচ্চবিত্ত হতে চায় যেনতেন প্রকারে। রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল শহরগুলোতেও তুমুল প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতাটি সুস্থ হলে কিছু অর্থনৈতিক ও নৈতিক উন্নতিরও সুযোগ ছিল। কিন্তু কোনোমতে টিকে থাকা উচ্চাভিলাষী কিছু মধ্যবিত্ত নীতির ধার ধারে না। তারা বড় হতে চায়। রোজগার বাড়িয়ে ‘বড়লোকী’ করতে তারা নানা দুর্নীতিতে ঢুকে পড়ে। আরেকটা অংশ আছে তারা অতটা মরিয়া হতে পারে না। তাদের আয় বাড়ে না কিন্তু ব্যয় বাড়ে। উচ্চবিত্তদের অনুকরণে নিজেকে সাজাতে গিয়ে ব্যাপারটা হয়ে ওঠে বাঁদরের অনুকরণের গল্পের মতো।   

মধ্যবিত্তের বর্তমান আইডেন্টিটিটা ঠিক করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এরা কফিশপে যায়, বুকশপে গিয়ে ছবি তোলে, চাকুরেরা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হ্যাং আউট করে কোনো রেস্টুরেন্টে, ছয় মাসে একবার ঘুরতে যাবে ‘পাহাড়ে’ কিংবা সমুদ্রে। কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যায় বুকশপে গিয়ে বই তারা কেনে না বা কিনলেও প্রচলিত কথায় সেরা লেখকের বেস্টসেলার বইটা। যদিও বইয়ে কী লেখা তাদের অনেকেই জানে না। বুদ্ধদেব বসুর ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ গল্পে উচ্চবিত্তের শোকেসে না পড়া দামি বই সাজানো ছিল আর এখন ‘মধ্যবিত্ত’ হতে বেস্টসেলার বইয়ের ছবি ফেসবুকে থাকতে হয়। বিষয়টা ঢুকে গেছে আমাদের বর্তমান নাগরিক কালচারে। মাথাপিছু আয় কমে যাওয়া এই শহরে বহু রেস্টুরেন্ট ও কফিশপ আছে যেখানে একালের তরুণ মধ্যবিত্তরা যায়। কখনো কখনো কফিশপে গিয়ে কফির দাম দেয়ার পর বাসভাড়া থাকে না। তবু যাওয়া চাই। দেখানোপনার কারণে হারিয়ে গেছে সুকুমারবৃত্তির চর্চা। সুনীল, সত্যজিৎ কিংবা হুমায়ূনের মধ্যবিত্তের একটা রুচি ছিল, সেটা এখন আর নেই। কেননা রুচির চর্চাই নেই। যা আছে সেটা পাল্লা দেয়ার প্রবণতা। তথাকথিত মধ্যবিত্তরা অবশ্য সেখানেও ব্যর্থ।  

অর্থনীতির দিক থেকে দেখতে গেলে মধ্যবিত্ত বলা যায় এমন পরিবার এখন খুবই কম। যারা নিজেরা নিজেদের মধ্যবিত্ত বলে মনে করে বা এখনো পরিচয় দেয় এরা বহু আগেই নিম্নবিত্তের কাতারে চলে গেছে। দুয়েকটা পরিবার টিকে আছে এখনো তবে তারা বিলুপ্তির মুখে। আর শিল্প-সাহিত্য চর্চা, রাজনীতিসচেতন মধ্যবিত্তরা হারিয়ে গেছে আরো আগে। শুধু, ‘না করলে মানসম্মান থাকে না’, ‘লোকে কী বলবে’ মানসিকতা বাদে মধ্যবিত্তের কিছু এখন আর নেই। তাদের ক্ষয় শুরু হয়েছিল আগেই, মহামারীর অভিঘাত এ শ্রেণীকে নামিয়ে এনেছে বাস্তবের ভূমিতে। বুঝিয়েছে, মধ্যবিত্ত বিলুপ্তপ্রায়। নব্বইয়ের দশকের নস্টালজিয়া যারা চর্চা করে তাদের মধ্যে মধ্যবিত্তের ধারণাটা এখনো টিকে আছে। অন্যভাবে বলা যায় আমাদের নাগরিক কালচারে মধ্যবিত্ত টিকে আছে কেবল নব্বইয়ের নস্টালজিয়ায়। 


মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক