জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নাগরিক সমাজের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকেও আপনারা বেশ কয়েকজন সামনের সারিতে ছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে শুরুতে ওই সময়ের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি বা কী ধরনের চাপ ছিল জানতে চাই।

চাপ অবশ্যই ছিল। সে চাপ মূলত এ কারণে যে মানুষ মারা যাচ্ছিল, ছাত্রদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ওই চাপের সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হয় না। সময়টা ছিল একেবারেই ভিন্ন। আমরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারতাম না, খেতে পারতাম না। মনে হতো, এত মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে—এর কি কোনো বিচার হবে না?

যে তরুণদের মারা হচ্ছিল, তাদের মরদেহ, ভিডিও দেখা, সংবাদপত্রে এসব খবর পড়া আমাদের ভীষণ মানসিক চাপের মধ্যে ফেলেছিল। সে চাপটা ছিল মূলত দায়িত্ববোধ থেকে। মনে হতো, এখানে আমাদের কিছু করার আছে। এর বাইরে ব্যক্তিগত কোনো চাপ ছিল না। আমাদের চিন্তা ছিল, তৎকালীন সরকারকে কীভাবে জবাবদিহির মধ্যে আনা যায়। তবে একটা সময় এসে মনে হলো, শুধু জবাবদিহির চেষ্টা করে আর লাভ নেই; অন্য পথে যেতে হবে। বিশেষ করে ২ আগস্টের দ্রোহযাত্রার আগে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমি যেহেতু আয়োজকদের একজন ছিলাম, সবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ১৯ জুলাই থেকেই দ্রোহযাত্রার পরিকল্পনা চলছিল। কিন্তু ৩১ জুলাই এসে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলো—রাজনৈতিক দলগুলোকে সক্রিয়ভাবে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হবে কিনা।

জুলাই অভ্যুত্থানের সমন্বয়কদের ছেড়ে দেয়ার পর আমরা শহীদ মিনারে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচিতে ছিলাম। সেখান থেকে ডিবি কার্যালয়ের সামনে যাওয়ার আগে নাগরিক সমাজের আরেকটি কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে যাই। সেখানেই সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে একের পর এক ফোন আসতে থাকে—আন্দোলন এখন কীভাবে এগোনো হবে।

দ্রোহযাত্রার সিদ্ধান্ত আগেই নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকা হবে কিনা, সেটি ছিল আলাদা সিদ্ধান্ত। শেষ পর্যন্ত ১ আগস্ট আমরা সিদ্ধান্ত নিই তাদের আহ্বান জানানো হবে। তখন যেসব রাজনৈতিক দলের কথা আমাদের মাথায় এসেছে, তাদের সবার সঙ্গেই যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। আমার মনে আছে, সম্ভবত প্যালেস্টাইন সংহতি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ডা. হারুন অর রশিদ আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি জানতে চাইলেন, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। আমি যাদের নাম মনে এসেছে, সবার কথাই বলেছি।

একপর্যায়ে রাষ্ট্রচিন্তার কাকে কাকে বলা হবে সেটা নিয়েও কথা হচ্ছিল। তখন জাকিয়া শিশির আপা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বিএনপিকে কি বলা হবে?’ আমি বলেছিলাম, ‘বিএনপির কাউকে তো আমি চিনি না। আপনি চেনেন?’ তিনি বললেন, ‘রাজনৈতিক দল, না চিনলেও সমস্যা কী?’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, তাহলে বলেন।’

আমরা তখন নারীবাদী সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, অভিভাবকদের সংগঠন, শিক্ষকদের সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, বিক্ষুব্ধ নাগরিক, বিক্ষুব্ধ থিয়েটারকর্মী—সব ধরনের সংগঠনকেই আহ্বান জানাচ্ছিলাম। তাহলে রাজনৈতিক দলকে বাদ দেব কেন।

রাজনৈতিক দলকে ডাকা হবে কি হবে না—এ দোলাচলের পেছনে কোনো বিশেষ কারণ ছিল?

অবশ্যই ছিল। জনসম্পৃক্ততার দিক থেকে রাজনৈতিক দলগুলো বড় অংশীদার—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা ছিলেন, কিন্তু প্রকাশ্যে ছিলেন না। আমার মনে আছে, বিএনপিও সম্ভবত একটি বিবৃতি দিয়েছিল এ আন্দোলনের সঙ্গে তারা নেই—এ ধরনের কিছু।

ধরুন, ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে এ ক্যাম্পাসেই অপরাজেয় বাংলার সামনে শহীদদের মরদেহ ছুঁয়ে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়াসহ সব রাজনৈতিক দলের নেতারা শপথ নিয়েছিলেন তারা এরশাদকে মানবেন না। কিন্তু ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে সে দৃশ্য দেখা যায়নি। কারণ ততদিনে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোকে এমনভাবে দমন-পীড়ন করা হয়েছিল তাদের প্রকাশ্যে সামনে আসা আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকরও হয়ে যেতে পারে, এমন একটা আশঙ্কা ছিল। তবে ৩১ জুলাই বা ১ আগস্টে এসে সে হিসাব করার সুযোগ আর ছিল না। তখন আমাদের মনে হয়েছিল, এখন সবাইকে রাস্তায় নামতেই হবে। না হলে কারো বেঁচে থাকার উপায় থাকবে না। আমরা মোটামুটি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম।

সম্প্রতি তানজিম ভাইয়ের (ড. তানজিম উদ্দিন খান) একটি সাক্ষাৎকার পড়ার সময় মনে পড়ল, ১ বা ২ আগস্ট থেকেই আমি শুনতে শুরু করি যে গ্রেফতারের তালিকায় আমার নাম ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে আসছে। এগুলোও এক ধরনের চাপ তৈরি করত। অনেকে ফোন করে বলতেন, ‘বাসায় থেকো না।’ কিন্তু আমি ভাবতাম, বাসায় না থেকে কোথায় যাব? আমি যদি পালিয়ে যাই, তাতে কী লাভ? বাসায় আমার পরিবারের সবাই আছে। তাদেরই যদি ধরে নিয়ে যায়? আমার মা-বাবা আছেন, তাদের বয়স হয়েছে। আমার নিজের সন্তানও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আমি পালিয়ে থাকলাম, আর তাকে নিয়ে গেল—তাহলে লাভ কী? এ কারণে আমি বাসা ছেড়ে কোথাও যাইনি।

চাপ অবশ্যই ছিল। কিন্তু তখন এত মানুষ মারা যাচ্ছিল যে ব্যক্তিগত ভয় বা চাপ—এসব আর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।

তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের দাবির সঙ্গে নতুন সরকারের একটি রূপরেখা নিয়েও আপনাদের ভাবনা ছিল। আমরা দেখেছি, এ নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনও করা হয়েছিল। তখন কি আপনাদের মনে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম ছিল, নাকি শুধু একটি কাঠামোর কথা ভেবেছিলেন?

না, আমরা কারো নাম বলিনি। ২ আগস্ট দ্রোহযাত্রা শেষ হওয়ার পর শহীদ মিনারের বড় গাছটার নিচে দাঁড়িয়েই আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিই। তখন আমাদের মনে হচ্ছিল, ছাত্রদের একটা দিকনির্দেশনা দরকার। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা দেখেছি, দ্রুত সবকিছু ছাত্রদের হাতছাড়া হয়ে যায়। রাজনৈতিক দলগুলো পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, পরে তারা যে বন্দোবস্ত করেছে, ছাত্রদের সেটাই মেনে নিতে হয়েছে। অনেক ছাত্রনেতাও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেই যুক্ত হয়েছেন। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, এবার যেন সেটা না হয়।

সে সময় আমরা ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপে খুব একটা যোগাযোগ করতাম না। আমাদের ধারণা ছিল, সবকিছু নজরদারিতে আছে। তাই যারা দ্রোহযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন, তাদের নিয়েই সরাসরি আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিই। আমরা গীতি আরা আপার বাসায় যাই। জুলাইজুড়েই আমরা এভাবেই কাজ করেছি—যাদের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়েছে, তাদের সঙ্গেই কথা বলেছি। যারা উপস্থিত নেই, তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছি।

সেদিন প্রায় ১৫-২০ জন ছিলাম। তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন, যারা ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ছিলেন। তারা বারবার জোর দিচ্ছিলেন, ছাত্রদের অবশ্যই একটা হিস্যা থাকতে হবে। কিন্তু সেটা কীভাবে থাকবে—তারা কি সরাসরি সরকারের অংশ হবে? এখানেই আমরা ভিন্নভাবে চিন্তা করি। আমাদের মনে হয়েছিল, যে সরকারের অংশ হবে, সে তো ব্যবস্থারই অংশ হয়ে যাবে। তখন সে আর জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে থাকবে না। তাই আমাদের প্রস্তাব ছিল শিক্ষার্থীরা একটি ছায়া সরকার গঠন করবে। অন্তর্বর্তী সরকারে থাকবেন নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি, যেমনটি আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেখা গেছে। এছাড়া আমাদের মাথায় কোনো ব্যক্তির নাম ছিল না। আমরা ব্যক্তি নিয়ে ভাবিনি, ভেবেছি কাঠামো নিয়ে।

একটা বিষয় খেয়াল করবেন ২ বা ৩ আগস্টের সময়টা ছিল একেবারেই অন্য রকম। তখন সবার ভাবনা ছিল অনেক বড়, আকাঙ্ক্ষাও ছিল অনেক বড়। ব্যক্তি তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, গুরুত্বপূর্ণ ছিল সমষ্টি। আমরা ভেবেছি, এমন কী ধরনের ব্যবস্থা হতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীদের যে আকাঙ্ক্ষা, সে অনুযায়ী রাষ্ট্রকে বদলানো যায়।

আমাদের মনে হয়েছিল, শুধু অরাজনৈতিক নাগরিক ব্যক্তিরা এটা করতে পারবেন না। আবার রাজনৈতিক দলগুলোও স্বাভাবিকভাবেই প্রক্রিয়াটিকে নিজেদের দিকে টানতে চাইবে। তাই এ দুইয়ের মাঝখানে থেকে মূল জবাবদিহির কাঠামোটি শিক্ষার্থীদের তৈরি করতে হবে—এটাই ছিল আমাদের ভাবনা।

আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখা কয়েকজন শিক্ষার্থীও অন্তর্বর্তী সরকারের অংশ হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার আরো কয়েকটি দেশেও জেনারেশন জেডের নেতৃত্বে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সরকার গঠন হতে দেখা গেছে। যদিও পরে সেসব দেশেও নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে; সফলতা না ব্যর্থতা—কীভাবে দেখছেন?

সফলতা বা ব্যর্থতার মূল্যায়ন হয়তো আরো পরে ভালোভাবে করা যাবে। এ মুহূর্তে আমি বরং আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের সময় যে সাহস, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, সেটাকে সামনে রাখতে চাই। একই সঙ্গে মনে রাখতে চাই, শহীদদের রক্তের বিনিময়ে এ ব্যবস্থা বদলেছে। তাই সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে শহীদদের পরিবারের ন্যায়বিচারের অধিকার এবং আহতদের পুনর্বাসনের অধিকার। এরপর আসবে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন।

দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতাগুলো একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এখানে কাঠামোগত পার্থক্য রয়েছে। প্রথমে শ্রীলংকা, তারপর বাংলাদেশ, এরপর নেপাল—আর সাম্প্রতিক সময়ে ভারতেও তরুণদের বড় ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে এ তিন দেশের একটি মৌলিক পার্থক্য আছে—ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক শক্তিশালী।

এ কথা বলায় অনেকে আমাকে ভারতের পক্ষের মানুষও বলতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গণতান্ত্রিক সমাজে আন্দোলন থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে। পার্থক্য তৈরি করে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। সেগুলো কার্যকর থাকলে হঠাৎ করে সরকার পতনের পরিস্থিতি তৈরি হয় না। অভিযোগ উঠলে পদত্যাগ, দায়িত্ব হস্তান্তর—এসব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হয়। ভারতে আমরা সেটা দেখেছি, কিন্তু বাকি তিন দেশে দেখিনি।

এ তিন দেশের মধ্যে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালোভাবে সামলেছে শ্রীলংকা। নেপাল এখনো খুব অস্থির। শ্রীলংকা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকতে পেরেছে, কারণ তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংকট হলো প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। সম্প্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। সেখানে তিনি বলছিলেন, উপাচার্য হওয়ার জন্য মানুষ টাকা নিয়ে ঘুরছেন। শেখ হাসিনার সরকার চলে যাওয়ার পর আমি নিজেও এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। মানুষ ধরে নিয়েছিল, আমরা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি। ফলে অসংখ্য মানুষ আমাকেও সিভি পাঠিয়েছেন। আমি তাদের অনেককেই চিনি না। তখন আমার প্রশ্ন ছিল আমাকে কেন সিভি পাঠাচ্ছেন?

এ ঘটনাই বলে দেয়, একজন উপাচার্য নিয়োগের যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া থাকার কথা, সেটাই আমরা টিকিয়ে রাখতে পারিনি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ থাকে। অথচ সেখানেই নিয়ম নেই, নীতিমালা নেই, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি নেই। সবকিছু ভেঙে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত একমাত্র কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সঙ্গে না থাকলে কিছুই করা যেত না। এখন আওয়ামী লীগ নেই। প্রশ্ন হলো, এ শূন্যস্থান কী দিয়ে পূরণ হবে? যদি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আগে থেকেই থাকত, তাহলে সে কাঠামোর মধ্য দিয়েই পরিবর্তন সামাল দেয়া যেত। সেটা সম্ভব হয়নি। তাই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা।

অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আপনার কি মনে হয়, সেক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে?

দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমি সে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয় থেকে আসছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যাদের নির্দলীয় বা নিরপেক্ষ শিক্ষক বলা হয়েছিল, তাদের অনেকেরই রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন আবার দেখছি, অনেক ক্ষেত্রেই বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আসছেন।

আমার কথা হলো, বিএনপি স্বাভাবিকভাবেই তাদের পরিচিত মানুষকেই চিনবে, তাদের মধ্য থেকেই কাউকে উপাচার্য করতে চাইবে। কিন্তু অন্তত কিছু যাচাই-বাছাই হওয়া দরকার।

সাধারণভাবে যেসব শিক্ষকের গবেষণার শক্তিশালী ভিত্তি আছে, যারা একাডেমিক উৎকর্ষ অর্জন করেছেন, তারা বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের কাজে যুক্ত থাকেন, গবেষণা করেন। তাদের সময়ও থাকে না, আবার কোনো নেতার পেছনে ঘুরে বেড়িয়ে ‘আমাকে উপাচার্য বানান’—এ ধরনের অনুরোধ করার মানসিকতাও থাকে না। ফলে শঙ্কা থেকেই যায়, যারা এসব পদের জন্য সক্রিয়ভাবে দৌড়ঝাঁপ করেন, তাদের অনেকেরই আসলে সে অবকাশ আছে বলেই তারা এটা করতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যদি অন্তত এ রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে যাওয়া যেত, তাহলে মনে হতো আমরা সত্যিই নতুন কোনো বন্দোবস্তের দিকে এগোচ্ছি। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা আমি বলতে পারি না। তবে আমার আশপাশে যা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে পুরনো চর্চাই ফিরে আসছে।

আওয়ামী লীগের সময় যদি আপনি দল না করতেন, তাহলে আপনাকে নানাভাবে চাপের মধ্যে রাখা হতো। সম্প্রতি আমি ও তানজিম স্যার এ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখেছি। সেখানে দেখিয়েছি, এ নিপীড়ন চাকরি হারানো থেকে শুরু করে শারীরিক হামলা, মিথ্যা মামলা, এমনকি গুম ও হত্যার পর্যায় পর্যন্ত গিয়েছে। শিক্ষকও এর শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি ছিল প্রশাসনিক হয়রানি—ছুটি না দেয়া, পদোন্নতি আটকে রাখা, আপনার বৈধ গবেষণাকেও অকার্যকর বলে দেখানো, ছোট ছোট প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা। বর্তমানে যদি একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটে, তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়?

ধরুন আগে আপনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কিছু লিখেছেন বলে আপনার চাকরি চলে যেত। এখন যদি অন্য কাউকে নিয়ে লেখার কারণে আরেকজনের চাকরি চলে যায়, তাহলে কী বদলাল? কিছু বদলায়নি।

এটা অবশ্যই দুঃখজনক যে আমরা সে সুযোগটা কাজে লাগাতে পারিনি। এজন্য হতাশ হয়ে যাওয়ারও কারণ নেই। প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা খুব কঠিন কাজ। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি শ্রম লাগে। কিন্তু আমরা অনেকেই সে পরিশ্রম করতে চাই না। সবাই দ্রুত ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হতে চায়। আরেকটি বড় বিষয় নিয়োগ। যদি আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা মেধাবীদের নিয়োগ দিতে না পারি, যদি রাজনৈতিক পরিচয়ই প্রধান বিবেচনা হয়ে যায়, তাহলে আগের সময়ের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কোথায়? অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক দলের লোক নিয়োগ পেয়েছে, বর্তমানে অন্য দলের লোক নিয়োগ পাচ্ছে। তার আগে ১৫ বছর ধরে আরেকটি দলের লোক সুবিধা পেয়েছিল। এতে কী বদলাল? কিছুই বদলায়নি। ফলে ছাত্ররাও আবার রাজনৈতিক শিক্ষকদের পেছনে ঘুরবে, তাদের ব্যক্তিগত কাজ করবে। একই সংস্কৃতি আবার ফিরে আসবে।

এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

শিক্ষক রাজনীতি একটা কঠিন জায়গায় পৌঁছে গেছে। এখন যেমন হয় এই পক্ষ, না হয় ওই পক্ষ—এটাই বাস্তবতা। এ কারণেই আমি বারবার বলছি, আমাদের একাডেমিক স্বাধীনতার জায়গায় ফিরে যেতে হবে।

আওয়ামী লীগের আমলে নীল দলের শিক্ষকরা যেসব কাজ করেছেন বলে আমরা সমালোচনা করেছি, বিএনপির আমলে যদি সাদা দলের শিক্ষকরা একই কাজ করেন, তাহলে সেটারও সমালোচনা করতে হবে। কিন্তু আমরা সেটা করতে পারছি না।

কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যা হয়, আমরা মধ্যবিত্ত মানসিকতার মধ্যে আটকে থাকি। শিক্ষকরা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণীরই অংশ। মধ্যবিত্ত সাধারণত ক্ষমতাকে খুব বেশি চ্যালেঞ্জ করতে চায় না। তারা একটা নিরুপদ্রব জীবন চায়, যেখানে এদিকের মানুষকেও চেনা থাকবে, ওদিকের মানুষকেও চেনা থাকবে। যে-ই ক্ষমতায় আসুক, নিজের অবস্থান যেন ঠিক থাকে।

কিন্তু একজন একাডেমিকের কাজ শুধু নিজের অবস্থান ধরে রাখা নয়। তার মূল কাজ হলো ক্ষমতাকে প্রশ্নের মধ্যে রাখা। এ জায়গায় অনেক বাধা আছে। ভয় আছে। বেশির ভাগ মানুষই সে ভয়ের কারণে পিছিয়ে যায়।

আপনি বলেছেন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কঠিন কাজ। এ কঠিন কাজের শুরুটা কীভাবে করা যেতে পারে?

অনেক কিছুই করা যায়। প্রথম শর্ত, নৈতিকভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিয়োগের ক্ষেত্রে সেরাদের মধ্যে সেরাকে নেয়া হবে। কিন্তু সেটা করা যায় না, কারণ রাজনৈতিক আনুগত্য কাজ করে। সে আনুগত্যের কাছে নতজানু হয়ে পড়তে দেখা যায়। তাই প্রথমেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক আনুগত্যের বাইরে নিয়ে আসতে হবে।

আমার মনে হয়, রাজনৈতিক আনুগত্যকে যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যয়বহুল করা না যাবে, ততক্ষণ পরিবর্তন আসবে না। এখন রাজনৈতিক আনুগত্য থাকলেই সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু যদি সেটাই উল্টো ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, তখন মানুষ নিজের যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেবে।

রাজনীতি করা আর ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতাবানদের পেছনে ঘোরা দুই জিনিস এক নয়। বাজার করা, তোষামোদ করা, ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে শিক্ষক হওয়ার সংস্কৃতিটাকেই যদি ব্যয়বহুল করে তোলা যায়, তাহলে এ আচরণ অনেকটাই কমে আসবে। তখন যোগ্যতাই প্রধান হয়ে উঠবে।

সম্প্রতি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি সেমিনার হয়েছে, যেখানে তারা জুলাইকে কীভাবে দেখছে, তা নিয়ে গবেষণার ফল তুলে ধরেছে। আপনি শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করেন। তাদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি আপনার কাছে শুনতে চাই।

সেখানে মোট পাঁচজন শিক্ষার্থী তাদের গবেষণার ফল উপস্থাপন করেছে। সবাই স্নাতক পর্যায়ের মনোগ্রাফ করেছে। দুজন কাজ করেছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে, বাকি তিনজন অভ্যুত্থান কীভাবে সফল হলো, মাইক্রো-মোবিলাইজেশনের কৌশল কী ছিল এসব নিয়ে।

যারা পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করেছে, আমার মনে হয়েছে তারা বাস্তবতাকে খুব সফলভাবে ধরতে পেরেছে। বিশেষ করে দুজনই জেন্ডার পারস্পেক্টিভ থেকে কাজ করেছে। নারীদের বিরুদ্ধে যে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার (ডিলেজিটিমাইজেশন) প্রক্রিয়া চলেছে, বিশেষ করে সাইবার স্পেসে, সেটা তারা বিশ্লেষণ করেছে।

সাইবার স্পেস তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেখানে কীভাবে নারীদের এবং ভিন্ন রাজনৈতিক কণ্ঠগুলোকে চুপ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে, কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এসবের একটি টাইপোলজিও তারা তৈরি করেছে।

যারা মাইক্রো-মোবিলাইজেশন নিয়ে কাজ করেছে, তারা আন্দোলনটিকে কোনো একক গোষ্ঠীর সাফল্য হিসেবে দেখেনি। তারা বুঝতে চেয়েছে, কী কী কাঠামোগত কারণ ছিল, কী সাংস্কৃতিক কারণ ছিল এবং কীভাবে বিভিন্ন মোবিলাইজেশন কৌশল সে সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল বলেই কার্যকর হয়েছিল। একই কৌশল অন্য সময়ে হয়তো কাজ নাও করতে পারে। তারা মূলত সে প্রক্রিয়াটাই ব্যাখ্যা করেছে। আমি শিক্ষার্থীদের নিয়ে সবসময় আশাবাদী।

১০ বা ১২ জুলাই আমরা কেউ ভাবিনি শেখ হাসিনার পতন হবে। সম্ভবত ২৫ বা ২৬ জুলাইয়ের পর সে সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে শুরু করি। অথচ আমরা চোখের সামনে একটি অসম্ভব ঘটনাকে ঘটতে দেখেছি। তাহলে আরো ইতিবাচক, আরো অসম্ভব পরিবর্তন কেন সম্ভব হবে না?

অবশ্যই তার জন্য অনেক কাজ করতে হবে, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

জুলাইয়ে যে অসাধারণ শক্তির বিস্ফোরণ আমরা দেখেছি, আমি মনে করি সে শক্তি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তরুণদের মধ্যে এখনো সে শক্তির কিছুটা রয়ে গেছে। অনেকেই হতাশ হয়েছে, এটা আমি মানি। সে হতাশার মধ্যেও তাদের মধ্যে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে।

এ সমালোচনামূলক দৃষ্টিটাকে ধরে রাখতে হবে। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে হবে। তবে সভ্য ও নাগরিক উপায়ে। মব তৈরি করে নয়, মিথ্যা প্রচার করে নয়, অন্যের অধিকার খর্ব করে নয়।

আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজও অনেক বাড়াতে হবে। আন্দোলন আমরা করেছি, কিন্তু এরপর কোন পথে এগোব, সে চিন্তার কাজ তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। মানুষ যখন রাস্তায় নামে, তখন তাকে নেতৃত্ব দিতে খুব মৌলিক কিছু স্লোগানই যথেষ্ট। কিন্তু মানুষ যখন ঘরে ফিরে যায়, তখন আর শুধু সে স্লোগান দিয়ে তাকে উদ্বুদ্ধ করা যায় না। তখন দরকার হয় গভীর চিন্তা, দর্শন, আদর্শ, নতুন ধারণা। আজকের তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারে, এমন সমালোচনামূলক সংস্কারের ধারণা তৈরি করতে হবে।

আমি যখন প্রশ্ন তোলার কথা বলি, তখন তা কখনই অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়া নয়, কারও বেঁচে থাকার অধিকার অস্বীকার করা নয়, কিংবা মিথ্যা প্রচার করা নয়। অথচ আমরা দেখছি, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনেকেই এখনো কোনো আত্মসমালোচনা ছাড়াই একই ধরনের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। কেন মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করল, সেটি নিয়েও কোনো আত্মজিজ্ঞাসা নেই।

এ আত্মসমালোচনার প্রক্রিয়ায় তাদেরও আসতে হবে। এ কাজ শুধু রাষ্ট্র করবে না। সমাজকেও প্রস্তুত হতে হবে। সমাজ প্রস্তুত না থাকলে রাষ্ট্র একা কিছুই করতে পারে না।

ধরা যাক, ট্রানজিশনাল জাস্টিস রাষ্ট্রের কাজ। সেটি কার্যকর হয় তখনই, যখন মানুষ একে অন্যের কথা শুনতে প্রস্তুত থাকে। আমরা এখন একে অন্যের কথা শুনতেই প্রস্তুত নই।

আমাদের সে কানটা আবার তৈরি করতে হবে, সে মনটাও ফিরিয়ে আনতে হবে, যে মন নিয়ে জুলাইয়ে আমরা পাশে দাঁড়ানো মানুষটার পরিচয় জানতে চাইনি। সে বোরকা পরে কিনা, মাদরাসায় পড়ে কিনা, নারী না পুরুষ, ট্রান্সজেন্ডার কিনা—এসব কিছুই তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

আজ হঠাৎ আমরা নিজেদের এত সংকীর্ণ করে ফেললাম কেন? আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি আমরা যখন একে অন্যের কথা শুনতে পারি, একসঙ্গে দাঁড়াতে পারি।

সে জায়গায় ফিরে যাওয়া একটি বড় সাংস্কৃতিক লড়াই। লড়াই বলছি, কিন্তু এটি খুব সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ। আমি আশা করি, তরুণ সমাজের মধ্যে যে শক্তি তৈরি হয়েছে, সে শক্তিই একদিন কাজটি করবে। আমরা হয়তো শুধু কথাই বলতে পারি। কিন্তু কাজটা শেষ পর্যন্ত আপনাদেরই করতে হবে।

গত দুই বছরে আমরা অনেক কিছু করার কথা বলেছি, নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেছি। যদিও নতুন বন্দোবস্তের চেয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বেশি লক্ষণীয় ছিল। বড় মিসিং পয়েন্টটা কোথায় ছিল; কেন আমরা সে সুযোগটা ধরে রাখতে পারলাম না?

মিসিং পয়েন্টের মূল জায়গাটা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার অভাব। বাংলাদেশের জনগণ যা চেয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো সেটা চাওয়ার সাহস দেখায়নি। কারণ সবাই ক্ষমতা চেয়েছে। ছোট রাজনৈতিক দল থেকে বড় রাজনৈতিক দল—প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতায় যেতে চেয়েছে, ক্ষমতার অংশীদার হতে চেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ কখনো ক্ষমতা চায় না। কোনো দেশের জনগণই ক্ষমতা চায় না। তারা কাউকে ক্ষমতায় পাঠায়, কিন্তু তার কারণ নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা।

এ জায়গা থেকে আমি পুরো দায়টাই রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দেব। অবশ্যই অন্তর্বর্তী সরকারেরও দায় আছে। কারণ তারা এমন কিছু শক্তিকে প্রশ্রয় দিয়েছে, যেগুলো সমাজে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

কিন্তু আমরা যতটা অন্তর্বর্তী সরকারকে সমালোচনা করি, রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা তার চেয়ে অনেক বেশি হওয়া দরকার। কারণ তারাই এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে মাত্র দুই বছরের মধ্যে আমরা আবার পুরনো বন্দোবস্তের দিকে ফিরে গেছি। তারা এখন বিশৃঙ্খলার কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ বিশৃঙ্খলা তারা যে তৈরি করেনি এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হব কীভাবে? আমার মনে হয়, পুরনো বন্দোবস্তে ফিরে যাওয়ার পথ তৈরি করতেই অনেক কিছু করা হয়েছে। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকেই আমরা দায়িত্বশীল আচরণ দেখিনি।

মানুষ সংস্কার চেয়েছিল। সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সংসদে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্বের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনাই শুরু হয়েছে ১৫ শতাংশ থেকে, শেষ পর্যন্ত ৫ শতাংশেও পৌঁছায়নি। এমনকি সে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রেও কোনো দল আগ্রহ দেখায়নি। তাহলে তারা আসলে কিসের সংস্কার চাইছে?

আমার মনে হয়, তারা কখনই সংস্কার চায়নি। তারা শুধু ক্ষমতায় যেতে চেয়েছে।