স্বাধীনতার পর থেকে দেশে মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বহুগুণ বেড়েছে। নানা সময়ে অনেক বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল সরকারীকরণের মাধ্যমে সেই বিদ্যালয়গুলোর মান বাড়ানো। যদিও সরকারীকরণের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবে মানের অবনমন ঘটতে দেখা গেছে। এর বিপরীতে এ স্তরের শিক্ষা হয়ে উঠেছে বেসরকারি খাতভিত্তিক। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বেসরকারি খাতেও এ শিক্ষার মান সেভাবে বাড়েনি। উচ্চ ব্যয়, দক্ষ শিক্ষকের সংকট রয়েছে। এছাড়া অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হলেও ওই বিদ্যালয়গুলোর সব শিক্ষকের আত্তীকরণ হয়নি। এতে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া যে শিক্ষকদের আত্তীকরণ হয়েছে, নীতিমালার শর্তের কারণে তাদের অনেকের বেতন কমে গেছে।
অন্যদিকে নতুনভাবে সরকারীকৃত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগও সম্ভব হয়নি। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান জটিলতার কারণে পুরনো বিদ্যালয়গুলোতেও দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষকের সংকট তৈরি হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও ক্ষমতাসীনদের প্রভাব থাকত। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর মাধ্যমে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। অর্থাৎ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নে কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা টেকসই নীতিমালা নেয়া হয়নি, যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে এ স্তরের শিক্ষার মানে। অথচ শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো মাধ্যমিক শিক্ষা। এর ওপরই নির্ভর করে উচ্চ শিক্ষার ভিত কতটা মজবুত হবে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২৮টিতে, যার অর্ধেকেরও বেশি জাতীয়করণ করা হয়েছে ২০১১-২৩ সময়কালে। কিন্তু বিদ্যালয়গুলোর মূল সংকট হয়ে উঠেছে শিক্ষকের অভাব। এসব বিদ্যালয়ের প্রায় ১০ হাজার ৯০০ শিক্ষক পদ রয়েছে। এর মধ্যে সহকারী শিক্ষকের পদ ৫ হাজার ৪৫২টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ২ হাজার ৭১০ জন। পদ শূন্য আছে ২ হাজার ৭৪২টি। ফলে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাতের ব্যবধান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে বেড়ে গেছে, যা পাঠদানে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করাসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া। সরকারকে এমন নীতি-কৌশল নিতে হবে, যা হবে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই। নয়তো মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না। শিক্ষার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না। সেই সঙ্গে বৈষম্য বাড়বে। কেননা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চ ব্যয় বহন করা নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য বেশ কঠিন। যদিও তাদের অনেকেই মানসম্মত শিক্ষার জন্য সন্তানকে তুলনামূলক ভালো মানের বেসরকারি বিদ্যালয়ে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন।
শিক্ষাকে মানসম্পন্ন ও ব্যয়সাশ্রয়ী করতে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর উন্নয়নে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রথমত, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন কেবল অবকাঠামো দিয়ে সম্ভব নয়। এটি নির্ভর করে প্রতিটি শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যার অনুপাত, তাদের মিথস্ক্রিয়ার ওপরও। নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ। এক্ষেত্রে মেধাকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন আনুষঙ্গিক কিছু পদক্ষেপ নেয়া। পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার্থীর শেখার প্রতি আগ্রহের ভিত্তিতেও শিক্ষার মান গড়ে ওঠে। তাই সরকারের উচিত শিক্ষা খাতকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা এবং এ খাতে গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিতে অগ্রাধিকার দেয়া। শিক্ষার মান নিশ্চিতের ক্ষেত্রে গতানুগতিক পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি কম মনোযোগও বর্তমানে অন্যতম অন্তরায়।
মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান ক্রমেই অবনমনের ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক কিছু সিদ্ধান্তও প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নানা প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের অটোপাস দেয়া, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের শেখার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে শিশুকাল থেকে শিক্ষাকে সহজীকরণের প্রবণতা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা অর্জনের পথে অন্যতম অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে আগে থেকে বিদ্যমান সংকটগুলো পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি এবং পাঠ্যক্রম ও শিখন-শেখানো পদ্ধতির যুগোপযোগী রূপান্তর না ঘটা। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সে দেখা গেছে, দেশে একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে শ্রেণীতে যা শিখছে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ছয় বছরের অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণীর দক্ষতার সমান। সুতরাং পাঠ্যক্রম ও পাঠদান পদ্ধতিরও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। কীভাবে এ দুইয়ের ক্ষেত্রে রূপান্তর ঘটানো যায় সেটিও সরকারের পরিকল্পনায় রাখা দরকার।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে এসব উপাদানের যথাযথ সমন্বয় করা জরুরি। আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োজন, উপযুক্ত শিক্ষাদানসামগ্রী ও ভৌত অবকাঠামো প্রস্তুত, যথার্থ শিক্ষণ-শিখন/পদ্ধতি আবিষ্কার, উপযুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতি বিশ্লেষণ, ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং ইত্যাদি। এসব কাজ করতে আবার প্রয়োজন অর্থায়ন। কিন্তু জিডিপির বিপরীতে দেশে শিক্ষা খাতের বরাদ্দও অতি সামান্য। অন্যান্য সমস্যা সমাধানেও খুব বেশি কার্যকর প্রভাব দেখা যায়নি। উল্টো নানা অভিঘাতের মুখে শিক্ষা ব্যবস্থায় ধস নেমেছে। সেগুলো মোকাবেলায়ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষত করোনা ও করোনা-পরবর্তী সময়ে। তবে বর্তমানে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস চালানো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে এবং এটি হতে হবে দক্ষ শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি, পাঠ্যক্রম ও শিখন-শেখানোর পদ্ধতির উন্নয়নে। নয়তো শিক্ষার্থীরা প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত ও দক্ষ হয়ে উঠতে পারবে না। কেননা মাধ্যমিক শিক্ষায় ঘাটতি থেকে গেলে তা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। উচ্চ স্তরের শিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের যথাযথ মানসিক বিকাশ ঘটে না। নিদেনপক্ষে এ দুই দিক বিবেচনায় মাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার যে নাজকু পরিস্থিতি সেটি দীর্ঘায়িত হতে দেয়া সমীচীন হবে না।










