রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থা, করপোরেশন ও বিভাগের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়, বেশ পুরনো। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতির দায়মুক্তি, নিয়ন্ত্রণের অভাব ও ক্ষমতার অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহারের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত এসব প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির মাত্রা ব্যাপক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে বিগত দেড় দশকে এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রকল্প ও কেনাকাটায় বড় ধরনের দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। দুর্নীতির বহুমুখী প্রকৃতি ও অনুশীলন সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিস্তৃতি লাভ করেছে। অনিয়ম-দুর্নীতির যথাযথ তদন্ত না হওয়া, অপরাধীদের আইনের আওতায় না আনাসহ প্রশাসনে জবাবদিহি না থাকায় দুর্নীতির বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত এক বছরে বেসরকারি ব্যাংক, আর্থিক খাতের অলিগার্কসহ বেসরকারি খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত ও নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক খাতের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, করপোরেশন ও বিভাগের অনিয়ম-দুর্নীতি নিরীক্ষা করে দেখার কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। অনিয়ম-দুর্নীতি উদ্ঘাটনে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ফরেনসিক অডিটের পদক্ষেপ নেয়া অতীব জরুরি।

দেশের পুরো প্রশাসন ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানই ঠিকভাবে চলছে না। অনিয়ম-দুর্নীতি ও অদক্ষতায় এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ থেকে সরকার সেভাবে রিটার্ন পাচ্ছে না। বরং এসব প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ দিতে হচ্ছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেবা প্রদান করতেও পারছে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীই দুর্নীতিগ্রস্ত নন। তবে তাদের একটি অংশ দুর্নীতিগ্রস্ত এবং এরা খুবই ক্ষমতাবান। দুর্নীতি দেশের পদ্ধতির মধ্যে ঢুকে গেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিরীক্ষা হওয়া দরকার। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

গত ১৫ বছরে অনিয়ম ও লুটপাটের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ আইনের আওতায় শতাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এসব প্রকল্পে পছন্দের কোম্পানিকে কাজ দিতে কমিশন বাণিজ্য হয় বড় আকারে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে সরকারের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি বারবার আলোচনায় উঠে এসেছে। শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অন্তত ৬০০ কোটি ডলার অনিয়ম-দুর্নীতির কথা উঠে আসে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কমিশন, কেন্দ্র না চালিয়ে বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ ও অতিরিক্ত মুনাফা হিসেবে এ অর্থ বেসরকারি খাত নিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয় শ্বেতপত্রে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কোনো ধরনের তদন্ত কিংবা বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যদিও এরই মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি কমাতে মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন কমিটি করা হয়েছে। কিন্তু আগের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তেল ও গ্যাস আমদানিতে বিগত বছরগুলোয় কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠলেও এর যথাযথ তদন্ত ও নিরীক্ষা হয়নি। তিতাস গ্যাসে ‘সিস্টেম লস’-এর নামে কোটি টাকার বেশি গ্যাস চুরি হওয়া এবং তাতে এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর জড়িত থাকার অভিযোগ দিনের পর দিন উপেক্ষিত থেকে গেছে।

বিগত দেড় দশকে দুর্নীতি, লুটপাটের একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছিল দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো খাত। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং বেসমারিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আটটি প্রকল্পে পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ত্রুটি, বাস্তবায়নে বিলম্ব ও দুর্নীতির কারণে প্রাক্কলিত বাজেটের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বা ৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বেড়েছে। এ প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা পরে বেড়ে ১৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ আট প্রকল্প ছাড়াও তিন মন্ত্রণালয় এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়ন করা হয়েছে বড় বড় প্রকল্প। ব্যয়বহুল সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, এক্সপ্রেসওয়ে, রেলপথ নির্মাণ, রেলের ইঞ্জিন-কোচ সংগ্রহসহ বিভিন্ন খাতে বাস্তবায়ন করা এসব প্রকল্পের ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে গেছে দুর্নীতি ও লুটপাটে। সরকারি প্রকল্পগুলোর অতিরিক্ত ব্যয়ও এক ধরনের পরিকল্পিত লুণ্ঠনের ইঙ্গিত। কমিশন বাণিজ্য, অনুপযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া এবং প্রকল্প পরিচালনায় অদক্ষতা—যার দায় সরাসরি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ওপর বর্তায়।

বেসরকারি ব্যাংক নিরীক্ষা ও একীভূতকরণের নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। কিন্তু আলোচনার বাইরে থেকে গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। যদিও ২০০৯ সালে বিগত সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকে লুণ্ঠন শুরু হয়েছিল। বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো একের পর এক বৃহৎ ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে লাখ কোটি টাকারও বেশি লোপাট করা হয়েছে। এ মুহূর্তে কেবল জনতা ব্যাংকেরই মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। আর রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির পরিমাণ যোগ করলে এর পরিমাণ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে। বেসরকারি ব্যাংক খাতে সরকার কিছু দৃশ্যমান সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, বেসিক ব্যাংকে বিগত দেড় দশকে একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি ঘটলেও এখন পর্যন্ত এসব দুর্নীতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ কিংবা কোনো অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ দেখা যায়নি। শুধু ব্যাংকগুলোর এমডি বা চেয়ারম্যান বদল করে দায় সেরেছে সরকার। সরকারি ব্যাংক খাতের প্রতিটি অনিয়ম ও দুর্নীতির সঠিক তদন্ত ও নিরীক্ষা হওয়া জরুরি।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত ও নিরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন ছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণভাবেও অনিয়ম ও দুর্নীতির নিরীক্ষা করতে পারত। কিন্তু সে রকম কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) দপ্তরের নিরীক্ষায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। সিএজির প্রতিবেদনের আলোকে বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ফলে অপরাধীরা আড়ালেই থেকে গেছে। অপরাধের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতি কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনিয়ম ও দুর্নীতি অবসানে এখন প্রয়োজন দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত, সুনির্দিষ্ট এবং দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ। ভবিষ্যতে নিরীক্ষা করা হবে বা আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম খোঁজার কথা বললে হবে না, অতীতের প্রতিটি বড় প্রকল্প ও সংস্থার আর্থিক লেনদেন ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে অনিয়ম খুঁজে বের করার পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত সংস্থাগুলোর দুর্নীতির দায় কোনোভাবেই জনগণ নিতে পারে না। যে বা যারা রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে এসব অনিয়মে যুক্ত ছিল, তাদের চিহ্নিত করে বিচার প্রক্রিয়ায় আনা না গেলে দুর্নীতির চক্র কখনই ভাঙবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় দুর্নীতির সংস্কৃতি ভেঙে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা হলে অর্থনৈতিক দুরবস্থা আরো তীব্র হবে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতি জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ভঙ্গ হবে।