ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বাংলাদেশ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও বিনিয়োগ বোর্ডের (বিওআই) পরিচালক ছিলেন। বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি কর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা
দাম নিয়ন্ত্রণে শুল্ককর কমানোর কার্যকারিতা আসলে কতটুকু? রাজস্ব আহরণে এর প্রভাব কেমন হতে পারে?
২০০৮ সালে আমি যখন চেয়ারম্যান, তখন ভোজ্যতেল কোম্পানির লোকেরা এসে বললেন, স্যার, ১৫ শতাংশ ভ্যাট আছে। আপনি যদি ভ্যাট কমিয়ে দেন তাহলে ভোজ্যতেলের দামটা কমে আসবে। তখন তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বললাম, ঠিক আছে। আমাকে লিখে দিন এবং মিডিয়ার মাধ্যমে ভোক্তাদের জানিয়ে দিন যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করলে ৩০০ টাকায় ৫ লিটার তেল ৪৫ টাকা কমে ২৫৫ টাকায় পাওয়া যাবে। তখন তারা বললেন, স্যার, আমরা তো আর খুচরা বিক্রি করি না। আমি বললাম, আপনারা আমার কাছ থেকে প্রথমেই ৪৫ টাকা কমিয়ে নিলেন। কিন্তু প্রসেসের ওপর আপনাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। যার ফলে দাম কমে না, বরং কখনো-সখনো বেড়ে যায়। কিন্তু সরকার বা জনগণ কারোর জন্য এটি সুফল বয়ে আনে না। বছর দুই আগে মাননীয় আদালত শুল্ক কমলে দাম কমবে কিনা তার নিশ্চয়তা জানতে চেয়েছিলেন।
কথায় আছে, পেটে খেলে পিঠে সয়! জনগণ ভ্যাট দেয়, কারণ এখান থেকে সরকার টাকা পেলে তা দিয়ে জনগণের জন্য উন্নয়নের কাজ করবে। শুল্ক কমিয়ে দাম কমানোর মানে একদিকে সরকারের রাজস্ব আহরণ কমবে, অন্যদিকে উন্নয়নমূলক কাজ ব্যাহত হবে। তাহলে সবাই কেন স্যাক্রিফাইস করবে? সরকারের রেভিনিউ স্যাক্রিফাইস করা মানে জনগণের উন্নয়নস্বার্থ স্যাক্রিফাইস করা।
অভিজ্ঞতা হলো, শুল্ক কমালেই দাম কমে না। দাম কমা না কমার আরো অনেক কারণ থাকে। শুল্ক বা ভ্যাট প্রত্যাহারের ফলে দাম হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়ে আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনায় এমন কোনো তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ পরিবীক্ষণ প্রথা বা সিস্টেম নেই। যেমন এখন বলা হচ্ছে, রোজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় থাকবে। এটাও একটা ভ্রান্ত ধারণা। ভ্রান্ত ধারণা এজন্য যে এ রোজার সময়ে যারা প্রধান পণ্যগুলো বিক্রি করবেন তারা এগুলো আমদানি করেছেন আরো আগে। ব্যবসায়ীরা বলতেই পারেন, আমরা তো ডলারের অস্থিরতার সময়ে ডেফার্ড এলসিতে এগুলো কিনেছি। ফলে দাম কীভাবে কমাবেন। কমবে না। আর এখন যে শুল্ক কমানো হচ্ছে, এটির ফলে আগামীতে পণ্যের দাম হয়তো কমবে অর্থাৎ রোজার পর দাম কমবে। কিন্তু দেখা যাবে রোজার পরও দাম না কমার হাজার অজুহাত ও যুক্তি এসে হাজির হবে। কারণ বাজার ব্যবস্থাসহ সব কিছুই পরস্পর প্রযুক্ত প্রক্রিয়া ও প্রথা মেনে চলে। সময় ও পরিস্থিতি এখানে মুখ্য বিষয়। ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি, ব্যাংক বা মানি মার্কেটে এবং ডলারের বাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতার কারণ এক্ষেত্রে সব কিছুই ক্রাউডিং ইফেক্ট হিসেবে কাজ করে। নানাভাবে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বাড়তেই থাকলে আমদানিকারক, উৎপাদক ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য দাম বেঁধে দেয়া দরে পণ্য বিক্রি চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং কমানোর প্রয়াস প্রচেষ্টাকে সামগ্রিকভাবে বাস্তবতার দৃষ্টিতে দেখা সমীচীন হবে।
আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ছয় মাস আগে ও পরের কথা ভাবতে হবে। ভোটের কিছুদিন আগে এক দোকানদার গরুর মাংসের দাম কমিয়েছিলেন। পত্রিকায় দেখেছিলাম, সে কসাই নাকি পরবর্তী সময়ে বেশ বিড়ম্বনার শিকার হয়েছিলেন। কারণ সামন্তবাদী অন্যসব সিন্ডিকেটেড বিক্রেতারা দাম কমানোর যুক্তি মেনে নেননি। সুতরাং পয়েন্ট খুব স্পষ্ট যে শুল্ক বা ভ্যাট, কর বা আয়কর যখন কমানো হয় সেটার ফলাফল তাৎক্ষণিক পাওয়া যায় না।
তাহলে আমরা যে শুল্কহার কমাচ্ছি, সে সুফল যদি আমরা না পাই, আবার এদিকে রাজস্ব আয় কমে যায়, তাহলে শুল্কহার কমানো বা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এনবিআরের ভূমিকা বা সক্ষমতা কতটুকু?
এনবিআরের ভূমিকা বা সক্ষমতার প্রশ্ন উঠলেই পরোক্ষ করের ঘরে বাইরের ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এসে যায়। শুল্ক বা ভ্যাট হচ্ছে পরোক্ষ কর। আর আয়কর প্রত্যক্ষ কর, যা করদাতার কাছ থেকে সরাসরি নেয়া হয়। বিক্রেতার কাছে ভ্যাট বা শুল্ক পরিশোধের পর ক্রেতা জানে না যে টাকা সরকার পাবে বা পাচ্ছে কিনা। পণ্যদ্রব্য বিক্রয়ের ওপর যে শুল্ককর, সেটা পরোক্ষভাবে নেয়া হয় বলেই খুচরা ক্রেতা বা ভোক্তার ওপর তা আরোপের ক্ষেত্রে তাদের ওপর এর অভিঘাত ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুল্ক বা ভ্যাট আরোপ কিংবা মওকুফ করার ক্ষেত্রে সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ আবশ্যক। এ বিষয়ে কাজ করার আইনগত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ট্যারিফ কমিশন। তারাই এ দায়িত্ব পালন করবে। তারা জনগণের একটা শুনানি নেবে এবং পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদার পরিমাপ-পরিকাঠামো বিশ্লেষণ করবে। ট্যারিফ কমিশনের মতো কমিশনগুলোর নিয়মই হলো, তারা যেসব আইনগত সিদ্ধান্ত নেবে সেগুলোর একটা পাবলিক শুনানি নেয় হবে। কিন্তু বছর শেষে বা মাঝখানে এ শুল্ক আরোপ কিংবা প্রত্যাহার করার বিষয়টি এনবিআরের দায়িত্ব ও কর্তব্য বা প্রথা হিসেবে চলে আসছে। এনবিআর ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় না করে শুল্ক আরোপ বা মওকুফের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে এ ব্যাপারে এনবিআরের ভূমিকা বা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এনবিআরের কাছে এসব বিষয় নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এমনকি গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। যেমন কবে দেশে ছোলা আসবে বা কবে ছোলার দাম বাড়তে বা কমতে পারে। এ কাজের দেখভাল ও বিচার-বিশ্লেষণের দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ট্যারিফ কমিশন। ফলে দেখা যাচ্ছে, শুল্ককর আরোপ বা প্রত্যাহারের বিষয়ে এনবিআরের আইনগত যেমন সীমাবদ্ধতা আছে, তেমনি এর মনিটরিংও তার পক্ষে সম্ভব হয় না। এছাড়া তাদের দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। আবার এটাও বুঝতে হবে যে এনবিআর একটি রাজস্ব আহরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাস্তবায়ন সংস্থা। এনবিআর নীতিনির্ধারণী সংস্থা নয়। এনবিআর নীতিনির্ধারণ করবে না। আইন করবে আইন মন্ত্রণালয় আর ভেটিং নিয়ে কাজ করবে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়। যেমন বাণিজ্য করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এনবিআরের কাজ হচ্ছে সে সব আইনের আলোকে রাজস্ব আহরণ করা। রোজার পণ্য কখন আনা হবে, কখন শুল্ক কমাতে হবে এ ব্যাপারে এনবিআর সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
যেহেতু রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়ন এবং আহরণ কথাটি চলে আসে, প্রায়ই দেখা যায় যাদের কর দেয়ার যোগ্যতা রয়েছে তারা কর ফাঁকি দিচ্ছেন। এটা স্পষ্ট, সমাজে করযোগ্য অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, তাদের করের আওতায় আনার জন্য এনবিআর একা কিছু করতে পারছে না। করনীতি প্রণয়ন এবং কর আহরণ—এ দুটোর সমন্বয়হীনতাই কি কর ফাঁকির কারণ?
এখানে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যিনি নীতি প্রণয়ন করবেন তাকেই যদি আবার সে নীতি প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করতে হয় তাহলে তো জটিলতা আরো বাড়বে। হাকিম নড়বে কিন্তু হুকুম নড়বে না! এখানে এনবিআর নিজেই নীতি তৈরি করে, নিজেরাই তা বাস্তবায়ন করলে অন্যের ভূমিকা পালনের ওপর দোষারোপ চলে না। এনবিআরকে যদি বলা হতো, রাষ্ট্রের সব নাগরিককে করের আওতায় আনার জন্য এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, আপনারা এর প্রতিপালন অনুসরণ করুন। তাহলে এ ব্যাপারে তারা দায়বদ্ধ থাকত। আমাদের এখানে প্রচলিত প্রথা হচ্ছে, এনবিআরই আইন তৈরি করে সংসদের অনুমোদন লাভ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ‘হ্যাঁ’ ভোটে তা পাস হয়। জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি আইন এখানে অর্থবিধি প্রস্তাব চুলচেরা পরীক্ষা-পর্যালোচনা করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে বিধি পাস হলে তা প্রয়োগের সময় সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যেহেতু এনবিআরের পক্ষ থেকে আইন প্রণয়ন ও প্রস্তাব করা হয়, তারা ফাঁকিজুকির পথ রুদ্ধ করার জন্য নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে নিবর্তনের প্রস্তাবই করে। একটা উদাহরণ দিই, আমি যদি পুলিশকে নিজেদের মতো করে আইন করতে দিই, দেখা যাবে পুলিশ নিজেদের সুবিধা বুঝে আইন প্রণয়ন করবে। কোথাও দাঙ্গা-হামলা হলে পুলিশ সরাসরি গুলি করবে। মানবিক দিকটা একবারের জন্যও ভাববে না, এটা তো কোনো কথা হতে পারে না। তাদের জনগণের কথা শুনতে হবে। যেহেতু নিজেরা আইন করেছে, তাই পুলিশ নিজের সুবিধামতো আইন করেছে। এখানে এনবিআরের অবস্থাও অনেকটা এ রকমই দাঁড়ায়, যদি না আইন পাসকালে দেখা হয় করের অভিঘাত কেন কীভাবে সবার ওপর বর্তাবে। সেজন্যই আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন দৃষ্টিভঙ্গি ও ফারাকের কারণে করনীতি ও কর আহরণ এ দুটোর মধ্যে এমন পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কী?
স্বতঃসিদ্ধ উপায় হচ্ছে, যাদের কাজ তাদের দিতে হবে। যিনি নীতি প্রণয়ন করবেন তিনি ভেবেচিন্তে সবার মতামত নিয়ে আইন প্রণয়ণ করবেন। যেমন ধরুন, আমাদের সংসদের ৮০ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী। পটেনশিয়াল করদাতা হিসেবে তারা কর আইন পাসের সময় সচেতন সতর্কতা বিচার-বিশ্লেষণ বিবেচনাকে প্রাধান্য দেবেন জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের স্বার্থে। জনগণের পক্ষে তারাই আইন প্রণয়ন, প্রবর্তন ও প্রয়োগের নেতা। মহান সংসদ আইন পাস করবে সবার ওপর প্রয়োগযোগ্য করে, আইন পাসের পর নিজেদের যেন তার সংশোধনের দাবি তুলতে না হয়। নিবর্তনমূলক আইন পাস ও আরোপের দায়িত্ব আইনপ্রণেতাদেরও। জনগণ এনবিআরকে হয়রানির দোষ দিচ্ছে। এনবিআরকে দোষারোপ না করে যারা এ আইন তৈরি করছেন তাদেরই এর প্রতিবিধানের দায়িত্ব না দিলে সমস্যা সমস্যাই শুধু থাকবে না, জ্যামিতিক হারে তা বাড়তে থাকবে।
জনগোষ্ঠীর একটা বিরাট অংশ করের আওতার বাইরে থাকছে। কর প্রদানে জটিলতার কারণেও অনেকে কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে কী করা যেতে পারে?
এজন্য প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়, দায়ী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। যখন কেউ দেখে দেশে কর না দিয়ে বিদেশে টাকা পাচার করা যায়, উপভোগ করা যায়, আয়ের উৎস নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া তা অস্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় বা ব্যবহারে বরং উৎসাহব্যঞ্জক নিয়মকানুন করা হয়, তখন তারা কেন কর দেবে? যেখানে সংবিধানের ২০ (খ) ধারায় স্পস্ট বিধান রয়েছে—কেউ যেন অন্যায়ভাবে উপার্জিত অর্থ উপভোগ করতে না পারে রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবে। সুতরাং এটা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এনবিআরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কর আহরণের। ফলে এনবিআরের ভূমিকা হয়ে গেছে খাজনা আহরণকারী নায়েবের মতো। রাজস্ব আয়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে সীমিতসংখ্যক করদাতার কাছ থেকে কর ‘আহরণ’ কালে করদাতাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখায় এনবিআরের নিশ্চয়ই অপারগতা বা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে এনবিআরকে জবাবদিহির আওতায় আনা বা না আনা হলেও নীতিনৈতিকতার সমস্যা থেকেই যাবে। করদাতারা যার কাছে কর দেন, নিবর্তন প্রতিবিধানের নালিশ তার কাছেই দেন। কর কর্মকর্তা তার ডিসক্রেশনারি ক্ষমতা প্রয়োগে নিজস্ব যুক্তি বা সুবিধার পক্ষাবলম্বন করবেন এটাই তো স্বাভাবিক। পৃথিবীর ৭০টি দেশের মতো ২০০৫ সালে আমাদের দেশে জনগণ যাতে কর দিতে হয়রানির শিকার না হয় এবং তারা তৃতীয় নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবিধান চাইতে পারে সেজন্য কর ন্যায়পাল অফিস খোলা হয়েছিল। লোকজন কর দিতে গিয়ে হরয়ানির শিকার হলে সেখানে গিয়ে নালিশ করতে পারত। কিন্তু ২০১১ সালের দিকে সরকার অফিসটা উঠিয়ে দিল। তখন যুক্তি ছিল, কর বিভাগ মানুষকে সেবা দিচ্ছে, তারা আবার নালিশ দেবে কেন; আরেকজন সেটা শুনবেনই-বা কেন! কর ন্যায়পাল অফিস প্রতিষ্ঠায় আইনগত কোনো সমস্যা বা জটিলতা থাকলে তা সরাসরি না উঠিয়ে যদি সংস্কার করা হতো, তাহলে করদাতাদের জন্য ভালো হতো। করদাতাদের প্রতিবিধান চাওয়ার একটা জায়গা থাকত। এতে মানুয়ের করদানে যে ভীতি, তা প্রশমিত হতো এবং মানুষ করদানে আস্থাবান হতে পারবে। যে লোক কর ফাঁকি দিয়ে অভ্যস্ত, ক্ষমতাবান সেই করদাতা সবাইকে ম্যানেজ করে চলতে পারে। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন ধীর হচ্ছে।
আমরা এখন স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলছি। সেক্ষেত্রে আমাদের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা স্মার্ট হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
সম্ভাবনা আছে, সম্ভাবনা থাকা উচিত। অর্থনীতি প্রবহমান। আমাদের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, ২০২৬ সালের মধ্যে আমরা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হব। এজন্য আমাদের রাজস্ব বেশি লাগবে। আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করছি। প্রথমত, সহজীকরণে সমস্যা আছে। দ্বিতীয়ত, অনলাইন ব্যবস্থা দেরি হওয়ায় সমস্যা। তৃতীয়ত, সবাই করের আওতায় আসছে না। চতুর্থত, করনীতি সবার ক্ষেত্রে সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই সবার আগে আমাদের কর আইন ও ব্যবস্থাপনা সংস্কার জরুরি। এজন্য শুরুতেই নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন বিভাগ পৃথক করার পাশাপাশি অনলাইন ব্যবস্থা অনতিবিলম্বে চালু করা প্রয়োজন। এসব করার জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সিদ্ধান্তে কঠোর হওয়া প্রয়োজন। ২০১২ সালে ভ্যাট আইন পাস হয়েছিল, অনলাইন করতে পারেনি বলে তা কার্যকর হয়নি। আমরা এত এত দালান বানাতে পারি, পদ্মা সেতু বানাতে পারি, আর এটা এখনো পারছি না। এনবিআরের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল, অফিস অবকাঠামো ও ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে স্মার্ট বাংলাদেশে স্মার্ট রাজস্ব আহরণের ব্যবস্থা স্থাপন হবে।
আমাদের জিডিপিতে এখন পর্যন্ত করের অবদান আশাব্যঞ্জক নয়। এনবিআর কীভাবে এ ব্যবস্থার সংস্কার করতে পারে?
জিডিপিতে করের রেশিও বাড়ানোর জন্য হা-হুতাশ না করে কর ব্যবস্থাপনার সংস্কার গতিশীল করতে হবে। রেশিও ‘কম’ থাকাটাই একটা বড় রোগ। ফলে আমাদের অর্থনীতিতে বৈষম্য বাড়ছে। আমি যদি ১০০ টাকার উন্নয়ন করি তাহলে আমাকে জিডিপিতে ন্যূনতম ১৫-১৬ শতাংশ কর দিতে হবে। দেখা যায়, ১০০ টাকার উন্নতি ঠিকই হচ্ছে, কিন্তু জিডিপিতে কর ওই ৭, ৮ ও ৯ শতাংশের ভেতরই ঘুরপাক খাচ্ছে। তার মানে ১৫ শতাংশ কর পাওয়ার কথা থাকলেও ৬ থেকে ৯ শতাংশ কর আমরা কম পাচ্ছি। এত বড় গরমিল রেখে অর্থনীতি বড় হতে পারে না। সুতরাং আপনাকে জিডিপিতে করের হার বাড়াতেই হবে। জিডিপি যদি বাড়ে তার মানে এখানে সম্ভাবনা আছে। কিন্তু কর আহরণ করা যাচ্ছে না, সেজন্য জিডিপি কম থাকছে। আমাদের কর আহরণের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ৮-৯ শতাংশের বেশি কর আহরণ না করতে পারা মানে এখনো অনেকেই কর ফাঁকি দিচ্ছে। ফলে তা দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।










