তথ্যের অবাধ প্রবাহ একুশ শতকে মানুষের গতিশীল জীবনযাপনকে সহজ করছে। গত দশকে তথ্যপ্রযুক্তিতে উন্নতি সাধনের কারণে আমরা দ্রুততম সময়ে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে ঘটে যাওয়া খবর পেয়ে যাই। একই সাথে আমরা জানতে পারছি বহির্বিশ্বের মানুষের জীবনযাপন, রীতিনীতি, পোশাক-পছন্দ, খাদ্যাভ্যাস এমনকি তাদের বিনোদনের উপাদান সম্পর্কে। ফলে নিজেরা সেসবের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছি। এর ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন বাজার আর সে বাজারে তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তাও। প্রভাব ফেলছে আমাদের অর্থনীতিতে। বদলে যাচ্ছে আমাদের সামাজিক জীবন কাঠামো। এক্ষেত্রে অনুকরণপ্রিয়তারও একটা প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কেবল বহির্বিশ্বকে নয়, দেশের মধ্যেই চলতি ট্রেন্ড অনুসরণ করাও পরিণত হয়েছে আমাদের সংস্কৃতিতে।
সংস্কৃতি একটি নিয়ত পরিবর্তনশীল বিষয়। প্রতিদিন আমাদের জীবনে নতুন নানা বিষয় যুক্ত হয়। বদলে যায় আমাদের জীবনধারা। সে সঙ্গে বদলায় সংস্কৃতি। আমাদের গড়পড়তা আলোচনায় সংস্কৃতি বলতে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের সমষ্টিকে বোঝানো হয়। কিন্তু সংস্কৃতির মূল পাঠেই আছে, ‘আমরা যা ও যা নিয়ে জীবনযাপন করি তা-ই সংস্কৃতি।’ সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলায়, বদলায় তার জীবনধারা। এ কারণেই বদলে যায় সংস্কৃতি। একুশ শতকে এসে সংস্কৃতি বদলও হয় দ্রুত। কিন্তু সবসময় সে বদলটা চিহ্নিত করা হয় না। এমন নয় যে দ্রুতগতির কারণে বদল চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। আদতে বদলের দিকে নজর দেয়া হয় না। অথচ সংস্কৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত আমাদের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতি।
গত রমজানে দুটি ‘লাইন’ খুব আলোচনায় ছিল। ইংরেজি থেকে আগত ঋণশব্দ ‘লাইন’ বাংলায় ব্যবহৃত হয় ‘কিউ’য়ের সমার্থক হিসেবে। রমজান আলোচিত এ দুটো লাইন বা কিউয়ের একটি ছিল ন্যায্যমূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহের, অন্যটি শপিং মলে নির্দিষ্ট কিছু পোশাকের ব্র্যান্ডের আউটলেটের সামনে। দুটি বিপরীত স্রোত। একটি লাইন মানুষের অর্থকষ্টের নির্দেশক অন্যটি প্রাচুর্যের নির্দেশক। কেননা আউটলেটের বাইরে লাইন থাকা কোনো ব্র্যান্ডই স্বল্পমূল্যের পণ্য বিক্রয় করে না। এখান থেকে বেশকিছু প্রশ্ন তৈরি হয়। প্রথমত, নানা সময়ে যে বলা হয়—মানুষ কষ্টে আছে তার প্রমাণ কী? মানুষকে তো সচ্ছলও দেখা যায়। আবার তর্কের খাতিরে বলা যায়, যে দেশে ব্র্যান্ডের পোশাক নিতে এত মানুষ আগ্রহী হয়ে লাইন ধরে তাদের নাগরিকরা তো সচ্ছল।
কেবল শহরে নয়, এ প্রবণতা দেখা যায় মফস্বলেও। সেরা দোকানটি থেকে পণ্য কেনার জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের কোনো অভাব হয় না। আবার অন্যদিকে নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন মানুষেরও অভাব নেই। মিডিয়া তাদের সামনে হাজির হলে তারা খাদ্য, বস্ত্রের নিশ্চয়তা চান। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে সমস্যাটা অর্থনীতির কিংবা বণ্টন বৈষম্যের। যদি বলা হয়, সংস্কৃতিরও ভূমিকা আছে তাহলে প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক যে হাজার টাকায় এক টুকরো ইলিশ খাওয়ার জন্য কিউ ধরা, পলিথিনে তেল নেয়ার জন্য মিনতি করা—এ বিপরীত চিত্রের ক্ষেত্রে সংস্কৃতির ভূমিকাটা কী?
একটি জনপদের মানুষের জীবনাচরণ, ও দৈনন্দিন আচরণ তাদের সংস্কৃতির অংশ। আর সংস্কৃতি বলতে যে জিনিসগুলোকে প্রতিষ্ঠা করা হয় তা করে থাকে মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নাগরিকরা। উনিশ শতকে ভারতে মধ্যবিত্তের উত্থানের সময় থেকে শুরু করে পাকিস্তান, স্বাধীন বাংলাদেশেও সংস্কৃতির কাণ্ডারি হয়েছিল শহুরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। এর বাইরে গ্রামীণ মানুষ, জনসাধারণেরও সংস্কৃতি আছে, কিন্তু তা সংস্কৃতির ঝাণ্ডাধারীদের আলোচনায় কখনো আসেনি। সোজা কথা, সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি কখনো প্রমোট করা হয়নি। এ শতকে সংস্কৃতি বদলে গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বহুল ব্যবহার ও জনপ্রিয়তায়। সেক্ষেত্রেও বদলে ভূমিকা রেখেছে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করার মতো সুবিধা পাওয়া নাগরিকরা। তথ্যের অবাধ গতি ও সহজলভ্যতার কারণে আমাদের সংস্কৃতিতে যুক্ত হয়েছে বহির্বিশ্বের প্রভাব।
এ শতকের শুরুতেও বহুল আলোচিত একটি শব্দবন্ধ ছিল আকাশ সংস্কৃতি। স্যাটেলাইট টেলিভিশন আমাদের সংস্কৃতির ওপর কী প্রভাব ফেলছে মূলত তার নেতিবাচক আলোচনাই হতো। আকাশ সংস্কৃতি কথাটিই হয়ে উঠেছিল নেতিবাচক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে এ আলোচনায় নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে না, তবে এসব বিষয় গ্রহণে বেশকিছু ভুল ছিল। এর মধ্যে অন্যতম দুটো বিষয়—ট্রেন্ডিং-এর নামে অন্ধ অনুকরণ ও দেখনদারির ভোগবাদ (Conspicuous Consumption)। তবু বলে রাখা ভালো, যে বিষয়টি এক সময়ে তুমুল আলোচিত তাকে বলা হয় ট্রেন্ডিং এবং কোনো কিছুকে বিশেষভাবে তুলে ধরাকে বলা হয় শো-অফ।
বছরের শুরু থেকেই মূল্যস্ফীতি নিয়ে চিন্তিত ছিল মিডিয়া, অর্থনীতিবিদরা এমনকি সাধারণ মানুষ। কিন্তু তিন কি চার মাসের ব্যবধানেই দেখা গেল ঢাকার সেরা শপিং মলগুলো ক্রেতার আগমনে ভরপুর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই আবার অনেকে নানা হিসাব-নিকাশ (যার সবই আনুমানিক) দিয়ে বলছেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিতে সামান্য শতাংশ মানুষ শপিং মলে গেলেই ভিড় হওয়া স্বাভাবিক। আদতে এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষ সংকটে সময় পার করছে। এখন শপিং মলে কত মানুষ যাচ্ছে, কত টাকার কেনাকাটা হচ্ছে তার প্রামাণ্য কোনো তথ্য কেউ প্রকাশ করে না। এ নিয়ে হিসাব-নিকাশ ও তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতি আমাদের নেই। কিন্তু খোলা চোখেও বোঝা যায়, প্রচুর অর্থ খরচ করার মতো মানুষের অভাবও এ দেশে নেই। এর বাইরে যে জিনিস কাজ করে তা হলো ট্রেন্ডিং ও শো-অফ।
ঢাকায় যে নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্র্যান্ডের আউটলেটে ক্রেতাদের কিউ দেখা গিয়েছিল তার প্রতিটিরই পোশাকের মূল্য মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। তবে সেখানে মধ্যবিত্তেরও অংশগ্রহণ দেখা যায়। অন্য একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। কোরবানির সময় কার গরুর দাম কত তা নিয়ে প্রতিযোগিতা আমাদের অজানা নয়। দেখনদারির ভোগাবাদ সেখানেও ছিল। ট্রেন্ডিং সেটাকে করেছে আরো প্রভাবিত। কেননা এসব ব্র্যান্ডের সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের একটি কৌশল হলো—এই কিউ দেখিয়ে আগ্রহ তৈরি করা। বাস্তবেও দেখা গেছে, প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিনের কিউ ছিল লম্বা। কেননা মানুষের মধ্যে ঢুকেছে—‘ওখানে কী আছে আমাকে দেখতে হবে।’ সে কারণেই আমরা একদিকে রিপোর্ট দেখি, বর্ষীয়ান এক ব্যক্তি কারওয়ান বাজারে পোকায় কাটা বেগুন খুঁজে কম দামে যখন কিনছেন তখন স্বর্ণের প্রলেপ দেয়া, ২০ হাজার টাকা কেজি মূল্যের জিলাপি কিনতে এতই হুড়োহুড়ি যে চাহিদা মেটাতে না পেরে বিক্রিই বন্ধ করে দিতে হয়। কেননা বিশেষ এ জিলাপি কিনতেই হবে—এমন একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে আমাদের মধ্যে।
সম্প্রতি দেখা গেছে, মাংস কেনা, মাংস খাওয়া দুর্মূল্য হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছে মানুষ। এখানে প্রশ্ন ওঠে, মাংস খাওয়া এ জনপদে কবে থেকে জনপ্রিয় হলো? মাংস (বিশেষত রেড মিট) এ জনপদের প্রাচীন খাবার নয়। এ সময়ে অনেকেই বলেন, ‘এত মাছ-মাংস খাইনি’ কিন্তু বাস্তবে এ জনপদের ইতিহাসে শতবছর পেছনে গেলে এত মাংস খাওয়ার নজির মিলবে না। মাংস খাওয়া জনপ্রিয় করার পেছনে বেশকিছু কারণ কাজ করেছে। তার মধ্যে রাজনৈতিক কারণ আছে। সাম্প্রতিক কারণটি হলো রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। বর্তমান বাংলাদেশের নাগরিক কালচারে রেস্টুরেন্ট ঢুকে গেছে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে। এখানে ব্যবসা করতে এসেছে বহু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। ‘ভাজা মুরগি’ থেকে শুরু করে তাদের কারণে সম্প্রতি জনপ্রিয় হয়েছে স্টেক। এই স্টেক খাওয়াটাও কয়েক বছরে একটা মান-মর্যাদা অর্জনের মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্টেক আর ম্যাশড পটেটো সাজানো থালার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় দিলে নিজেকে বেশ ‘পশ’ হিসেবে প্রকাশ করা যায়।
ট্রেন্ডিং, পশ, শো-অফ শব্দগুলোর নিত্যব্যবহার দেখনদারির ভোগবাদের তীব্রতা নির্দেশ করে। সংস্কৃতি পরিবর্তনের এটি একটি চিহ্ন। কিন্তু এগুলো খুব একটা চিহ্নিত করা হয় না। যেমন চিহ্নিত হয় না মাংস খাওয়ার রাজনীতি। এ প্রসঙ্গে কবি আখতারুজ্জামান আজাদের সাম্প্রতিক একটি লেখার উল্লেখ করা যায়। আজাদ লিখেছেন ১৯ বছরের ঢাকাবাসে তিনি দেখেছেন এখানকার রেস্টুরেন্টে ভাত খাওয়ার সুব্যবস্থা নেই। রেস্টুরেন্টগুলো বিরিয়ানি, খিচুড়ি ইত্যাদি খাওয়ানোতে বেশি মনোযোগ দেয়। ভাত খেতে চাইলে তারা করুণার দৃষ্টিতে তাকায়। কথাটা কতটা বাস্তব তা যারা রেস্টুরেন্টে নানা সময়ে বাধ্য হয়ে খেতে গেছেন তারা জানেন। এমনও হয় যে রেস্টুরেন্টে ভাত আছে ব্যাপারটাই বলা হয় না। আবার দুটো সবজি আর ডাল-ভাত খেতে গেলে যা খরচ হয় তার চেয়ে খিচুড়ি সস্তা। এর বাইরে কাচ্চি প্রমোট করা হয়েছে বিস্তৃতভাবে। এর পেছনে আছে ব্যবসা।
প্রথমত, ভাত, তরকারি বিক্রির চেয়ে মাংসজাত খাবার বিক্রিতে মুনাফা বেশি। অন্যদিকে কাচ্চির ক্ষেত্রে একটা বিষয় আলোচিত হয় না। কাচ্চির এ মাংসগুলো আমদানি করা হয়। হিমায়িত মাংস আসে বিদেশ থেকে। এখানে তৈরি হয়েছে বিশাল একটা বাজার। সে বাজারে যুক্তরা নানা রকম মার্কেটিং করে কাচ্চিকে করেছে জনপ্রিয়। একইভাবে দুই দশকে গলির মোড়ে মোড়ে গজিয়ে ওঠা রেস্টুরেন্টগুলো তেল, মসলা দেয়া অস্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি মাংস খাওয়ার প্রবণতা ঢুকিয়ে দিয়েছে নাগরিকদের মধ্যে। ক্যালরি, মেদ ইত্যাদি নানা বিষয় টেনে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের একটি পরিচিত জার্গন, ‘তিন বেলা ভাত-তরকারি খাইতে হবে এমন কোনো কথা আছে নাকি?’ কথা আছে কি নেই, ছিল কি ছিল না, তা পরের বিষয়। কিটো ডায়েট থেকে শুরু করে পিৎজা-পাস্তার জনপ্রিয়তা আমাদের সংস্কৃতি বদলেরই প্রমাণ। কিন্তু তা চিহ্নিত হয়নি। প্রশ্ন উঠতে পারে, চিহ্নিত হওয়ার প্রয়োজনটা কী?
প্রথমত, বিপরীত বাস্তবতা দেখানো দুটো কিউ কেমন করে তৈরি হয়, সংস্কৃতির পরিবর্তন চিহ্নিত হলে তা ব্যাখ্যা করা সহজ হতো। দ্বিতীয়ত, মাংস খেতে আগ্রহী করে তোলার পেছনে যে ব্যবসায়িক একটা বিরাট স্বার্থ কাজ করে সেটাও বোঝা যেত। এ বিষয়গুলো চিহ্নিত হলে হয়তো গরুর মাংসের দাম এত বাড়ত না কিংবা কাচ্চিতে খাসির বদলে পথকুকুরের মাংস দেয়ার অভিযোগও হতো না। আজকের দিনে এসে চা বিক্রির জন্য ব্রিটিশের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে চা পান করানো নিয়ে বড় বড় আর্টিকেল লেখা হয়, কিন্তু এ সময়ে চলমান এমন বহু ক্যাম্পেইনের ব্যাপারে সচেতন ব্যাখ্যাকারীরা নীরব। অথচ সংস্কৃতির এ পরিবর্তনগুলো আমাদের অর্থনৈতিক বহু অসংগতির মূলে কিংবা সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। এদিকে আমাদের বিশ্লেষকরা নানা তত্ত্ব ঘেঁটে সেসবের কারণ খোঁজা ও ব্যাখ্যার চেষ্টা করলেও সংস্কৃতির দিকটিতে তারা আলো ফেলছেন না। সে কারণেই পহেলা বৈশাখে প্রতি বছরই পান্তা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে এক ধরনের বিরোধিতা তৈরি হয়, আবার এসবের পক্ষে বলার লোকও দাঁড়িয়ে যায় আরেকটা কিউয়ে। সবসময়ই বিপরীতমুখী দুটো কিউ তৈরি করাও আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। সেই সংস্কৃতির বদল ও উপাদানগুলো এ সময়ে কীভাবে কাজ করছে তা পর্যবেক্ষণ, দেশের আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বহু জটিলতার ব্যাখ্যা ও সমাধানে সহায়ক হবে।
মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক










