সংকট সমাধানের লক্ষ্যে যেকোনো নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আগে বাস্তবতা পরখ করে নেয়া অতি আবশ্যক। নয়তো সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কেননা প্রতিটি সংকট স্থান-কালভেদে ভিন্নতর হয়। একই রোগের প্রেসক্রিপশন যেভাবে রোগীর প্রকৃত অবস্থাভেদে বদলে যায়। ঠিক একই কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফের) ঋণ সহায়তার বিপরীতে জুড়ে দেয়া বাঁধাধরা নিয়মের পুরোপুরি অনুসরণ হওয়া সমীচীন নয়। কিন্তু চলতি বছরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে দেখা যায়, দেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক এ দাতা সংস্থার দর্শনেই চলছে। এ-সংক্রান্ত বণিক বার্তার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে যার স্বরূপ স্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে। তাছাড়া আইএমএফের ঋণ সহায়তা নিয়ে অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠেছে এমন দেশের উদাহরণ তুলনামূলক দুর্লভ।

এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত নাম আর্জেন্টিনার। বর্তমানে আইএমএফ থেকে ঋণ গ্রহণের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশটি। সম্প্রতি দেশটির অর্থমন্ত্রীও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া ২০১৮ সালেও আর্জেন্টিনাকে সবচেয়ে বড় বেইলআউট (আর্থিক সহায়তা) দিয়েছিল আইএমএফ। অথচ বাস্তবতা হলো সর্বোচ্চ ঋণ সহায়তা পেয়ে আর্জেন্টিনার অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দীর্ঘ দশক ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা সংকটে জর্জরিত দেশটির অর্থনীতি। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়ায় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০০ শতাংশে। তবে সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করায় দেশটিতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এসেছে। কিন্তু এর বিপরীতে ভর্তুকি ও সমাজকল্যাণমূলক প্রণোদনা কমানোয় বেড়েছে দারিদ্র্যের হার। গত সেপ্টেম্বরে আর্জেন্টিনার সরকারি তথ্য থেকে জানা যায়, দেশটিতে গত দুই দশকের মধ্যে দারিদ্র্যের হার সর্বোচ্চ ৫৩ শতাংশে উঠেছে। প্রতিবেদনটি অনুযায়ী, চলতি বছরই প্রায় ৩৪ লাখ আর্জেন্টাইনকে দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

আইএমএফের নীতিমালা অকার্যকর প্রমাণিত হওয়ার আরেকটি উদাহরণ পাকিস্তান। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা দেশটিকে ঋণের বোঝায় ডুবিয়ে দিয়েছে। আর দেশটির অর্ধেক ঋণ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো বহুজাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নেয়া। বর্তমানে পাকিস্তানের সরকারি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। যদিও রাজস্ব আয়ে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। অথচ আইএমএফের ঋণ সহায়তার বিপরীতে অন্যতম শর্ত থাকে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আয় বাড়ানো। রাজস্ব ঘাটতি ছাড়াও রিজার্ভ সংকট, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যসহ আরো অনেক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানের অর্থনীতি।

তবে এসব দেশের অর্থনৈতিক সংকটের দায় পুরোটা আইএমএফের ওপর বর্তায়, এমন নয়। আন্তর্জাতিক ঋণ সহায়তার প্রসঙ্গে বরং এ সংস্থার নামই সবার আগে উচ্চারিত হয়। ডলার ও রিজার্ভ সংকটকে প্রশমিত করতে সংস্থাটির ঋণ সহায়তা আনুকূল্য দেয়। কিন্তু সমস্যা গভীর করে তোলে এর আরোপিত নীতিমালা যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাবিমুখ হয়। তার চেয়েও বড় কথা, আইএমএফের নীতিমালা গণমুখী হয় না। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে শুরুতেই আর্জেন্টিনার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশও একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আইএমএফের শর্তাবলির মধ্যে অন্যতম ছিল জ্বালানি খাতে ভর্তুকি হ্রাস। উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলাকালীন বিগত সরকার এ শর্ত পরিপালন সাপেক্ষে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমায়। পাশাপাশি কয়েক দফা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ায়। আর্থসামাজিক খাতে এর গুরুতর প্রভাব পড়ে। জনসাধারণের ওপর আর্থিক চাপ বেড়ে যায়। এছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বস্তি দেয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

আইএমএফের আরেকটি অন্যতম শর্ত হলো সরকারি ব্যয় কমানো, যা সংকোচনমূলক নীতিকে নির্দেশ করে। এ নীতি অনুসারে বাজারে অর্থপ্রবাহ সীমিত করা হয় এবং নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি মুদ্রা সরবরাহজনিত কারণে নয়। ফলে নীতি সুদহার বাড়ানোর খুব একটা প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েনি। টানা দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, কমবেশি ৯ শতাংশ। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় আর্থিক স্বস্তি নেই জনসাধারণের মধ্যে। অন্যদিকে দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে এবং এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে।

মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য বরং বাজার ব্যবস্থাপনায় নজর দেয়া প্রয়োজন ছিল। বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাজার তদারকির পাশাপাশি সমস্যার মূল চিহ্নিত করে তা সমাধানে মনোযোগ দেয়ার দরকার ছিল। এতে হয়তো নিত্যপণ্যের বাজারে চাহিদামাফিক সরবরাহ নিশ্চিত হতো এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত। কেবল আমদানি শুল্ক কমিয়েও যে দাম নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তা বিগত সরকারের আমলেও দেখা গেছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারও একই পথে হেঁটেছে। এতে বরং রাজস্ব আয়ে চাপ পড়েছে। অথচ আইএমএফের শর্তের একটি ছিল রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে এর কাঠামোগত সংস্কার। সরকারের বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়ানো একটি বড় পরিবর্তন হতে পারত। এছাড়া উৎপাদনশীল খাতে ভর্তুকি বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যয় কমানোয় নজর দেয়া প্রয়োজন ছিল। এতেও হয়তো মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যেত। বাজেট জনকল্যাণমুখী হতে পারত। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত নতুন সরকারের কাছে জনগণের এ প্রত্যাশাই ছিল, এখনো আছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য আগের সরকারের গণবিরোধী বাজেট কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ ছিল। যদিও এখন পর্যন্ত আগের সরকারের প্রণীত বাজেটই বলবৎ রয়ে গেছে। সম্প্রতি বাজেট সংশোধনের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তাতে এর আকার কমবে সামান্যই। বরং সামনের অর্থবছরের বাজেটের আকার আরো বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একইভাবে বহাল রয়েছে বিগত সরকারের গৃহীত রাজস্ব ও মুদ্রানীতিও।

সরকারের এখন বাস্তবতার নিরিখে নীতি-কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন যা গণমানুষকে আর্থিক স্বস্তি দেবে। এ সরকার এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। তাই অর্থনৈতিক উন্নতির চেয়ে পুনরুদ্ধারে সময় অতিবাহিত হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে পুনরুদ্ধারের জন্যও আর্থিক খাতের এমন সংস্কার প্রয়োজন যেটি সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করে তুলবে। এজন্য আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রযোজন। যাতে আগের সরকারের সুবিধাভোগী অলিগার্ক ব্যবসায়ী শ্রেণী মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর কীভাবে ঋণ সহায়তা ছাড়া সংকট মোকাবেলা করা যায় সেটিও ভেবে দেখতে হবে। কারণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে ৯১ শতাংশ। আবার এ সময়ে বাংলাদেশের অনুকূলে বিদেশী ঋণের অর্থ যে পরিমাণে ছাড় হয়েছে, ঋণ ও ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে তার চেয়ে বেশি। এতে ভবিষ্যতে আবারো রিজার্ভে বড় ধরনের ধস নামার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে এমন নীতি-কৌশল নেয়া দরকার যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক হবে এবং গণমানুষকে স্বস্তি দেবে।