তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ডাক ব্যবস্থায় বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। একসময় চিঠি, টাকা-পয়সা, দলিলপত্র পাঠানোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিল এ ব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমানে এ জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোন, ই-মেইল, বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস, ই-কমার্স, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ইত্যাদি। অনেক উন্নত দেশ পরিবর্তনশীল যুগের সঙ্গে ডাক বিভাগকে প্রাসঙ্গিক রাখতে যুগোপযোগী নীতি-কৌশল নিয়েছে। প্রচলিত সেবার পাশাপাশি পরিসরও বাড়িয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ডাক ব্যবস্থায় যুগোপযোগী পরিবর্তন আসেনি।

আধুনিক ডাক ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথা না বললেই নয়। ডাক ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে প্রয়োজনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, করোনাকালীন তার নজির রেখেছিল ভারতের ডাকসেবা। নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ভারতজুড়ে যখন লকডাউন, স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় স্থবির, সে সময় ওষুধসহ জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে এগিয়ে এসেছিল ডাক বিভাগ। ইন্ডিয়া পোস্টের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে ১ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি পোস্ট অফিস রয়েছে। যে কারণে পৃথিবীর বৃহৎ ডাকসেবার দেশ হিসেবে ভারতকে বিবেচনা করা হয়। গতানুগতিক সেবার বাইরে ইন্ডিয়া পোস্টও নানা ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। তার মধ্যে ডিজিটাল থেকে ব্যাংকিং ও পেমেন্ট সেবাও রয়েছে। এছাড়া ‘এক্সপ্রেস ডেলিভারি অ্যাক্রস ইন্ডিয়া’ নামেও সেবা দিয়ে যাচ্ছে। আবার উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামের ডাক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা যায়। দেশটিতে ডাক ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে নন–লাইফ ইন্স্যুরেন্স সেবা, বিভিন্ন পরিষেবার বিল থেকে শুরু করে ট্রাফিক জরিমানা, পাসপোর্ট ও আইডি ফি, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি, মামলার ফি, ট্যাক্স ফি, এয়ার টিকিট বুকিং ফি-সংক্রান্ত সেবা দেয়। এছাড়া বিজ্ঞাপন পরিষেবা, টেলিকমিউনিকেশনের আইটি পরিষেবা, ব্যাংক এজেন্ট সেবাও দেয়। এমনকি ভিয়েতনাম পোস্ট অফিসের পোস্টমার্ট ডট ভিএন নামে একটি ই-কমার্স প্লাটফর্মও আছে, যেখানে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি নানা ধরনের পণ্য বেচা হয়। সে তুলনায় দেশের ডাক ব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। বরং যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিলুপ্তির পর্যায়ে। এর কার্যক্রমের পরিধি ছোট হয়ে এসেছে। সেবার মান ও গতি বাড়েনি। বণিক বার্তার সরজমিন প্রতিবেদন জানাচ্ছে, আগে মানি অর্ডারের পরিমাণ বেশি থাকলেও বিকাশ, নগদ ও ব্যাংকিং লেনদেনের কারণে এখন তেমন একটা মানি অর্ডার হয় না। তবে অনলাইন শপ দারাজের সঙ্গে ডাক বিভাগের চুক্তি হওয়ায় কিছু পার্সেল ডাকঘরগুলোয় আসে। কিন্তু কর্মচঞ্চলতা না থাকায় মাঝে মাঝে উপডাকঘরগুলো বন্ধ থাকে। কার্যক্রম না থাকায় ডাকপিয়নরাও নিয়মিত থাকেন না।

এমন পরিস্থিতিতে ডাক ব্যবস্থার পুনর্গঠন জরুরি। ডাক বিভাগকে বর্তমানের চাহিদার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে না পারলে একপর্যায়ে এর প্রয়োজন একেবারে ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু সরকারের ওপর বোঝা হয়ে রয়ে যাবে। এরই মধ্যে এটি একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ডাক বিভাগের সূত্রমতে, সরকার ডাক বিভাগ রেখেছে মানুষের সেবার জন্য, আয়ের জন্য নয়। সেজন্য আয় ও ব্যয় দিয়ে এটিকে মূল্যায়ন করা যাবে না। সেখানে সেবাই মুখ্য। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীজুড়ে যখন সেবা দেয়া-নেয়ার ধরন বদলাচ্ছে, তখন সেবার পরিধি না বাড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটি জনগণকে ভবিষ্যতে কী সেবা দেবে? বর্তমানে ডাক বিভাগ চিঠি ট্র্যাক করতে পারে এবং সেবার মান আরো আধুনিকায়নে কাজ চলছে বলে জানা গেছে। সেগুলো বাস্তবায়ন হোক—এই প্রত্যাশা রয়েছে। আধুনিকায়নের গতি যদি না বাড়ে তবে পৃথিবীতে ডাক সেবার ধরন আরো বদলে যাবে। তখনো দেশের ডাক বিভাগ পিছিয়েই থাকবে। তাই ডাক বিভাগ সংস্কারে প্রয়োজন ক্রমেই পরিবর্তনশীল যুগের উপযোগী নীতিকৌশল নেয়া, যাতে সেবার মান ও পরিধি বাড়ে।

সেবার মান না বাড়ানো, আধুনিকায়ন না করা, বিগত সরকারের আমলে লাগামহীন দুর্নীতির কারণে ডাক বিভাগ এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। জানা গেছে, ডাক ব্যবস্থাকে আধুনিক ও গতিশীল করতে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে ৩৬৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪ জেলায় মেইল প্রসেসিং ও লজিস্টিক সার্ভিস সেন্টার (এমপিসি) প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বিগত সরকার। এছাড়া ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক ডাকঘর তৈরির প্রকল্প নেয় ডাক অধিদপ্তর। সে প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে ৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে ডাক ভবন উদ্বোধন করা হয়। ডাক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ২০১৯ সালে ৩৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় ‘ঢাকা শহরে ডাক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। অর্থাৎ বছরের পর বছর ডাক বিভাগের পেছনে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেবার মানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।

ডাক বিভাগ মূলত দুই ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। এতে মূল সেবার মধ্যে আছে সাধারণ চিঠিপত্র, রেজিস্টার্ড চিঠিপত্র, জিইপি, ইএমএস, মানি অর্ডার, পার্সেল সেবা, ভিপিপি, ভিপিএল, ডাকটিকিট, ডাকদ্রব্য গ্রহণ, প্রেরণ ও বিলি, ইলেকট্রনিক মানি অর্ডার, ক্যাশ কার্ড, স্পিড পোস্ট। অন্যদিকে এজেন্সি সেবার মধ্যে আছে ডাক জীবনবীমা, সঞ্চয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, প্রাইজবন্ড, পোস্টাল অর্ডার, নন-পোস্টাল টিকিট মুদ্রণ ও বিতরণ। তবে এসব সেবা নেয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। যদিও সারা দেশে এখনো নয় হাজারের বেশি ডাকঘর রয়েছে। সরকারের উচিত ডাক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে কাজ করা। তাহলে ডাক বিভাগকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব হবে। কিংবা অন্তত বিভাগটি সরকারের ওপর বোঝা হয়ে থাকবে না। ডাকসেবার বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে ৫১ ধাপ এগিয়ে ১৭৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ৬৮তম। ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের প্রকাশিত সমন্বিত ডাক উন্নয়ন সূচক-২০২৪ বাংলাদেশের এ অবস্থান তুলে ধরেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ পোস্ট ১০টি ডেভেলপমেন্ট লেভেলের মধ্যে লেভেল ৬-এ উন্নীত হয়েছে। ২০২৩ ও ২০২২ সালে ছিল যথাক্রমে লেভেল ৩ ও ২-এ। প্রতিবেদনে আস্থা, পৌঁছানো, প্রাসঙ্গিকতা ও সহনশীলতা এ চার সূচকের ওপর ভিত্তি করে একেকটি দেশের স্কোর ও ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ আস্থায় ৭২, পৌঁছানোয় ৫৪ দশমিক ৮, প্রাসঙ্গিকতায় ৪ দশমিক ৮, সহনশীলতায় ৯১ দশমিক ৮ এবং ৩ বোনাস পেয়েছে। এগুলো ডাক বিভাগের ইতিবাচক পরিবর্তনকে প্রকাশ করে। তবে যুগ বিবেচনায় ডাক বিভাগের কার্যক্রম আরো আধুনিক ও পরিসর বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।