সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে, বিশেষত ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সংকট চলছে। ডলার সংকট ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে। উল্লেখযোগ্য হারে ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয়নি। বিদেশী বিনিয়োগও খুব বেশি বাড়ছে না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানের ওপর, সেভাবে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। যদিও প্রতি বছর শেষে কর্মক্ষম বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরির বাজারে যুক্ত হচ্ছে। তাদের একটি বড় অংশই কাজ না পেয়ে বেকার থাকছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, গত বছরের শুরুতে বেকার মানুষ কম থাকলেও বছরের শেষে ধারাবাহিকভাবে এ সংখ্যা বেড়েছে। ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশে ২৬ লাখ ৬০ হাজার বেকার আছেন। ২০২৩ সালের একই সময়ে গড় বেকারের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৯০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার। এদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩-২২ সাল পর্যন্ত এক দশকে দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেড়েছে গড়ে দেড় শতাংশ হারে। যদিও একই সময়ে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।

বর্তমানে বেকারত্বও বড় ধরনের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতির জন্য। মূলত অর্থনীতির প্রতিটি খাত এভাবে চক্রকারে একে অন্যকে প্রভাবিত করে। তাই একটা সমস্যার সমাধান ছাড়া অন্য সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়ে। বেকারত্ব দূর করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টিতে বিনিয়োগ আবশ্যক। আর বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে প্রয়োজন এর প্রতিবন্ধকতাগুলো, যেমন জ্বালানি সংকট, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করা। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের বিষয়টি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত।

গত দেড় দশকে সেভাবে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়নি। এমনকি তথাকথিত উচ্চ প্রবৃদ্ধির সময়েও জিডিপির অনুপাতে কর্মসংস্থান বাড়েনি। আবার শ্রমবাজারে শোভন চাকরির অভাব রয়েছে। কর্মে নিয়োজিতদের সিংহভাগই রয়েছেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। ঋণ প্রবৃদ্ধি না হওয়া, বিনিয়োগস্বল্পতা, জ্বালানির অভাব ইত্যাদি কারণে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলেও সরকারি খাতেও খুব বেশি কর্মসংস্থান সৃজন হয়নি। এদিকে দেশের অর্থনীতির বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক হওয়ায় উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। কারণ তারা উৎপাদন খাত ও কারখানা পর্যায়ে কাজ করতে সেভাবে আগ্রহী নন। আবার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মে নিশ্চয়তা নিয়ে ঝুঁকি রয়েছে এবং মজুরিও তুলনামূলক কম থাকায় এ খাতে উচ্চ শিক্ষিত তরুণরা যুক্ত হতে চান না। যদিও সরকারি চাকরিতে পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় একসময় মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আবার বেসরকারি ও সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধাজনিত ব্যবধান বাড়ায় তরুণরা ঝুঁকেছেন সরকারি চাকরির প্রতি। যদিও বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৩ অনুযায়ী, কেবল ৫ শতাংশ কর্মরত সরকারি চাকরিতে। যেখানে দেশে কোনো না কোনো কাজে যুক্ত থাকার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন সাত কোটির বেশি মানুষ, সেখানে সরকারি চাকরিতে জনবলের সংখ্যাও খুবই নগণ্য। মূলত এটি নির্দেশ করে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের অভাবকে। বিবিএসের ওই জরিপ বলছে, দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত শ্রমজীবীর হার ৮৪ শতাংশ। আর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন মাত্র ১৬ শতাংশ। এ বাস্তবতায় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বেকার সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। এর জন্য শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগের পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে জনবল নিয়োগ পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদেরও মত, দেশে সরকারি চাকরিজীবীর হারও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। তাই এ খাতে আরো বেশি লোকবল প্রয়োজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইন-শৃঙ্খলার মতো জায়গায়ও আরো জনবল প্রয়োজন। তাছাড়া সরকারি খাতে জনবল কম থাকার বেশকিছু জটিলতা রয়েছে। বিভিন্ন খাতে সেবা প্রদান ও নীতিমালা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। সরকারি খাতে পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, আইন-শৃঙ্খলা এবং সামাজিক নিরাপত্তা সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় সেবা প্রদান বাধাগ্রস্ত হয়। সরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়াতে উন্নয়ন পরিকল্পনায় শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোও অপরিহার্য। উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিষয়গুলোকে যুক্ত করা গেলে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভবপর। সেই সঙ্গে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়লে এটি শুধু সেবা প্রদানের মান বাড়বে না, বরং দেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে।

সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা জরুরি। কীভাবে তরুণদের সেসব খাতে চাকরির নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা দেয়া যায় তা নিয়ে কাজ করার অবকাশ আছে। আবার বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলোর জন্য যেন দক্ষ শ্রমশক্তি পাওয়া যায়, সেজন্য স্নাতকধারীদের বিষয়ভিত্তিক বাস্তবিক জ্ঞান থাকা চাই। তবে বাস্তবতা হলো, দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার বিচারে সবার জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই অধিকসংখ্যক উদ্যোক্তা তৈরির দিকেও নজর দিতে হবে। এজন্য অন্যতম সম্ভাবনাময় হতে পারে কৃষি খাত। একসময় জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল বেশি। দেশের শ্রমশক্তিও ছিল কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত অর্ধশতকে দেশের অর্থনীতির কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কৃষিনির্ভরতা কাটিয়ে শিল্পের দিকে এগিয়েছে দেশ। জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান কৃষিকে ছাড়িয়ে গেলেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না শ্রমবাজারে। এ পরিস্থিতিতে কৃষিতে আধুনিকায়ন, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য উৎপাদনের সুযোগ থাকলে এ খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।