প্রথমে দুটি বিষয় স্বীকার করে নিতে চাই। প্রথমত, আমি টপিকটির জন্য যথোপযুক্ত ব্যক্তি কিনা এ বিষয়ে নিশ্চিত নই। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন, তা নিয়ে আমার কোনো বিস্তৃত গবেষণা নেই। কিন্তু আমরা যা দেখছি তা হলো বাজারের চাহিদা অনুসারে তারা পারফর্ম করতে পারছে না। এজন্য এ আলোচনার প্রয়োজনীয়তা আছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার লক্ষ্য এখন পরিবর্তন হচ্ছে। ২৫ বছর আগে আমি যে জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে ব্যাংক ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম, সেই দক্ষতা ও জ্ঞান নিয়ে বর্তমানে চলা সম্ভব নয়। সাত বছর ধরে আমি সিইওর দায়িত্ব পালন করছি, অনেক রিক্রুট করছি। কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলতে পারি, আমি যে দক্ষতা নিয়ে এ খাতে প্রবেশ করেছিলাম তা দিয়ে বর্তমানে প্রবেশ করতে পারতাম না। বর্তমানে প্রযুক্তি অনেক অগ্রসর হয়েছে, চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। আমাদের নতুন ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি ও বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে আসা গ্র্যাজুয়েটরা অনেক দক্ষতা নিয়ে এসেছে।

একটি বিষয় সবাইকে মনে রাখা দরকার, শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয়তা অনুসারে এর পরিবর্তন ঘটে। আজকে যে জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, আগামীকাল বা ভবিষ্যতে সেটির প্রয়োজনীয়তা নাও থাকতে পারে। আমাদের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কথাই যদি বলি, তাদের দক্ষতার জন্য আমাদের ৫০ জনের অধিক সহকর্মী অনেক সম্মান পাচ্ছেন। অর্থাৎ আমাদের কর্মী নিয়োগের যোগ্যতার মাপকাঠি বেশ কাজ করছে বলা যায়। তবে আমাদের সার্বিক ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করতে হবে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটি তার সর্বোচ্চ অবস্থায় নেই। সম্ভবত সেটি থেকে অনেক দূরে আছে। আমাদের এখানে প্রতি চারজনের একজন বেকার বা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। তাই প্রক্রিয়াটি পরিবর্তন করতে হবে এবং শিক্ষার সঙ্গে শিল্পের সমন্বয় ঘটাতে হবে। সিঙ্গাপুরে একটি অ্যাপ্রোচ হলো, তারা শিক্ষা ব্যবস্থাটি তাদের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে মিল রেখে করেছে। এটি শুধু কাগজে-কলমে নয়, বরং তারা খুব কঠোরভাবে তদারকি করে। শিল্পের চাহিদা পূরণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটির পরিবর্তনও করে।

উচ্চ শিক্ষার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণ হলো শিল্প ও সেবা খাতের উন্নয়ন ঘটাতে হলে সেখানে সব ধরনের দক্ষতা লাগবে। শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা দিয়ে হবে না। তাই কারিগরি ও মানবসম্পদের দক্ষতায়ও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উদ্যোক্তা মনোবৃত্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। তাহলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও সফল হওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষায় কোয়ান্টিটি (সংখ্যা) ও কোয়ালিটি (গুণগত মান)—দুটোতেই সমান গুরুত্ব দেয়া দরকার। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোয়ালিটির ওপর বেশি জোর দেয়া চাই।

উচ্চ শিক্ষায় টেকনিক্যাল স্কিলের (প্রায়োগিক দক্ষতা) পাশাপাশি মানবিক দক্ষতার ওপর জোর দেয়া চাই। নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখেছি যেসব গ্র্যাজুয়েট বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত থেকে এসেছে তাদের দক্ষতা অন্যদের চেয়ে বেশি। ডাটা অ্যানালাইসিস ও এআই ব্যবহারে দক্ষতা অনেক জরুরি। প্রাত্যহিক জীবনে কিংবা কাজের প্রয়োজনে আমরা এই টুলসগুলো কীভাবে ব্যবহার করি তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল মার্কেটিং, সাইবার নিরাপত্তা ও সাসটেইনেলিটি। এ-সংক্রান্ত অনেক ইস্যু আছে, কিন্তু শ্রমবাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে নৈতিকতার মানদণ্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নৈতিকতা সময়ের পরীক্ষায় দাঁড়াবে। এর দুর্বলতা থাকলে বাকিগুলো করে তেমন কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। কারণ নৈতিক মানদণ্ড না থাকলে অন্য কিছু করে এগিয়ে গেলেও একসময় ঠিকই আমাদের ছিটকে পড়ে যেতে হবে। তাই শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক মানদণ্ডের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের মাতৃভাষা আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজিতে ভালো দক্ষতা অর্জনের অর্থ এই নয় যে বাংলাকে অসম্মান করছি। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের দুটোয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

বর্তমানে এআইর পাশাপাশি ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সও আমাদের প্রয়োজন। এআই অনেক জিনিসের বিকল্প নিয়ে আসবে, কিন্তু ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করবে। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে আরো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা দেবে। ক্রিটিক্যাল থিংকিং ও প্রবলেম সলভিং পদ্ধতিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন কোনো কর্মীকে নিয়োগ দিই তখন জ্ঞানের পাশাপাশি আমরা তার আচরণকেও প্রাধান্য দিয়ে থাকি। প্রথমে আমরা তার একটি সাইকোমেট্রিক পরীক্ষা নিই। এ পরীক্ষায় যদি কোনো প্রার্থী উত্তীর্ণ না হন তাহলে অন্যগুলোয় ভালো করে না। ফলে আমরা তাকে বাদ দিয়ে দিই। তাই ক্রিটিক্যাল থিংকিং এবং প্রবলেম সলভিং অ্যাপ্রোচ থাকা জরুরি।

ভালো মানের শিক্ষা নিশ্চিতে শিক্ষকের ওপর বিনিয়োগ নিয়ে অনেকে কথা বলেছেন। এখানে মনে রাখতে হবে, অর্থনীতি কিন্তু অনেক সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখে। যদি প্রয়োজনীয় অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় তাহলে প্রতিষ্ঠান সেখানে অর্থ ব্যয় করবে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হলে উচ্চ শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষায় বিনিয়োগ না করলে দক্ষ ও মানসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া যাবে না। আর মানসম্পন্ন শিক্ষক না থাকলে মানসম্পন্ন ও দক্ষ শিক্ষার্থী পাওয়া কঠিন। শিক্ষা ব্যবস্থা একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হতে হবে। এটি পৃথক করা যাবে না।

আরেকটি বিষয় হলো করপোরেট ও একাডেমিয়ার কোলাবরেশন খুব জরুরি, যা আমরা অনেক দেরিতে শুরু করেছি। যদিও এখানে আমাদের অনেক সম্ভাবনা আছে।

মানুষ অনেক বুদ্ধিমান ও অদম্য। কিন্তু আমাদের দরকার মানুষের কাছ থেকে ফলাফল গ্রহণ। কিন্তু ভালো ফলাফল অর্জনের প্রধান প্রতিবন্ধক হচ্ছে দুর্বল ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এজন্য আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এটি শুধু সরকার, সরকারি-বেসরকারি খাতের দায়িত্ব নয়। সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনেক নমনীয় এবং সময়ের চাহিদা অনুসারে গড়ে তুলতে হবে। আমি আশাবাদী মানুষ। তাই আমি মনে করি বাংলাদেশের সুযোগ অনেক, সেটিকে সঠিক রিসোর্সের মাধ্যমে সঠিক পথে ধাবিত করতে হবে।

নাসের এজাজ বিজয়: সিইও, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, বাংলাদেশ

[‘‌উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক শিরোনামে বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন ২০২৪ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]