আজ স্বাধীনতা দিবস; ৫৩ বছর পূর্ণ হলো স্বাধীনতার। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। ১৯৭১ সালের এদিন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের পটভূমিতে। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় দখলদার বাহিনী। গণহত্যার শিকার পূর্ব বাংলার জনগণ গড়ে তোলে সশস্ত্র প্রতিরোধ। পরবর্তী নয় মাস প্রাণপণ যুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের যার লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন, ধর্ম নিরপেক্ষ, কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে নিজেকে পরিণত করা।

৫৩ বছর আগে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পশ্চাৎপদ। সম্পদের প্রাচুর্যতা তেমন ছিল না। স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তানের পুঁজিপতি ও শোষক শ্রেণী দেশ থেকে সম্পদ পাচার করেছে পশ্চিম পাকিস্তানে। বংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান) যখন ঔপনিবেশিক আমলে ছিল, তখনো পিছিয়ে ছিল। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের কারণে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, ভৌত অবকাঠামো একপ্রকার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বলা হয়। এমন ভঙ্গুর অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে দেশকে। তবে স্বস্তির কথা হলো, আমরা সফলতার সঙ্গে সেসব লড়াই উতরে গেছি। কিন্তু স্বাধীনতার সময় আমাদের যে লক্ষ্য ছিল তা আজও পূরণ হয়নি। যেমন স্বাধীনতার আগে ২২ পরিবারের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত ছিল তেমনি আজও মুষ্টিমেয় লোকের হাতে রয়েছে পুঞ্জীভূত সম্পদ আয়ের বিপুলাংশ। এক হিসাব বলছে, বর্তমানে ১ শতাংশ ধনীর হাতে জাতীয় আয়ের ১৬ শতাংশ কেন্দ্রীভূত। কভিডের কারণে নতুন করে প্রায় ছয় কোটি লোক দরিদ্র হয়েছে। 

২০২৪ সালে এসে আমাদের বলার মতো অনেক অর্জন রয়েছে, সফলতা, উন্নয়নের গল্প রয়েছে, বিশেষত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যেই মাথাপিছু জিডিপিতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় শক্তির দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়েছে দেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক হিসাব অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে টানা চার বছর ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ; আর টানা আট বছর পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে। গত বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬২১ ডলার। অন্যদিকে ভারতের ২ হাজার ৬১২ ডলার এবং পাকিস্তানের ১ হাজার ৪৭১ ডলার। দুই দশক ধরে অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক অনেক ক্ষেত্রেও ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়েছে দেশ। গড় আয়ু, সাক্ষরতার হার, নারীর ক্ষমতায়নের মাত্রা বেড়েছে কয়েক গুণ। দারিদ্র্য কমেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়; কমেছে শিশুমৃত্যু-মাতৃমৃত্যুর হার। গড় আয়ু বেড়েছে, পুষ্টি পরিস্থিতির তুলনামূলক উন্নতি হয়েছে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, শিক্ষার ব্যাপকতর বিস্তার ঘটেছে। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে নিজস্ব অর্থায়নে, মেট্রোরেল চালু হয়েছে। অর্থাৎ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মাথাপিছু আয় বেড়েছে। দেশের প্রায় সব জায়গা ইন্টারনেটের আওতায় এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার মানুষের কাজকর্মে যোগ করেছে নতুন গতি। ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে আজ ধাবমান বাংলাদেশ। তবে এসব নিয়ে যেমন গর্ববোধ করা যায় তেমনি কিছু উদ্বেগের কারণও বেড়েছে বিগত বছরগুলোয়।

বর্তমানে বড় একটি উদ্যোগের জায়গা হলো, ধর্মীয় সহিংসতা বাড়ছে এবং সহনশীলতা কমছে মানুষের মাঝে। ফ্রিডম হাউজের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব এখনো কম। জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর নারী-পুরুষরা আইনের আওতায় বৈষম্যের পাশাপাশি হয়রানি ও অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়। এছাড়া করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রভৃতি কারণে বিশ্ব অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে।

মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, রফতানি ও রেমিট্যান্সে নিম্নগতি, ব্যাংক খাতে সংকট ও দুর্নীতিসহ নানা সংকটে দেশের অর্থনীতি আজ মুহ্যমান। এ পরিস্থতিতে দেশে বেড়েছে আয়বৈষম্য। এক হিসাব বলছে, বর্তমানে ১ শতাংশ ধনীর হাতে জাতীয় আয়ের ১৬ শতাংশ কেন্দ্রীভূত। কভিডের কারণে নতুন করে প্রায় ছয় কোটি লোক দরিদ্র হয়েছে। চলমান সংকটের মধ্যে প্রতি বছরের ন্যায় এ রমজানেও দ্রব্যের দাম বেড়েছে। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের খাদ্যপণ্যের তালিকা ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্কের দিনে খাদ্য গ্রহণ করতে হয় কমপক্ষে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি। ফলে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে অধিকাংশ মানুষ। 

অন্যদিকে বাড়ছে বেকারত্বের হার। বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে শিক্ষিত ও উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই বেশি। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্যানুসারে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের ৬৬ শতাংশই বেকার থাকছেন। মাত্র ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্য কোনো বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজের উদ্যোগে কাজ করছেন। বাকি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করা ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেকার থাকছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট চাকরির প্রতি ঝোঁক এবং কৃষি বা শিল্প খাতে কিংবা স্ব-উদ্যোগে কাজ করার অনীহা ও দক্ষতাহীনতা শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। 

বেকারত্বের হার বৃদ্ধি দেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ, আরেকটি উদ্বেগ ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে। দেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান অনুযাযী, ২০১৯ সালে দেশে ৫০-৬৫ বছর বয়সের মানুষের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দেশে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৯ সালে নির্ভরশীল প্রবীণ ছিল মোট জনগোষ্ঠীর ৮ শতাংশ; ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

প্রবীণ জনগোষ্ঠী যদি কর্মক্ষম হয় তাহলে তা দেশের অর্থনীতির অনুকূলে থাকে, জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু তাদের কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে হলে তাদর উন্নত স্বাস্থ্য সুবিধা দিতে হবে। কারণ বয়স বাড়লে সাধারণভাবেই রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। এছাড়া প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবন সুরক্ষায় পেনশন, বয়স্ক ভাতা ইত্যাদি নিয়ে ভাবার সময় চলে এসছে। কর্মপরিবেশের উন্নয়ন, পরিবেশগত সূচকে অগ্রগতি প্রয়োজন। বায়ুদূষণে বর্তমানে শীর্ষে বাংলাদেশ এবং রাজধানীর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। এ অবস্থায় প্রবীণ কেন, কোনো মানুষই খুব বেশি দিন সুস্থ থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। অসংক্রামক রোগের অন্যতম কারণই হলো বায়ুদূষণ। আবার ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার পর্যাপ্ত অবকাঠামোও নেই আমাদের। বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রকোপও বেড়েছে, বেড়েছে কিডনি বিকল রোগীর সংখ্যাও। এদের প্রকৃত হিসাব একদিকে নেই, অন্যদিকে চিকিৎসার সুব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। আবার বিদ্যমান ব্যবস্থায় চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশ চেয়েছিল কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হতে। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও তা সম্ভব হয়নি। ফলে দেশের মানুষের উন্নত জীবনমান ও পরিবেশ আজও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফুটপাতে মানুষের আধিক্য ও পথশিশুরা তার সাক্ষ্য বহন করে। 

অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনতি ঘটেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল হয়েছে। জনপ্রশাসনের সর্বস্তরে অনিয়ম, জবাবদিহির অভাব ক্রমেই প্রকটতর হয়েছে। খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের গুরুতর অপরাধ বেড়েছে অথচ এক ধরনের বিচারহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এসব কিছু বর্তমানে দেশের উন্নয়নের গতি রোধ করছে। 

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে আরো কিছু বিষয় জড়িত থাকে—প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান, উন্নত উৎপাদনশীলতার কৌশল, দক্ষতা বৃদ্ধি, ইতিবাচক সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, সর্বোপরি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। চলমান সংকটের মধ্যে দেশের মানুষের জীবনমান নিম্নমুখী। প্রতিদিন সড়কে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, অবৈধ ভবনে আগুনে মানুষ পুড়ছে। উচ্চ মূল্যের কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ হারাচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তা, অব্যবস্থাপনায় বিশ্বাস হারিয়েছে দেশের চিকিৎসা খাত। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন মানুষের সক্ষমতা বাড়বে, জীবনের মান উন্নত হবে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক জাগরণ হবে। বাংলাদেশ এ লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রত্যয় দৃঢ় হবে—৫৩তম স্বাধীনতা দিবসে এ প্রত্যাশা।