নারীর অধিকারের ব্যাপারে এক চতুর্থাংশ দেশের সরকারের অবস্থানই নেতিবাচক। এ পরিস্থিতিতে নারী ও মেয়েদের অধিকার, ক্ষমতায়ন এবং সমতার জন্য সব দেশের সরকারকে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

সংস্থাটি বলছে, বিশ্বব্যাপী নারীদের অধিকার ক্রমবর্ধমান হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ স্তরের বৈষম্য থেকে শুরু করে দুর্বল আইনি সুরক্ষা। সেই সঙ্গে কমে যাচ্ছে নারীদের সমর্থন ও সুরক্ষা প্রদানকারী কর্মসূচি এবং প্রতিষ্ঠানের তহবিল।

৮ মার্চ জাতিসংঘের ৫০তম আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিনটিকে সামনে রেখে ‘বেইজিংয়ের ৩০ বছর পর নারীর অধিকার পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ‘ইউএন ওমেন’। এখানে ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরের নারী অধিকার বিষয়ক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ দেশের সরকার নারীর অধিকার নিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীর ক্ষমতায়নের অগ্রগতি হচ্ছে এ দাবির মধ্যেও মাত্র ৮৭টি দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছে নারী। প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী বা মেয়ে তার নিজের পরিবারের সদস্য বা সঙ্গীর হাতে নিহত হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষতিকারক স্টেরিওটাইপ ছড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে ডিজিটাল লিঙ্গ বৈষম্য নারীদের সুযোগ সীমিত করছে। গত দশকে বিশ্বে সংঘাতময় অঞ্চলে বসবাসকারী নারী ও মেয়েদের সংখ্যা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন হয়রানি, ব্যক্তিগত আক্রমণ এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছেন নারী অধিকার রক্ষাকারীরা।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, ‘যখন নারী ও মেয়েরা এগিয়ে যায়, তখন আমরা সকলেই উন্নতি লাভ করি। তবুও বিশ্বব্যাপী নারীর মানবাধিকার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। সমান অধিকারকে মূলধারায় আনার পরিবর্তে, আমরা নারী বিদ্বেষের মূলধারায় প্রবেশ দেখতে পাচ্ছি।’ নারীর জন্য মানবাধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নকে বাস্তবে পরিণত করতে সবাইকে দৃঢ়ভাবে পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি।

জাতিসংঘের নারী সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সিমা বাহৌস জানিয়েছেন, ‘লিঙ্গ সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের পথে জটিল চ্যালেঞ্জগুলো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু আমরা দৃঢ় রয়েছি, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। নারী ও মেয়েরা পরিবর্তন দাবি করছে, এবং তাদের কম কিছু প্রাপ্য নয়।’ সব নারী যেন তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা সম্পূর্ণরূপে উপভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘের নারী সংস্থা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি।

২০২৫ সালে বেইজিং ঘোষণা যা নারীর অধিকারের সবচেয়ে দূরদর্শী রোডম্যাপ। ‘বেইজিংয়ের ৩০ বছর পর নারীর অধিকার পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে গত ৩০ বছরের কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন উঠে এসেছে। ১৯৯৫ সাল থেকে শিক্ষায় সমতা অর্জন করেছে নারীরা এবং মাতৃ মৃত্যুহার এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং দেশগুলো বৈষম্যমূলক আইন অপসারণ অব্যাহত রেখেছে। গত ত্রিশ বছরে ১৮৯টি দেশ ও অঞ্চলে ১ হাজার ৫৩১টি আইনি সংস্কার করা হয়েছে।

আগামী ৩০ বছরের মধ্যে নারীর সম অধিকার নিশ্চিত করতে কিছু পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা-ইউএন ওমেন। সংস্থাটি বলছে সব নারীর জন্য একটি ডিজিটাল বিপ্লব ঘটাতে। নারীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রস্তুত করতে হবে এবং তাদের অনলাইন নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে।

নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই লক্ষ্যে সামাজিক সুরক্ষা, সর্বজনীন স্বাস্থ্য, শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

নারীদের বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ করার জন্য আইন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীর ওপর সহিংসতা রোধে নিতে হবে কার্যকরী পদক্ষেপ।

জলবায়ু অভিযোজনে নারী ও মেয়েদের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের নেতৃত্ব ও জ্ঞানকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলতে হবে এবং নতুন পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।