খৈল, বাঁশ ও শ্রমিকের মজুরিসহ বেড়েছে পানের উৎপাদন খরচ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রেতা সংকট। সব মিলিয়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন পানচাষীরা। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই কমিয়ে দিচ্ছেন পানের আবাদ। তবে দীর্ঘদিন পর গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ পান রফতানিকারক সমিতির প্রত্যয়নপত্র ছাড়া পান রফতানি করা যাবে না—হাইকোর্টের দেয়া সেই আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত হওয়ায় পান রফতানির নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রফতানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বা অনির্ধারিত কোনো বাধা থাকলে চাষী ও রফতানিকারক উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আদালতের আদেশের ফলে আপাতত সেই আইনগত জটিলতা থেকে রফতানিকারকদের স্বস্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রযোজ্য আইন ও সরকারি বিধিবিধান মেনে রফতানি কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পানের প্রবেশ ও রফতানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
রফতানিকারকরা জানান, পান রফতানিকারক সমিতির নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ডিসেম্বরের পর থেকে পান রফতানি কমে গেছে। রফতানি করতে হলে সমিতির সদস্যপদ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সমিতির নেতারা ঠিকমতো সদস্যপদ নবায়ন করেন না। ফলে দেশ থেকে পান রফতানি কমে গেছে। এ সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের পানের বাজার চলে যাচ্ছিল প্রতিযোগী দেশগুলোর দখলে। পরে আদালতের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান হয়েছে।
রফতানিকারকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ৩০০-৪০০ কোটি টাকা, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপে ২০০ কোটি ও পাকিস্তানে ৩০০ কোটি টাকার বাংলাদেশী পানের বাজার রয়েছে। মালয়েশিয়া, ইতালি, গ্রিস, লেবাননসহ ৩৩টি দেশেও পানের চাহিদা রয়েছে। তাদের আশা, আগামী দিনে পান রফতানি বাড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পান রফতানি হয়েছে ৪ হাজার ৩৮৮ দশমিক ৯৬ টন। তিন বছর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রফতানি হয়েছিল ৩ হাজার ৬৫৯ দশমিক ৭১২ টন। তখন থেকে প্রতি বছরই রফতানি বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পান রফতানি হচ্ছে ২৮ লাখ বাংলাদেশী কর্মীর দেশ সৌদি আরবে। গত চার অর্থবছরে দেশটিতে প্রতি বছর গড়ে সাড়ে ৩ হাজার টনের বেশি পান রফতানি হয়েছে। এ সময় কানাডা, ফ্রান্স ও ইতালিতেও স্বল্প পরিমাণে পান রফতানি হয়েছে।
উখিয়ার সোনারপাড়ার ব্যবসায়ী আবুল হাশেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন রফতানি জটিলতা থাকায় আমাদের পান ব্যবসায় কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে রফতানি জটিলতা কমায় আশা করি, ক্ষতি কমে আসবে।’
ভেড়ামারা উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন জুনিয়াদহ, ধরমপুর ও বাহাদুরপুরের প্রান্তিক পানচাষীরা জানান, বিঘাপ্রতি নতুন বরজে খরচ হয় সাড়ে ৩-৪ লাখ টাকা। যেখানে পান বিক্রি করে আসছে ১ লাখের মতো। পানবরজের সরঞ্জামের দাম বেড়েছে আগের চেয়ে তিন গুণ। আগে যে শ্রমের দাম ছিল ৪০০-৫০০ টাকা, বর্তমানে তা হয়েছে ৮০০-১০০০ টাকা। তাই অনেকেই বরজ মেরামত না করে রেখে দিয়েছেন। দাম কম হওয়ায় কেউ আবার বরজের পান ভাঙছেন না। ঋণের দায়ে জর্জরিত কেউ কেউ বরজ ভেঙে অন্য চাষাবাদ করার মনস্থির করেছেন। বরজের ওপর ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে না পেরে অনেকে হয়েছেন এলাকা ছাড়া।
কুষ্টিয়ার বাহাদুরপুরের ৭০ বছর বয়সী পানচাষী জমেলা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘৪০ বছরের পুরনো পানবরজ আমার। না পারছি ভাঙতে, না পারছি রাখতে। পান বাজারে নিলে খরচের টাকাও ফিরে পাচ্ছি না।’
জগশ্বর পানহাটের সাধারণ সম্পাদক মঈন উদ্দিন জানান, উৎপাদন বেশি ও রফতানি জটিলতা থাকায় এ বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় পানের দাম অনেক কম। কিন্তু শ্রমিক ও পানবরজের সরঞ্জামের দাম আগের তুলনায় দুই-তিন গুণ বেশি। সরকারি কোনো প্রণোদনা না থাকায় প্রান্তিক পানচাষীদের মধ্যে হাহাকার লক্ষ করছেন তিনি।
রফতানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন সিকদার তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের (সমিতির শীর্ষ নেতৃত্বের) উদ্দেশ্য হলো ঝামেলাগুলো শেষ করে ব্যবসা করা।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘পান উৎপাদন ও বাজারজাত প্রক্রিয়া ভালো করার পর রফতানি বাড়তে শুরু করেছে। পানের গুণগত মানও আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।’










