খাওয়াদাওয়া শেষে এক খিলি পান মুখে দেয়ার অভ্যাস বাঙালির দীর্ঘদিনের। তবে পান কেবল মুখশুদ্ধির উপকরণ নয়; বাঙালির সামাজিকতা, লোকাচার ও সংস্কৃতির সঙ্গেও এর রয়েছে নিবিড় যোগ। অতিথি আপ্যায়ন, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, সম্পর্ক পাকা করা কিংবা ধর্মীয় আচার—বিভিন্ন আয়োজনে পান-সুপারির ব্যবহার একসময় ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময়ের সঙ্গে অনেক রীতিতে পরিবর্তন এলেও বাঙালির ঐতিহ্যে পানের জায়গা এখনো অটুট।

অতিথি আপ্যায়নে পান পরিবেশনের রীতি বেশ পুরনো। খাওয়াদাওয়া শেষে অতিথির সামনে পানদানি এগিয়ে দেয়া ছিল সৌজন্য ও সম্মান প্রদর্শনের একটি উপায়। গ্রামাঞ্চলে সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা আত্মীয়-স্বজনের আগমন উপলক্ষে এখনো অনেক বাড়িতে পান-সুপারির বিশেষ আয়োজন করা হয়। পানের খিলি সাজানো, সুপারি কাটা ও চুন-মসলার পরিমিত ব্যবহারে প্রকাশ পায় আয়োজকের যত্ন ও আন্তরিকতা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পান পরিবেশনের ধরনেও রয়েছে বৈচিত্র্য।

বিয়ের সম্পর্ক পাকা করার আনুষ্ঠানিকতায় বর ও কনে পক্ষের মধ্যে পান-সুপারি আদান-প্রদানের রীতি প্রচলিত। কোথাও কোথাও এ আয়োজন ‘পানচিনি’ নামে পরিচিত। আধুনিক বিয়ের কার্ডের প্রচলন থাকলেও গ্রামাঞ্চলে প্রবীণদের সম্মান জানিয়ে পান-সুপারি দিয়ে নিমন্ত্রণ জানানোর রেওয়াজ এখনো রয়েছে। বিয়ের ভোজ শেষে অতিথিদের পান পরিবেশন কিংবা পানের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখাও বাঙালি বিয়ের পরিচিত অনুষঙ্গ।

বিয়ের পর নতুন বউকে দেখতে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা এলে তাদের পান-সুপারি দিয়ে আপ্যায়ন করার রীতিও বহু পরিবারে প্রচলিত ছিল। অনেক অঞ্চলে কনের বাড়ি থেকে নতুন বউয়ের সঙ্গে মিষ্টি, চিড়া-মুড়ি ও পান পাঠানোর রেওয়াজ রয়েছে। বউ দেখতে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা এলে তাদের সামনে সেই পান-সুপারি পরিবেশন করা হয়। আবার নতুন বরের জন্য সাজানো পানের খিলিতে কাঁচামরিচ লুকিয়ে রেখে কৌতুক করার চলও একসময় দেখা যেত। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার ফাঁকে এসব ছোট ছোট আয়োজন হাসি-ঠাট্টা ও আনন্দের উপলক্ষ তৈরি করত।

হিন্দু ধর্মীয় আচার ও বিয়ের অনুষ্ঠানেও পানপাতার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। বিয়েতে শুভদৃষ্টির সময় বর-কনের মুখের সামনে পানপাতা ধরার রীতি রয়েছে। নির্দিষ্ট মুহূর্তে কনে পানপাতা সরিয়ে বরের দিকে তাকালে আনুষ্ঠানিকতায় যোগ হয় নান্দনিকতা। দুর্গা পূজার বিজয়া দশমীতে উমা বরণের সময় সিঁদুর ও মিষ্টির সঙ্গে পান নিবেদনের রীতিও পরিচিত। বিভিন্ন পূজা ও ব্রতকেন্দ্রিক আয়োজনে পান-সুপারির উপস্থিতি ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সামাজিক আপ্যায়নের ঐতিহ্যকেও তুলে ধরে।

একসময় পান সাজানো ছিল গৃহস্থালির একটি বিশেষ দক্ষতা। সঠিক নিয়মে পান বাছা, সুপারি কাটা, চুন ও মসলার পরিমিত ব্যবহার এবং নিখুঁত খিলি গড়ার পেছনে থাকত গভীর যত্ন। বিশেষ করে সম্ভ্রান্ত পরিবারে কনে দেখার সময় পাত্রীকে নিজ হাতে পান সাজিয়ে গুণপনার পরিচয় দিতে হতো। লবঙ্গ, খয়ের কিংবা রুপালি তবকের কারুকাজে সাজানো খিলিগুলো ছিল যেন একেকটি শিল্পকর্ম।

পানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নানা অনুষঙ্গও ছিল গৃহস্থালির আভিজাত্যের প্রতীক। পানদানি, পানবাটা, পানের ডিব্বা, চুনের কৌটা, পিকদানি ও সুপারি কাটার জাঁতি ছিল বহু ঘরের অতিপরিচিত সামগ্রী। স্বর্ণ, রৌপ্য কাঁসা কিংবা পিতলের তৈরি এসব তৈজসপত্রে ফুটিয়ে তোলা হতো সূক্ষ্ম নকশা ও মীনার কাজ।