স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষাবাদ করা যায়নি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জেলার অন্তত ২৫-৩০ হাজার কৃষক। দীর্ঘদিন পানি জমে একদিকে যেমন কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকছে, অন্যদিকে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য। পরিবেশ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, অতিবৃষ্টি, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর মতো বিষয় উপকূলীয় এলাকায় জলাবদ্ধতার সংকটকে আরো জটিল করে তুলছে। ফলে সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ক্রমেই চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার পাঁচ উপজেলাতে ১২ হাজার ৬৮৫ হেক্টর কৃষিজমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৭৩০ হেক্টর, কলারোয়ায় ১ হাজার ৩৬০ হেক্টর, তালায় ৭ হাজার ৬৫ হেক্টর, আশাশুনিতে ৪৫০ হেক্টর ও শ্যামনগরে ৮০ হেক্টর জমি।
জেলার অন্যতম ফসলি বিল তালার শাকদাহ। এ বিলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এ বিলের এক কৃষক সোহরাব হোসেন জানান, জলাবদ্ধতার কারণে আট থেকে ১০ বছর ধরে তারা আমন ধান চাষ করতে পারেন না। অথচ এক দশক আগেও তাদের শাকদাহ বিলের ওই জমিতে প্রচুর পরিমাণ আমন উৎপাদন হয়েছে। বর্তমানে সে বিলে হাজার হাজার কৃষক আমন চাষ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিলের আরেক কৃষক গোবিন্দ দাশও একই কথা জানান।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাকদাহ বিলে বছরে বোরো ধান ছাড়া অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বোরো মৌসুমের বাইরে অন্য সময়ে জমি চাষের অনুপযোগী থাকে। শুধু চাষ নয়, জলাবদ্ধতার কারণে এলাকায় কমে যাচ্ছে গবাদিপশু পালনও। বিলের উন্মুক্ত চারণভূমি পানিতে থাকায় ছাগল, গরু ও মহিষ পালন করা যাচ্ছে না। শুধু শাকদাহ বিলই নয়, স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে জেলার পাঁচ উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতেও।
কৃষক আন্দোলন কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক অধ্যক্ষ আশেক-এলাহী জানান, সাতক্ষীরার দুর্যোগ পরিস্থিতি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই। অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার মতো কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু পালন, বসতবাড়ি ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। এ ভয়াবহ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে হলে নদী ও খাল পুনঃখনন করা অতি জরুরি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ইকবাল আহমেদ বণিক বার্তাকে জানান, সাতক্ষীরার অর্থনীতি ও গ্রামীণ জনজীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। আমন এ অঞ্চলের কৃষকদের গুরুত্বপূর্ণ ফসল। কিন্তু জমিতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় সময়মতো চারা রোপণ ও চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষকরা শুধু একটি মৌসুমের উৎপাদন থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন না; তাদের বীজ, সার, শ্রম ও জমি প্রস্তুতের ব্যয়ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালক সরদার শরিফুল বণিক বার্তাকে জানান, জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ নয়। বসতবাড়ি ও চলাচলের পথ দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকলে নিরাপদ পানি সংগ্রহ, পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। স্থির ও দূষিত পানির সংস্পর্শে চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় গাছপালা, জলজ উদ্ভিদ, দেশীয় মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে নদী ও খালের নাব্যতা বাড়াতে সরকারের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তা না হলে দ্রুত যেভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে, তাতে কৃষিজমি ক্রমান্বয়ে জলাবদ্ধতায় গ্রাস করবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র সাতক্ষীরা কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শিমুল মণ্ডল বণিক বার্তাকে জানান, জলাবদ্ধতার কারণ নির্ধারণে এলাকাভিত্তিক পানি প্রবাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার পাশাপাশি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় উপযোগী ফসলের জাত, বিকল্প চাষাবাদ পদ্ধতি, কৃষি পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা জোরদার করা দরকার। এছাড়া নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং গবাদিপশু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।










