প্রাণ-পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে প্লাস্টিক। প্রকৃতিতে দীর্ঘ সময় অক্ষত অবস্থায় থাকে বলে এই পলিমারকে জলবায়ু পরিবর্তনের পরেই সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্লাস্টিক এখন ছড়িয়ে পড়েছে খাদ্যশৃঙ্খলেও।  সর্বশেষ প্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেল গর্ভস্থ শিশুর প্লাসেন্টাতে।  এমন ঘটনা এটিই প্রথম। জরায়ুতে ভ্রুণকে পুষ্টি জোগান দেয়ার এই নালীকে গর্ভফুল, নাড়ি বা অমরাও বলা হয়।

মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো স্বাস্থ্যগত প্রভাব রয়েছে কিনা তা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে অজানা। তবে তাদের ধারণা, এসব প্লাস্টিক কণা এমন সব রাসায়নিক বহন করতে পারে যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে বা ভ্রুণের বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।  

অমরায় প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব পাওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, কণাগুলো সম্ভবত মায়েরা খাবারের সঙ্গে খেয়ে ফেলেছিলেন বা তাদের নিঃশ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করেছে। 

এই প্লাস্টিক কণাগুলো চারটি সুস্থ সবল নারীর প্লাসেন্টাতে পাওয়া গেছে। তারা অবশ্য সুস্থ স্বাভাবিক শিশু জন্ম দিয়েছেন কোনো ধরনের সি-সেকশন অস্ত্রোপচার ছাড়াই।  প্লাস্টিক কণাগুলো ভ্রূণ এবং মা উভয় অংশের প্লাসেন্টা এবং জরায়ুর ভেতরে যে ঝিল্লির মধ্যে ভ্রূণের বিকাশ ঘটে সেখানেও পাওয়া গেছে। 

প্রতিটি প্ল্যাসেন্টার প্রায় ৪ শতাংশ বিশ্লেষণ করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। তার মানে শরীরে এর উপস্থিতি আরো বেশি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।  নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কণাগুলো নীল, লাল, কমলা বা গোলাপী রঙযুক্ত। ফলে বলা যেতে পারে এসব কণা এসেছে প্যাকেজিং, পেইন্টস বা প্রসাধনী এবং ব্যক্তিগত রূপচর্চার বিভিন্ন বস্তু থেকে।

অমরায় পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলোর বেশিরভাগই ১০ মাইক্রন আকারের (০.০১ মিমি)।  এর অর্থ এগুলো অনায়াসে রক্ত প্রবাহের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে।  কণাগুলো শিশুর দেহেও প্রবেশ করে থাকতে পারে।  অবশ্য গবেষকরা সেটি শনাক্ত করতে পারেননি।

রোমের সান জিওভান্নি ক্যালিবিতা ফাতেবনেফ্রেতেলি হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আন্তোনিও রাগুসা বলেন, এটি একটি সাইবোর্গ শিশুর জন্ম দেয়ার মতো ঘটনা।  কারণ এটি এমন মানব শিশু নয় যেটি শুধু মানুষের কোষ দিয়ে তৈরি, বরং এটি জৈব ও অজৈব বস্তুর মিশ্রণ।  এটি জানার পর মায়েরা অত্যন্ত হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।  আন্তোনিও এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ এখন পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে গেছে।  এভারেস্টের চূড়া থেকে গভীর মহাসাগর পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে।  মানুষ এরই মধ্যে খাদ্য এবং পানীয়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র কণাগুলো ভক্ষণ করতে শুরু করেছে।  শ্বাস নেয়ার মাধ্যমেও শরীরে প্রবেশ করছে প্লাস্টিক কণা। 

এই গবেষণাটি পরিচালনার সময় ইতালীয় গবেষকরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।  তারা সম্পূর্ণ প্লাস্টিকমুক্ত একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।  সবাই ব্যবহার করেছে সুতি হাতমোজা এবং সুতি তোয়ালে। যাতে বাইরে থেকে প্লাস্টিক দূষণের কোনো সম্ভাবনা না থাকে।  

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান