বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহ বা চাঁদ আইও, যা সৌরজগতের সবচেয়ে অগ্ন্যুৎপাতপ্রবণ গ্রহ হিসেবে পরিচিত। সেখানে অবিরাম আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটছে। তবে, এবার জুনো মহাকাশযানের মাধ্যমে নতুন এক চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি জুনো মহাকাশযান আইওতে শতাধিক সক্রিয় আগ্নেয়গিরির অস্তিত্বের পাশাপাশি, নতুন করে বেশ কয়েকটি লাভা হ্রদ আবিষ্কার করেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে 'জিওফিজিক্যাল রিসার্চ প্ল্যানেটস' জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ আবিষ্কারের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

১৯৭৯ সালে ভয়েজার মহাকাশযান আইওর নিকট দিয়ে উড়ে যাওয়ার পর থেকেই এর আগ্নেয়গিরি সম্পর্কে জানা যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, গত ৪.৬ বিলিয়ন বছর ধরে এই চাঁদটিতে চলছে অবিরাম অগ্নুৎপাত। রোমের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো মুরা ব্যাখ্যা করেন, বৃহস্পতি ও পার্শ্ববর্তী চাঁদগুলোর প্রাবল্য মহাকর্ষীয় টানে আইওর ভূপৃষ্ঠ প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত বিকৃত হয়। এই সংকোচন-প্রসারণই তাপ সৃষ্টি করে, যা আগ্নেয়গিরির শক্তির উৎস। আইও-তে ঘটে যাওয়া আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ প্রায় প্রতিদিনই হয়। যা ৪.৬ বিলিয়ন বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইও-এর লাভা হ্রদগুলো পৃথিবীতে থাকা লাভা হ্রদের তুলনায় অনেক বড়। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই হ্রদগুলোর আকার বিশাল, যার ব্যাস প্রায় ১০ কিলোমিটার থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। পৃথিবীতে যা সাধারণত কয়েক শত মিটার থেকে কয়েক কিলোমিটার মাপের হয়।

কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ভলক্যানোলজিস্ট আইনাত লেভ বলেন, অন্যান্য গ্রহের লাভা প্রবাহ পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি চরম। আইও তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

নাসার জুনো মহাকাশযান ২০১৬ সাল থেকে বৃহস্পতি গ্রহের চারপাশে ঘুরছে এবং এই গবেষণার জন্য জুনোকে ইনফ্রারেড ক্যামেরা দিয়ে আইওর বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করতে ব্যবহার করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে, আইওতে প্রায় ৪০টির বেশি লাভা হ্রদ রয়েছে। এই হ্রদগুলোর চারপাশে সাধারণত ঠান্ডা লাভার আবরণ থাকে, যা এই হ্রদগুলোর মাঝে তরল লাভার প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে।

মজার ব্যাপার হলো, কোনো হ্রদের মধ্যেই উত্তপ্ত অঞ্চল নেই।

এ থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, ম্যাগমা সরাসরি হ্রদের কেন্দ্র থেকে উত্থিত হয় না। বরং, ভূগর্ভস্থ কোনো পথে এটি প্রবাহিত হয়। আলেসান্দ্রো মুরা বলেন, একাধিক হ্রদ যদি একই ম্যাগমা উৎস থেকে পুষ্ট হয়, তাহলে তাদের আকার সমন্বিতভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।

জুনো মিশন আগামী কয়েক বছর ধরে আইওর আরো হাই রেজ্যুলেশনের ছবি পাঠাবে।

মুরার দলের পরিকল্পনা, লাভা হ্রদের পরিবর্তন ট্র্যাক করে ম্যাগমা নেটওয়ার্কের মানচিত্র তৈরি করা। এ গবেষণা শুধু আইও নয়, অন্যান্য গ্রহের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া বুঝতেও সাহায্য করবে।

মুরা বলেন, ‘আইওর লাভা হ্রদগুলো অনেকটা তার ভূ-অভ্যন্তরের জানালা। এদের মাধ্যমে আমরা গ্রহের অন্তর্নিহিত শক্তির গতিপথ দেখতে পাচ্ছি’।

মহাকাশের অগ্নিময় চাঁদ আইও আগামী দিনে আরো কত রহস্য উন্মোচন করে, এখন তা দেখার অপেক্ষা।