বিষপানে মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর শুভাকাঙ্ক্ষী ও বন্ধুরা তাকে কারাগার থেকে পালানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে সবার প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ‘আসামি’। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা উচিত। এমনকি আইন তার বিরুদ্ধে গেলেও!

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯। শিষ্য ও বন্ধুরা ঘিরে আছেন বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসকে। এথেন্সের আদালত তাকে ‘যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করা এবং দেবতাদের অবমাননা করার’ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। বিষপানে সেই মৃত্যু কার্যকর করা হবে।

কারারক্ষীরা তাকে হেমলক বিষ পান করালেন। প্রথমে তার পা, এরপর ধীরে ধীরে পুরো শরীর অসাড় হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়লেন এবং মৃত্যুকে বরণ করলেন।

সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড ছিল ইতিহাসের প্রথম মিডিয়া ট্রায়াল। মিডিয়া ট্রায়াল বলতে বোঝায়, যখন মিডিয়া আদালতের মতো কাজ করে এবং কোনো মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগেই অভিযুক্তকে দোষী বা নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করে।

সক্রেটিসের মৃত্যুর পর এথেনীয় সমাজে প্রশ্ন ওঠতে শুরু করে, বিচারটি কতটুকু ন্যায়সংগত হলো তা নিয়ে।

সক্রেটিসের শিষ্য প্লেটো পরবর্তীতে ‘অ্যাপোলজি’ গ্রন্থে এই বিচারের বিস্তারিত বর্ণনা দেন এবং দেখান কীভাবে জনমত ও রাজনৈতিক প্রভাব একজন মহান দার্শনিককে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

আই.এফ. স্টোন তার ‘দ্য ট্রায়াল অব সক্রেটিস’– এ সক্রেটিসের বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও জনমত দ্বারা চালিত একটি ঘটনা হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন।

রবার্ট গ্রিনও তার দ্য ল’স অব হিউম্যান নেচার গ্রন্থে সক্রেটিসের বিচারকে প্রাচীন বিশ্বের ‘পাবলিক অপিনিয়ন ট্রায়াল’ বা মিডিয়া ট্রায়ালের প্রাথমিক রূপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

যদিও তখন আধুনিক মিডিয়া ছিল না, তবে গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন করেছিল নাটক, জনমত, এবং রাজনৈতিক প্রচারণা। বিশেষত গ্রিক নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনিস তার 'দ্য ক্লাউডস' নাটকে সক্রেটিসকে ব্যাঙ্গাত্মকরূপে উপস্থাপন করেছিলেন। এটি সক্রেটিসের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। বিচারকরা ও নাগরিকরা এই নেতিবাচক প্রচারের ফলে প্রভাবিত হয়েছিলেন। যার প্রতিক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

সক্রেটিসের বিচার ৫০০ সদস্যবিশিষ্ট জুরি আদালতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে সাক্ষ্য ও যুক্তির চেয়ে জনমতের ভূমিকা বেশি ছিল। প্রচলিত ধর্ম ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তার সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তার প্রকাশ্য অবস্থান তাকে জনরোষের মুখে ফেলে দেয়। বিচার চলাকালীন তিনি নিজের বক্তব্যে সত্য ও নৈতিকতার ওপর জোর দেন এবং আপস করতে অস্বীকৃতি জানান।

শেষ পর্যন্ত, ২৮০-২২০ ভোটে সক্রেটিস দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাকে হেমলক বিষ পান করিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

সক্রেটিসের বিপক্ষে যাওয়া এ রায় ছিল এমন একটি বিচার, যেখানে জনমত ও প্রচারণার ভূমিকা বিচারিক রায়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড দেখিয়েছে, কীভাবে সমাজের প্রচারমাধ্যম ও জনমত একজন ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। এটি দেখিয়ে দেয়, কীভাবে জনমত ও প্রচারণার প্রভাব বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং কখনো কখনো ন্যায়বিচারকে বিকৃত করতে পারে।