একদল গবেষক ১৯৯৯ সালে পৃথিবীর মূল্য নির্ধারণ করেছিলেন।  মূলত এই গ্রহটি প্রতিবছর মানবজাতিকে যা যা ‘বাস্তুসংস্থান পরিসেবা’ দিয়ে থাকে তারই একটি মূল্য নির্ধারণ করেছিলেন তারা। তারা দেখিয়েছিলেন, পৃথিবীর এই সেবামূল্যের পরিমান দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার।  এ অংকটি বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় দ্বিগুণ।

এই গবেষক দলের একজন ছিলেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির বাস্তুসংস্থানের অধ্যাপক শহীদ নাঈম।  তিনি বলেন, ওই গবেষক দলে ছিলেন অর্ধেক বাস্তুবিদ আর বাকি অর্ধেক অর্থনীতিবিদ।  এইভাবে পৃথিবীর মূল্য নির্ধারণের বিষয়টিকে বাস্তুবিদরা রীতিমতো ভয়ঙ্কার ব্যাপার বলে মনে করেছিলেন। অর্থনীতিবিদরা প্রকৃতির অর্থমূল্য থাকাটাকে যৌক্তিক বলে মানলেও এটি কীভাবে করা সম্ভব সেটি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন।

’বাস্তুতান্ত্রিক পরিসেবার’ আর্থিক মূল্য নির্ধারণ এই একুশ শতকের পরিবেশ সংরক্ষণ ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।  এটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরকারি নীতিকে পথ দেখায়।  অ্যামাজনকে সুরক্ষা প্রদান এবং কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিষয়ে ডাভোসে চলতি সপ্তাহে আলোচনার আলোচ্যসূচিতে প্রকৃতির এই মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।  চলতি বছরের শেষ নাগাদ চীনের কুনমিংয়ে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কিত চুক্তির বিষয়ে আলোচনায় এটিই প্রধান বিষয় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

বীমা সংস্থা সুইস রে-এর মতে, বৈশ্বিক জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি- ৪২ ট্রিলিয়ন ডলার- উচ্চ-কার্যকরী জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল।  মানবজীবনের অস্তিত্ব রক্ষায় ভূমিকা রাখে এমন ‘প্রাকৃতিক পুঁজি’ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।  এটি বলতে বুঝায়: পৃথিবীকে শীতল রাখতে বনাঞ্চলের ভূমিকা, জলাভূমির বন্যা প্রতিরোধ বৈশিষ্ট্য এবং বিপুল খাদ্য উৎপাদনের উৎস হিসেবে সমুদ্র- এসব সেবার একটি আর্থিক মূল্য।  এর সঙ্গে যুক্ত হবে পশুপাখি ও অন্যান্য প্রাণীও।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) রালফ চামিহাসের হিসাবে,  প্রতিটি প্রাণীর জন্য একটি বন্যহাতির পরিসেবার মূল্য ১৭ লাখ ডলার। যেখানে দাঁত ও হাড় (আইভরি) সংগ্রহের জন্য যারা হাতি হত্যা করেন তারা কিন্তু একটি হাতি থেকে বড়জোর ৪০ হাজার ডলার পান।  একইভাবে তার হিসাব অনুযায়ী, একটি তিমির দাম ২০ লাখ ডলারের বেশি।  তিমির চমৎকার কার্বন ধারণ সক্ষমতার কারণে এমনিতেই এই প্রাণীপ্রজাতিটি সুরক্ষার দাবি রাখে।

অবশ্য প্রকৃতি সম্পর্কে এই ধরনের চিন্তাভাবনা অত্যন্ত বিতর্কিত একটা ব্যাপার।  অধ্যাপক নাঈম প্রায়শই ব্যাপারটিকে মজার ছলে বলে থাকেন।  তিনি মজা করে বলেন, এর মানে কিন্তু এই নয় যে মৃত প্রাণীদেহ পচানোর জন্য ছত্রাকেরা একটা চার্জ চেয়ে বসবে! তারপরও এটা সত্য যে তারা যে কাজটি করে দেয় সেটি ব্যয়বহুল।  গাছেরা যদি অক্সিজেনের জন্য টাকা চাইতে শুরু করে তাহলে কিন্তু মানুষ বড় সমস্যায় পড়বে!

অধ্যাপক নাঈম বলেন, বাস্তুসংস্থান পরিসেবার মূল্য আমাদের এটা বুঝাতে সহায়তা করে যে, গাছপালা, প্রাণী এবং বাস্তুতন্ত্র মৃতের চেয়ে জীবিত মানুষের জন্য বেশি মূল্যবান।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান