পেনিয়কো অবস্থিত পেরুর রাজধানী লিমা থেকে উত্তরে, হুয়ারুয়া প্রদেশের এক দুর্গম অঞ্চলে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬০০ মিটার উঁচুতে। পেরুর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, এটি ছিল কারাল সভ্যতার ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এক নগরকেন্দ্র, যা শুধু স্থাপত্যশৈলী নয়, বরং সাংস্কৃতিক সংযোগেও এক ঐতিহাসিক যুগান্তরের প্রতিনিধিত্ব করে।
কারাল প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলের পরিচালক ও প্রধান গবেষক রুথ শাদি বলেন, ‘পেনিয়কো ছিল এক কৌশলগত শহর। এখান থেকে উপকূলীয় সুপে ও হুয়ারুয়ার শহরগুলোর সঙ্গে যেমন সংযোগ তৈরি হতো, তেমনি আন্দিজের উচ্চভূমি ও আমাজনের অন্তর্দেশীয় অঞ্চলগুলোতেও পৌঁছে যেত এর প্রভাব। এই সংযোগ শুধু বাণিজ্যের জন্য নয়—ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক বিনিময়ের এক সেতুবন্ধনও ছিল এটি।’
খননকাজে এখন পর্যন্ত ১৮টি স্থাপনার চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে আবাসিক ভবন, কিছু কাঠামো এবং একটি বিশাল ধর্মীয় স্থাপনা, যা গবেষকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছে।
এই ধর্মীয় ভবনে আবিষ্কৃত হয়েছে মাটির ভাস্কর্য, পূজার সামগ্রী ও শাঁখা দিয়ে তৈরি সঙ্গীতযন্ত্র ‘পুতুতু’, যা প্রাচীন আন্দিজ সমাজে ব্যবহৃত হতো দেবতাকে আহ্বান জানাতে বা জনগণকে একত্র করতে। একসময় এই শাঁখার ধ্বনি পুরো উপত্যকায় প্রতিধ্বনিত হতো—এখন সেই অতীত ফিরে আসছে পাথরের নিঃশব্দ কোলাহলে।
গবেষকদের ধারণা, আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা কারাল যখন ধীরে ধীরে পতনের পথে, তখন তার উত্তরসূরি হিসেবে পেনিয়কো মাথা তোলে। শহরটির ভৌগোলিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক রীতিনীতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে এক নতুন আঞ্চলিক কেন্দ্র।
বিশেষত এখানে হেমাটাইট নামক এক ধরনের লাল রঞ্জকের বাণিজ্য হত, যা আন্দিজ সংস্কৃতিতে শুধু অলংকার হিসেবে নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে দেখা হতো—জন্ম, মৃত্যু, মাটি ও দেবতার প্রতিনিধিত্ব করত এই রং।
বহু শতাব্দী ধরে মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা এই নগরী এখন আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে একটি আধুনিক ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার, রয়েছে তথ্য ও অভ্যর্থনা কক্ষ, আর সংরক্ষিত ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে হেঁটে দেখার ব্যবস্থা—যা পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে ইতিহাস ছুঁয়ে দেখার।
এই শহরকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হচ্ছে ‘পেনিয়কো রাইমি’—এক জনোৎসব, যেখানে প্রাচীন রীতিতে পালন করা হবে পাচামামা (পৃথিবী মাতার) পূজা। থাকছে ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম, সঙ্গীত ও আনুষ্ঠানিক আচার-অনুষ্ঠান।
এই উৎসব শুধু এক অতীতগাথা স্মরণ নয়, বরং প্রাচীন ও আধুনিকের মিলনমেলা। এখানে ইতিহাস আর বর্তমান একসাথে হাঁটবে—পেরুর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের নতুন মুখ হয়ে।










