বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি পড়ে নারীদের ওপরেই। বিশ্বজুড়ে অনেক নারী পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভুত সংকট মোকাবেলায় পরিবর্তনের শক্তিশালী বাহক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন নারীরা। বিশ্বজুড়ে রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ ও উদ্ভাবনী সমাধানের জন্য কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন তারা। এ প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরব এমনই দশজন নারীর কথা, যারা বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

১. এলিজাবেথ মে

প্রথমেই আসবে কানাডার গ্রিন পার্টির নেতা এলিজাবেথ মে’র নাম। তিনি একজন কানাডিয়ান পরিবেশবিদ, আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। ২০০৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কানাডার গ্রিন পার্টির নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এখনো যুক্ত আছেন সবুজ আন্দোলনের সঙ্গেই।

এলিজাবেথ মে পরিবেশ ও আদিবাসী বিষয়ক ইস্যুগুলোর প্রবল সমর্থক। কানাডা যেন ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি তিনি অবসর থেকে ফিরে আবার কাজে যোগ দিয়েছেন। এ নারী বলেন, ‘বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা বৃদ্ধি আমাদের ধারণার চেয়েও বিপজ্জনক। বিজ্ঞানের বাস্তবতা মেনে নিয়ে আমাদের উচিত গুরুত্বের সঙ্গে পদক্ষেপ নেয়া।’

may

এলিজাবেথ মে। ছবি: সংগৃহীত

ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় পরিবেশ বিষয়ে নিজের মূল্যবোধে অটল থেকেছেন এলিজাবেথ মে। ২০২৩ সালে গ্লোবাল নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘কানাডা এখন জলবায়ু সংকট অস্বীকারের নতুন প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে। কারণ দেশটি এমন সব নীতি অনুসরণ করছে, যা কার্বন নির্গমন কমানোর আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হবে।’

২. মারিনা সিলভা

মারিনা সিলভা ব্রাজিলের পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী। কপ-২৮ সম্মেলনে তিনি উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। আশির দশকে ব্রাজিলের আদিবাসী ও রেইনফরেস্ট সংরক্ষণের জন্য আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন মারিয়া। ওই আন্দোলনের ফলে ২০ লাখ হেক্টর বনাঞ্চল রক্ষা পায় এবং শত শত আদিবাসী মানুষের নিরাপদ জীবিকা নিশ্চিত হয়।

silva

মারিনা সিলভা। ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের পরিবেশ মন্ত্রী হিসেবে অ্যামাজন বন সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিল ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন তিনি। ২০০৪ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে নেয়া তার উদ্যোগগুলোর ফলে দেশটিতে বন উজাড়ের হার ৮৪ শতাংশ হ্রাস পায়।

৩. কিমিকো হিরাতা

জাপানের ক্লাইমেট ইন্টিগ্রেটের নির্বাহী পরিচালক কিমিকো হিরাতা। ২০১১ সালের ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করে জাপান। তবে কয়লা দূষণের প্রভাব নিয়ে গবেষণা প্রকাশ এবং স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করে এরকম ১৩টি পরিকল্পিত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ বন্ধ করতে সক্ষম হন হিরাতা। গবেষকরা বলছেন, তার এ উদ্যোগের ফলে প্রতি বছর অন্তত ৪২ মিলিয়ন টন কার্বন নির্গমন রোধ করা সম্ভব হয়েছে।

৪. এলেনি মিরিভিলি

গ্রিসের নাগরিক এলেনি মিরিভিলি জাতিসংঘের চিফ হিট অফিসার। ২০২১ সালে জাতিসংঘ তাকে চিফ হিট অফিসার হিসেবে হিসেবে নিয়োগ দেয়। তার লক্ষ্য ছিল শহরগুলোর টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করা। তিনি গ্রিসের এথেন্স শহরে জলবায়ু প্রকল্পের নেতৃত্ব দেয়ার পাশাপাশি শহরে সবুজায়ন বৃদ্ধি ও এজন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ করেছেন।

৫. ডায়েল তাকিতিমু

নিউজিল্যান্ডের মন্ত্রী পর্যায়ের উপদেষ্টা কমিটির সহসভাপতি ডায়েল তাকিতিমু একজন আদিবাসী অধিকারকর্মী ও পরিবেশ আইনজীবী। তিনি নিউজিল্যান্ডে পরিবেশ রক্ষার জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন।

dayle

ডায়েল তাকিতিমু। ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের একটি তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে ৪০ দিনব্যাপী আন্দোলন করে প্রতিষ্ঠানটির তেল উত্তোলন পরিকল্পনা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিলেন তাকিতিমু।

৬. দোরতে ক্রাউসে জেনসেন

ডেনমার্কের আরহাস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক দোরতে ক্রাউসে জেনসেন সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে কার্বন জমার পরিমাপ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এছাড়া জলবায়ু সংকটের প্রাকৃতিক সমাধানও খুঁজে বের করেন এ অধ্যাপক।

৭. ক্যাথরিন সারাহ ইয়াং

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ফিলিপ লেখক ও শিল্পী ক্যাথরিন সারাহ ইয়াং। শিল্প ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা তুলে ধরেন এই শিল্পী। ২০১৬ সালে"‘দ্য স্যুয়ার সোপারি’ শিরোনামে করা একটি প্রকল্পে তিনি নর্দমার পানি ব্যবহার করে সাবান তৈরি করে দেখান। ২০১৩ সালে ফিলিপাইনে আঘাত হানা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের পর এটি ছিল একটি শক্তিশালী বয়ান। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হওয়া ওই ঘূর্ণিঝড়ে ৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া তার ২০২১ সালের শিল্পকর্ম ‘দ্য ওয়েইং অব দ্য হার্ট’-এ তিনি অস্ট্রেলিয়ান বুশফায়ারের ধ্বংসাবশেষ থেকে একটি হৃদপিণ্ডের ভাস্কর্য তৈরি করেছিলেন।

৮. মেলিনা লাবুকান মাসিমো

কানাডার স্যাক্রেড আর্থ সোলারের প্রতিষ্ঠাতা মেলিনা লাবুকান মাসিমো কাজ করেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প নিয়ে।

melina

মেলিনা লাবুকান মাসিমো। ছবি: সংগৃহীত

তিনি ‘ডিকলোনাইজিং ক্লাইমেট পলিসি ইন কানাডা’ এবং ‘ইন্ডিজেনাস-লেড ক্লাইমেট পলিসি’ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশ করে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য রূপান্তরমূলক পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন।

৯. নিকোলা কাগোরো

জিম্বাবুয়ের রাঁধুনী নিকোলা কাগোরো দেশটিতে ভেগান সংস্কৃতি প্রচারের কাজ করছেন। কপ-২৮ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘ভেগান খাদ্যাভাস মাংসাশী খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কম গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন ঘটায়। যদি ভেগান সংস্কৃতির প্রসার কার্বন নির্গমন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে না পারে, তাহলে আমি আর কোনো আশা দেখছি না।'

১০. উইনি চেচে

কেনিয়ার জলবায়ু কর্মী উইনি চেচে একজন পরিবেশ সংরক্ষণবাদী ব্লগার এবং কেনিয়া এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান। তিনি জলবায়ু সচেতনতার জন্য ব্লগিং করেন। তিনি সবসময় বলেন, ‘আমরা প্রকৃতির রক্ষক। পরিবেশর সুরক্ষা আমাদেরই দায়িত্ব।’