ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হমালার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত সামরিক সম্পৃক্ততা আবারো সম্প্রসারিত হলো। সেইসঙ্গে অঞ্চলটিতে মার্কিন ব্যয়ও সম্প্রসারিত হলো।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিক ব্যয় করা দেশ যুক্তরাষ্ট্র । তালিকায় থাকা পরবর্তী নয়টি দেশের সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়েও একাই বেশি ব্যয় করে দেশটি। ২০২৪ সালে মার্কিন সামরিক বাজেট ছিল ৯৯ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের ৩৭ শতাংশ।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের ব্রিফিং অনুযায়ী, ইরানে সাম্প্রতিক হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে সাতটি বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান। যার প্রতিটির মূল্য আনুমানিক ২১০ কোটি ডলার। ফোর্দো ও নাতাঞ্জের পারমাণবিক স্থাপনায় অন্তত ১৪টি ‘বাংকার-বাস্টার’ বোমা ফেলে হয়েছে—যার প্রতিটির দাম ১০ লাখ ডলার। এই অভিযানে ১২৫টিরও বেশি মার্কিন সামরিক বিমান অংশ নেয়, যার মধ্যে ছিল বোমার, ফাইটার জেট, ট্যাংকার, নজরদারি বিমান এবং সাপোর্ট ক্রু—সব মিলিয়ে এগুলো মোতায়েন ও পরিচালনায় খরচ হয় শত শত কোটি ডলার।
গত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দুটি যুদ্ধ ছিল ইরাক ও আফগানিস্তানে। টুইন টাওয়ারে হামলার প্রতিশোধ নিতে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় তারা বলেছিল, আল-কায়েদাকে ধ্বংস করতে এবং তালেবানকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতে তারা ওই অভিযান পরিচালনা করছে।
এর দুই বছরের কম সময় পর ২০০৩ সালের ২০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে। তাদের অভিযানের লক্ষ্য ছিল ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র (ডব্লিউএমডি) ধ্বংস করা এবং সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
আফগানিস্তানে প্রায় ২০ বছর ধরে যুদ্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা সামরিক অভিযানে পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধে সরাসরি প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোয় প্রাণহানিও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অন্তত ৫ লাখ ৫৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক ব্যয় হয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (ডিওডি) ব্যয় ২ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার, হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ব্যয় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার এবং ডিওডির মৌলিক বাজেট বৃদ্ধি করতে আরও ৮৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এ ছাড়া যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সাবেক সেনাদের চিকিৎসা খাতে ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ও যুদ্ধের খরচ মেটাতে নেওয়া ঋণের সুদ বাবদ অতিরিক্ত ১ লাখ কোটি ডলার ব্যয়।
ইতিমধ্যে ব্যয় হওয়া ৫ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলারের পাশাপাশি আগামী ৩০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধফেরত সাবেক সেনাদের দেখভালের জন্য আরও অন্তত ২ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে ২০০১ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট যুদ্ধ ব্যয় আনুমানিক ৮ লাখ কোটি ডলারে দাঁড়াচ্ছে।
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিদেশি সাহায্যপ্রাপ্ত দেশ। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, ১৯৫৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল অন্তত ২৫ হাজার ১২০ কোটি ডলার পেয়েছে। একটি ১০-বছর মেয়াদি সমঝোতা চুক্তির আওতায় ২০১৬ সাল থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রতি বছর ৩৮০ কোটি সামরিক সাহায্য দিচ্ছে। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত ১ হাজার ৭৯০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে, যা এক বছরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সহায়তার রেকর্ড।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন যুদ্ধগুলো আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ অন্যান্য অঞ্চলজুড়ে সরাসরি প্রায় ৯৪০,০০০ মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে।
এর বাইরেও খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধের অভাব কিংবা যুদ্ধজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করেছে আরো বহু মানুষ। এসব পরোক্ষ মৃত্যুর সংখ্যা অনুমান করা হয় ৩৬ লাখ থেকে ৩৮ লাখের মধ্যে। যার ফলে মোট মৃত্যু সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখের মতো।
এই সময়ের মধ্যে কমপক্ষে ৩০,০০০ মার্কিন সেনা, ঠিকাদার এবং মিত্র বাহিনীর সদস্যও নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে অন্তত ৭,০৫২ মার্কিন সেনা, ৮,১৮৯ ঠিকাদার এবং ১৪,৮৭৪ মিত্র সেনা।










