নিউইয়র্ক সিটি তাদের পরবর্তী মেয়র হিসেবে একজন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টকে নির্বাচিত করেছে। জোহরান মামদানির এই জয় কেবল একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়, বরং মার্কিন রাজনীতিতে একটি সুদূরপ্রসারী ধারণার মূল স্রোত প্রবেশের ইঙ্গিত। মামদানির জয়ে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম কী, এটা কি কমিউনিস্ট মতবাদের কাছাকাছি কোনোকিছু? আর এই জয়ই বা দেশের জন্য কী বার্তা নিয়ে এলো?
রাজ্যের অ্যাসেম্বলি সদস্য জোহরান মামদানি ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং ওয়ার্কিং ফ্যামিলিস পার্টি উভয়ের পক্ষ থেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার বিজয়ের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ)। মামদানির নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল পরিমাণ স্বেচ্ছাসেবক সরবরাহ করেছে এই সমাতান্ত্রিক সংগঠন।
মূলত নিউইয়র্ক সিটিকে ব্যয়বহুল থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে বসবাসযোগ্য করে তোলাই ছিল মামদানির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। তার মূল প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে— নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি স্থগিত, ফ্রি বাস সার্ভিস, সকলের জন্য শিশু পরিচর্যার ব্যবস্থা ও শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি।
বিজয় নিশ্চিতের পর দেয়া ভাষণে মামদানি ১৯ শতকের প্রখ্যাত সমাজতন্ত্রী ইউজিন ডেবসের উদ্ধৃতি দিয়ে এবং নিজেকে ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজমের কোনো একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়ন নেই। তবে এর অনুসারীরা কয়েকটি মূল বিষয়ে একমত। সংক্ষেপে বলা যায়, এটি এমন একটি রাজনৈতিক দর্শন, যা স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থার মতো সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতগুলোয় ব্যক্তিগত ও করপোরেশনের লাভের পরিবর্তে জনসাধারণের সুবিধার জন্য সরকারি নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দেয়।
ডিএসএ-এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে— ব্যক্তিগত মুনাফা, বৈষম্য এবং স্থিতাবস্থা রক্ষার নামে সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করা। সে সঙ্গে, একটি এমন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যা গণতান্ত্রিক পরিকল্পনা এবং বাজার পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক হবে।
মামদানি এই মতবাদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ১৯৬১ সালের একটি ভাষণের উদ্ধৃতি দেন— ‘একে গণতন্ত্র বলুন বা ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম—এদেশে ঈশ্বরের সকল সন্তানের জন্য সম্পদের সুষম বণ্টন থাকতে হবে।‘ ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম এমন একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ধারণা যা কমিউনিজম নয়, আবার পুঁজিবাদও নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিলেও মামদানি নিজে এ ধরনের সংজ্ঞায়নকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
কমিউনিজম যেখানে সমাজের আমূল কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার কথা বলে, ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টরা সেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজের ভেতরে থেকে পরিবর্তন আনতে চান। ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম কেবল ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি’ বা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি কিছু। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি সাধারণত পুঁজিবাদী কাঠামো বজায় রেখে শক্তিশালী কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। ইউরোপের কিছু দেশে এ পদ্ধতি দেখা যায়। অন্যদিকে, ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টরা পুঁজিবাদের ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে সমাজকে আরো এগিয়ে নিতে চাওয়ার কথা বলেন। সমাজতন্ত্রের কর্তৃত্ববাদী ধারণাকেও প্রত্যাখ্যান করেন তারা। স্বল্প মেয়াদে করপোরেশনগুলোর ক্ষমতা কমানো এবং কর্মজীবী মানুষের ক্ষমতা বাড়াতে সকলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশ সংক্রান্ত নানা সংস্কারের কথাও তারা বলে থাকেন।
ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজমের সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে ভার্মন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজেকে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে পরিচয় দেন। এতে বহু মানুষ এ মতবাদের সঙ্গে পরিচিত হয়। ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদ, মহামারি, ও ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্য—সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের প্রতি আকর্ষণ বেড়েছে। সাম্প্রতিক গ্যালাপ জরিপে দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এখন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সমাজতন্ত্রকে ইতিবাচকভাবে দেখেন, যা ২০১০ সালের ৫০ শতাংশ থেকে অনেক বেশি।
মামদানির জয় গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর আগেও আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ এবং রাশিদা তালিবের মতো ডিএসএ সদস্যরা নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। মামদানির জয়ের পর ওকাসিও-কর্তেজ ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমার কাছে এটা এমন এক মৌলিক ধারণা যেখানে কর্মজীবী মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার আছে।‘ উদাহরণ হিসেবে তিনি আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশু পরিচর্যার কথা উল্লেখ করেন।
যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, নিউইয়র্কের বাইরে এই মডেল সফল নাও হতে পারে, তবুও মামদানির জয় এক জোরালো বার্তা দিলো। তিনি একই সঙ্গে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির পুরনো যোদ্ধাদের ভোটের মাঠে হারিয়েছেন। টিন ভোগের রাজনৈতিক সম্পাদক লেক্স ম্যাকমেনামিন মন্তব্য করেছেন, মামদানি যদি সফলভাবে তার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেন এবং নিউইয়র্কের মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেন, তবে এই জয় কেবল একটি শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না— এটি গোটা দেশের মানুষের কাছে সোশ্যালিজমের অর্থ বদলে দিতে পারে।
এনপিআর অবলম্বনে










