যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা দখল করে নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে হোয়াইট হাউসে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ বিস্ময়কর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এ ঘোষণা ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নির্মূলকে সমর্থন করার শামিল। তার প্রেসিডেন্সির ইতিহাসে অনেক বিতর্কিত মন্তব্যের মধ্যেও এটাকে ধরা যেতে অত্যন্ত চমকপ্রদ এক ঘোষণা হিসেবে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
গ্রিনল্যান্ড ও পানামা দখলের হুমকি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার প্রস্তাব দেয়া ট্রাম্প এবার গাজাকে তার সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনায় যুক্ত করলেন। তিনি দাবি করেছেন, গাজাকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা’ বানানো যেতে পারে এবং এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য মোতায়েনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
মঙ্গলবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ফিলিস্তিনিরা গাজায় ফিরতে চায় কারণ, তাদের কোনো বিকল্প নেই। এটি বর্তমানে একটি ধ্বংসস্তূপ। এটি শুধুই একটি ধ্বংসস্তূপ। প্রায় প্রতিটি ভবন ধসে পড়েছে।
তিনি দাবি করেন, ফিলিস্তিনিরা শান্তি ও সম্প্রীতিতে অন্যত্র বসবাস করতে পারে। ট্রাম্প আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গাজা উপত্যকার দায়িত্ব নেবে এবং সেখানে থাকা অবিস্ফোরিত বোমা ও অন্যান্য বিপজ্জনক অস্ত্র ধ্বংস করবে।
ট্রাম্প বলেন, যদি প্রয়োজন হয়, আমরা তা করব। আমরা সেই স্থান দখল করব, উন্নয়ন করব, হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করব, এবং এটি এমন কিছু হবে যা পুরো মধ্যপ্রাচ্য গর্বের সঙ্গে দেখতে পারবে।
এই ঘোষণার আগে মঙ্গলবার ট্রাম্প এক চমকপ্রদ প্রস্তাব দেন, যেখানে তিনি গাজার ২০ লাখ ফিলিস্তিনির স্থায়ী পুনর্বাসনের কথা বলেন। তিনি জর্ডান, মিশর ও অন্যান্য আরব দেশগুলোকে আহ্বান জানান যেন তারা গাজার ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করে। ট্রাম্প দাবি করেন, উপকূলীয় অঞ্চল ত্যাগ করাই তাদের একমাত্র বিকল্প।
ট্রাম্প বলেন, তিনি ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের পক্ষে। তবে এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সে সম্পর্কে কোনো বিশদ বিবরণ দেননি তিনি।
তার এই প্রস্তাবে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ফিলিস্তিনিদের গণবিতাড়নের বিরুদ্ধে অবস্থানের সঙ্গে তার এ বক্তব্য সাংঘর্ষিক।
সংবাদ সম্মেলনে শত শত সাংবাদিকের সামনে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মার্কিন সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হবে কিনা। এর জবাবে তিনি বলেন, গাজার ক্ষেত্রে আমরা যা প্রয়োজন তা করব। যদি প্রয়োজন হয়, আমরা তা (সেনা মোতায়েন) করব।
তবে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এবং কোন কর্তৃত্বের বলে গাজার ভূমি দখল করে দীর্ঘমেয়াদে দখল বজায় রাখতে পারে— এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি তিনি। ট্রাম্প বলেন, আমি এখানে দীর্ঘমেয়াদী মালিকানার বিষয়টি দেখছি এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যে এবং সম্ভবত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনবে।
তিনি আরো দাবি করেন যে, এ বিষয়ে আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি এবং তারা এই ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
তিনি গাজাকে ‘নরকতুল্য’ ও ‘মৃত্যু ও ধ্বংসের প্রতীক’ বলে বর্ণনা করে বলেন, সেখানে থাকা ফিলিস্তিনিদের ‘বিভিন্ন স্থানে’ পুনর্বাসিত করা উচিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিশর ও জর্ডানের নেতারা এই পরিকল্পনাকে গ্রহণ করবেন।
গাজার পুনর্বাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি বিশ্বের সব মানুষের জন্য একটি নতুন আবাস হতে পারে এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা হতে পারে।
ট্রাম্পকে সাধারণত ‘হোয়াইট হাউসের ইতিহাসে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করা নেতানিয়াহু এ সময় বলেন যে, ট্রাম্পের ধারণাটির প্রতি মনোযোগ দেয়া উচিত এবং এই পরিকল্পনা ইতিহাস বদলে দিতে পারে।
নেতানিয়াহু বলেন, ট্রাম্প প্রচলিত চিন্তাধারা ভেঙে নতুন ধারণা দিচ্ছেন। তিনি প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে চিন্তা করছেন।
এদিকে, গাজার জনগণের জোরপূর্বক বিতাড়ন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর পক্ষ থেকেও তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হতে পারে। কিছু মানবাধিকার সংস্থা এটিকে জাতিগত নির্মূলের সঙ্গে তুলনা করছে।
হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সামি আবু জুহরি ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাকে নিজ ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ বলে নিন্দা জানান এবং বলেন, আমরা এটিকে অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনা তৈরির নীলনকশা হিসেবে বিবেচনা করছি, কারণ গাজার জনগণ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে দেবে না।










