হোয়াটসঅ্যাপে একটি ছবি ডাউনলোড করলেই ফোন হ্যাক হয়ে যায় ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ চুরি হয়—এমন একটি নতুন প্রতারণার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইনে। ভারতে এমন কিছু ঘটনার কথাও শোনা গেছে, যা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে হোয়াটসঅ্যাপ সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি মেসেজিং অ্যাপ এবং প্রায় সব স্মার্টফোন ব্যবহারকারী এটি ব্যবহার করে। তবে প্রযুক্তিবিষয়ক প্লাটফর্ম ‘গ্যাজেটস টু ইউজ’ একটি বিস্তারিত তদন্ত চালিয়ে নিশ্চিত করেছে যে এসব দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। হোয়াটসঅ্যাপে শুধু একটি ছবি ডাউনলোড করার মাধ্যমে ফোন হ্যাক হওয়া সম্ভব নয়।
হোয়াটসঅ্যাপ ইমেজ স্ক্যাম: কী ঘটেছিল?
একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াটসঅ্যাপ ইমেজ স্ক্যামের প্রথম অভিযোগ আসে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ভারতের মধ্যপ্রদেশের জবলপুর থেকে। এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি হোয়াটসঅ্যাপে অপরিচিত নম্বর থেকে একটি ছবি পান, যেখানে ছবিতে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সাহায্যের কথা বলা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ছবি ডাউনলোড করার পর ওই ব্যক্তির ফোন হ্যাক হয় এবং তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২ লাখ রুপি উধাও হয়ে যায়। এরপর ঘটনাটি নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা ভারতজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এ হ্যাকিং ‘স্টেনোগ্রাফি’ নামক একটি পদ্ধতিতে ঘটানো হয়েছে। অর্থাৎ একটি ছবির মধ্যে লুকানো কোড থাকে এবং কেউ সেটি ডাউনলোড করলেই কোডটি সক্রিয় হয়ে যায়। অন্য প্রতিবেদনগুলোয় বলা হয়, এটি ‘জিরো-ডে ভালনারেবিলিটি’ ব্যবহার করে করা হয়েছে। এটি এক ধরনের উচ্চস্তরের সাইবার হামলা, যা আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি দিয়েও সহজে ধরা যায় না।
গ্যাজেটস টু ইউজ বলছে, মূল ঘটনার উৎস যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং অভিযোগকারীর নামও এখনো অজানা। ফলে ঘটনার সত্যতা নিয়েও বেশকিছু প্রশ্ন ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। যদিও ধরে নেয়া যায় যে এমন কিছু ঘটেছে, তবু এটি প্রযুক্তিগতভাবে কতটা সম্ভব, সেটি বিশ্লেষণ করেছেন বিশেষজ্ঞ চিন্ময় ধুমাল।
হোয়াটসঅ্যাপ ইমেজ দিয়ে কি ফোন হ্যাক করা যায়?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—না, প্রযুক্তিবিদদের মতে, হোয়াটসঅ্যাপের একটি ছবির মাধ্যমে কোনো স্মার্টফোন হ্যাক করা সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে দুটি বড় কারণ—
হোয়াটসঅ্যাপ ছবির ইএক্সআইএফ ডাটা সরিয়ে দেয়
ব্যবহারকারী যখন কাউকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ছবি পাঠায়, তখন লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ছবিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকুচিত হয়ে যায়। একই সঙ্গে ছবিতে থাকা ইএক্সআইএফ মেটাডাটা যেমন ছবি তোলার সময়, তারিখ, ক্যামেরার তথ্য ইত্যাদি অপসারিত হয়। ফলে কেউ যদি স্টেনোগ্রাফি ব্যবহার করে ছবির ভেতরে কোনো হ্যাকিং কোড ঢুকিয়ে দেয়, তাহলেও হোয়াটসঅ্যাপের কমপ্রেশন প্রক্রিয়ায় সেটি মুছে যাবে। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ আধুনিক স্ক্যানিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। ফলে ক্ষতিকর ফাইল পাঠানো প্রতিরোধ করা যায়।
অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস অনেকটাই স্টেনোগ্রাফি থেকে সুরক্ষিত
চিন্ময় ধুমালের তথ্যানুযায়ী, অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম অত্যন্ত সুরক্ষিত ও এনক্রিপ্টেড। এসব অপারেটিং সিস্টেম যেকোনো ছবি নির্দিষ্ট গ্যালারি অ্যাপে খোলে। এমনকি কেউ যদি ক্ষতিকর কোডসহ ছবি, ডকুমেন্ট, ফাইল হিসেবেও পাঠায়, সেক্ষেত্রেও ফোন একে স্বাভাবিক ফাইল হিসেবে খুলবে। ফলে কোনো কোড কার্যকর হবে না।
জবলপুরের ঘটনায় হোয়াটসঅ্যাপ ইমেজ স্ক্যাম কীভাবে ঘটেছিল?
বিশেষজ্ঞ বলছেন, যদি ঘটনা সত্য হয়, তবে কোনো ফাইল ডাউনলোডের মাধ্যমে এমনটা হয়েছে, ছবি নয়। কারণ ফাইল ডাউনলোডে স্মার্টফোন হ্যাক হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। এটি একটি এপিকে (অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ইনস্টল করার ফাইল) অথবা ডকুমেন্ট ফাইল হতে হবে, যা বিশেষ ওয়েবসাইটে নিয়ে যাবে ও ডিভাইস হ্যাক করতে চেষ্টা করবে।










