দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতেই গণতান্ত্রিক চর্চা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ দলের নেতৃত্ব পরিবারকেন্দ্রিক। দলীয় প্রধান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও গোপন ভোটের চর্চা সীমিত। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

আজ রোববার রাজধানীর ধানমন্ডির এলাকায় ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষনা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। নানা রকমের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১২টি দলের প্রধান ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে নেতৃত্বে রয়েছেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান যথাক্রমে ৪১ ও ৪৫ বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। সিপিবি ছাড়া অন্য কোনো দলের গঠনতন্ত্রে একজন ব্যক্তি কত মেয়াদে দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন, তার নির্দিষ্ট বিধান নেই। গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ১০টি দলে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের চিত্র পাওয়া গেছে। ৩২টি রাজনৈতিক দলের ওপর পরিচালিত টিআইবির গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। মাত্র দুটি দল—সিপিবি ও এবি পার্টিতে—একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার তথ্য পাওয়া গেছে।

সংস্থাটি বলছে, দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তৃণমূলের অংশগ্রহণ সীমিত। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১৬টি দল নিয়মিত জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাউন্সিলে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও স্থানীয় কমিটির মতামতের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড ও দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্ত বেশি গুরুত্ব পায়।

পাশাপাশি নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো। কেন্দ্রীয় ও অন্যান্য কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার বিধান থাকলেও অধিকাংশ দল তা বাস্তবায়ন করেনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ১৩টি দলের কোনো নারী প্রার্থী ছিল না। ১২টি দলের মনোনীত নারী প্রার্থীর হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ।

টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিতে গবেষণায় ১২ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দলের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, বড় অঙ্কের লেনদেন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পরিচালনা, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন, নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ভোট চালু, নেতৃত্বের মেয়াদ নির্ধারণ এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

গবেষণায় দলগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। কোনো দলেরই স্বতন্ত্র আর্থিক নীতিমালা নেই। অধিকাংশ দল বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না এবং আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করে না। নিবন্ধনের ন্যূনতম শর্ত অনুযায়ী ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালনায় বছরে আনুমানিক ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় মাত্র ২৬ লাখ টাকা। ফলে দলগুলোকে আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হয়।

এ ছাড়া নেতাকর্মীদের জন্য স্বতন্ত্র আচরণবিধি ও জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা নেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে গবেষণায় বলা হয়েছে, গত ১৩ বছর আট মাসে ৪ হাজার ২৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৪৬ হাজার ৩৫১ জন আহত এবং ৭৪৬ জন নিহত হয়েছেন।