নতুন যুগে প্রবেশ করছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। গত দুই দশকে দেশের প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণী। ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল সেবা, ই-শিক্ষা, ই-স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ তথ্য ও প্রযুক্তি খাত সমৃদ্ধি হয়েছে। ইনোভেশন হাব, সফটওয়্যার পার্ক, ই-মার্কেটপ্লেস নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। প্রযুক্তির এ উন্নয়ন ও উদ্ভাবন ইঙ্গিত দেয় একটি স্মার্ট জাতির আবির্ভাবকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়েস প্রযুক্তি যা দৈনন্দিন জীবনকে আরো অর্থবহ করে তুলবে এবং সেবাকে পৌঁছে দেবে বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে।
প্রযুক্তির কাঠামোগত উন্নয়ন: প্রযুক্তি বিশ্বে স্মার্ট জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশে যাত্রা মাত্র শুরু, কিন্তু চ্যালেঞ্জিং এ পথচলায় দরকার সঠিক পরিকল্পনাপ্রসূত সমাধান। একটি স্মার্ট সমাজ গঠনে প্রথমে দরকার মানসিকতা, যা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তিতে উৎসাহিত করবে। প্রযুক্তিকে শুধু কাজে লাগালে চলবে না, দরকার সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা। সামগ্রিক বিবেচনায় উদ্ভাবনের বিষয়টিকে কেন্দ্রীভূত রেখে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সবার আগে এ চ্যালেঞ্জগুলো শনাক্ত করা গেলেই প্রযুক্তিকে সবার কল্যাণে কাজে লাগানো সম্ভব।
ফিচার ফোনের বাস্তবতা: সেলফোনের মোট ব্যবহারকারীর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ফিচার ফোন। ডিজিটাল অগ্রগতির যুগেও এটি একটি বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা। প্রযুক্তির ব্যবহারে নাজুক বয়স্ক জনগোষ্ঠী স্মার্টফোন ব্যবহারকে ঝামেলাপূর্ণ মনে করে।
ডিজিটাল সাক্ষরতা শুধু সংযোগ বা যোগাযোগ স্থাপনই না, প্রভাব সৃষ্টি করার মতো ডিজিটাল কনটেন্ট, প্লাটফর্ম নেভিগেশন, অর্থবহ ডিজিটাল এনগেজমেন্টের মতো বিষয়গুলোও এর আওতাভুক্ত। মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা ডিজিটাল সাক্ষরতাকে প্রভাবিত করে। সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠী সাধারণত এ সাক্ষরতা জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। বিদ্যমান বৈষম্যে ইতি ঘটিয়ে সমতা আনতে আমাদের এমন এক উদ্ভাবনী কৌশল প্রবর্তন করতে হবে, যা স্মার্টফোন ও ফিচার ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত করবে।
ডিজিটাল স্বাক্ষরতা অর্জনে ভয়েস (স্বর) প্রযুক্তি: স্মার্ট জাতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে ডিজিটাল রূপান্তর সর্বজনীন করার লক্ষ্যে যুগোপযোগী শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ভয়েস প্রযুক্তি ডিজিটাল সুবিধা ও বৃহত্তর পরিসরে জনমানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। ভয়েস প্রযুক্তি স্পিচ রিকগনিশন ও সিনথেসিসের মিশেলে গড়া যুগান্তকারী এক প্রযুক্তি, যার ভিত্তি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (এনএলপি)। আধুনিক বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যেখানে উন্নয়নের মাত্রা নির্দেশ করে, ভয়েস প্রযুক্তি আমাদের জন্য পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় অসীম সম্ভাবনা বয়ে আনতে পারে। ভয়েস প্রযুক্তি কোনো ডিভাইসকে কথোপকথন বুঝে প্রতিক্রিয়া জানানোর উপযোগী করে তোলে। ভাষা ও শিক্ষাগত সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এসে টেক্সট-বেইজড ইন্টারফেস ব্যবহারে অক্ষম মানুষের ক্ষমতায়নে ভূমিকাও রাখে। স্বল্প শিক্ষা, ভৌগোলিক অবস্থান বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ভয়েস প্রযুক্তি অপার সম্ভাবনা নিয়ে আসছে। কোনো ডিজিটাল শিক্ষণ ছাড়াই কৃষক, উদ্যোক্তা নারী ও পুরুষ, সবার জন্য ভয়েস প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে।
ভয়েস প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দানে আমরা তৈরি: বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ভয়েস প্রযুক্তির বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দৌড়ে নেতৃত্ব অর্জনে সবাই উঠে-পড়ে লেগেছে।
ইন্ডিয়া ভয়েসভিত্তিক অফলাইন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। যার উদ্দেশ্য, শহর ও গ্রামের মধ্যে বিরাজমান ডিজিটাল সেবার বৈষম্য কমিয়ে আনা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ডিজিটাল অবকাঠামোর ভিত্তি ইউনিভার্সাল পেমেন্ট ইন্টারফেস এ ২০২৩-এর জুলাইয়ে ৩৫ কোটি গ্রাহক ও হাজার কোটি লেনদেনের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। তবে সুবিধাবঞ্চিত গ্রামে অপর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধা ও কম সাক্ষরতার হারের কারণে এর ব্যবহার এখনো সীমিত। এর সংকট সমাধানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া কথোপকথনমূলক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। যার মাধ্যমে গ্রাহক মৌখিক নির্দেশনায় লেনদেন করতে পারবে। তাছাড়া সার্ভিসটি ব্যবহারকারীর তথ্য সংরক্ষণের নিরাপত্তা ও ভাষাগত ব্যবহার নতুন উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের মতো মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ও ভয়েস প্রযুক্তির উন্নয়নে গবেষণা চালাচ্ছে। গবেষণা, উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণে বিশাল বিনিয়োগের কারণে অ্যামাজনের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যালেক্সাকে বিশ্বে ভয়েস প্রযুক্তির সমার্থক হিসেবেই ধরা হয়। গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ভয়েস প্রযুক্তির অন্যতম দৃষ্টান্ত। সিরির সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিনিয়ত বিনিয়োগ করছে অ্যাপল। মাইক্রোসফটের কর্টানা ও আইবিএমের ওয়াটসন উন্নত এআই ও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে ভয়েস-সক্রিয় সেবা দিয়ে থাকে। ওপেনএআই ভয়েস প্রযুক্তির ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজকে বোধগম্য করায় ও এর সক্ষমতা সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রেখেছে।
আমরাও সমান তালে এগিয়ে চলেছি। ভয়েস প্রযুক্তিতে বিশেষায়িত বাংলাদেশী টেক-বিস্ময় হিসাব প্রযুক্তি বিশ্বে নিজের অবস্থান মজবুত করে চলেছে। হিসাব, ভয়েস টেকনোলজি ও কনভারসেশনাল এআই প্রযুক্তিতে বিশেষায়িত একটি দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। এটি বাংলাভিত্তিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল দ্বারা পরিচালিত, যা এটিকে বাংলায় পরিচালিত দেশের প্রথম ইঞ্জিনের স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। বিশ্বের ২৭টি রাষ্ট্রে হিসাবের প্যাটেন্ট ৫৪টি, যা একে বিশ্বব্যাপী ভয়েস প্রযুক্তিতে নেতৃত্বদানকারী অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যখন ভয়েস প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে ব্যস্ত, বাংলাদেশ সেখানে নেতৃত্বের আসনে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফিচার ফোনের বিস্তৃত অ্যাকসেস, বাংলা ভাষা উপযোগী প্রযুক্তি ও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অ্যাকসেসের মতো জাতীয় লক্ষ্য-সাফল্য পাওয়ার মতো বিষয়গুলোই আমাদের নাগালের মধ্যে।
প্রযুক্তি ও মানবতার যোগসূত্র ভয়েস প্রযুক্তি, যা আমাদের এক নতুন যুগে ধাবিত করছে। যুগান্তকারী এ প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন বাংলাদেশকে অসীম সম্ভাবনার ডিজিটাল যুগে নেতৃত্ব এনে দেবে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে সূচিত হবে অপ্রতিরোধ্য যোগাযোগ, সমৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী জ্ঞানের এক নতুন অধ্যায়। দৃষ্টি এখন এ প্রযুক্তিতে শুধু এগিয়ে থাকাই নয়—নেতৃত্ব দেয়ার।
এই অনুসন্ধানী লেখাটি সংকলন করেছেন এ.জেড.এম সাঈফ, প্রযুক্তি বিষয়ে উৎসুক সাঈফ, সমসাময়িক বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লিখেন। তিনি পেপার রাইম-এর সিইও।










