বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ্জাক। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন নায়করাজ। যিনি অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করেছিলেন। চোখ, মুখ ও গলায় তার অভিনয়ের জাদু আজও মানুষের মনে বেঁচে আছে। যদিও তিনি আর আমাদের মাঝে নেই; তার প্রতিভা, দীর্ঘ ক্যারিয়ার ও মানবিক মূল্যবোধ আজও জীবন্ত। রাজ্জাক কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন দর্শকের নায়ক। তার সংলাপ, গান ও চরিত্র আজও দর্শকের হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে চলেছে।

শৈশবের স্বপ্ন

কলকাতার এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া রাজ্জাকের শৈশবকাল কাটে খেলাধুলা, নাটক ও সিনেমার প্রতি অনন্য আগ্রহে। ছোটবেলাতেই তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল বড় স্বপ্ন, যা তাকে একদিন বাংলা সিনেমার মহারাজায় পরিণত করবে—এ কথা কল্পনায়ও ভাবা যেত না। বাউণ্ডুলে স্বভাবের হলেও তার মনটি ছিল খুবই বড়—পরিকল্পিত স্বপ্ন, অদম্য ইচ্ছা আর দৃঢ় মনোবল তাকে পৌঁছে দিয়েছে অনন্য উচ্চতায়। স্কুলজীবন থেকেই তিনি অভিনয়ের প্রতি গভীরভাবে মগ্ন থাকতেন এবং ছোটখাটো নাটক, আবৃত্তি ও স্থানীয় সিনেমা অনুষ্ঠানগুলোতেও অংশ নিতেন।

সংগ্রাম ও কঠিন বাস্তবতার শিকার

রাজ্জাক মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কয়েক বছর পর পরিবারে আসে সন্তান। ঠিক সেই সময়ে ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক অশান্তির ছায়া কলকাতার আকাশে নেমে আসে। স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঢাকায় উদ্বাস্তু জীবন শুরু করেন। কমলাপুরের ছোট্ট, সংকীর্ণ ঘর থেকে প্রতিটি দিনই ছিল সংগ্রামের দিন। প্রতিদিনের খরচের চিন্তা, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়া, নতুন ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া—সবই তার জন্য ছিল কঠিন। তবে রাজ্জাকের মনোবল ছিল অটুট; তিনি জানতেন, নায়ক হতে হলে থেমে থাকলে চলবে না। তাই এগিয়ে গিয়েছেন সব বাধাকে উপেক্ষা করে।

4

স্বপ্নের পথে এগিয়ে

ঢাকায় এসে রাজ্জাক কাজের সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন। তার স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে চিত্র পরিচালক আব্দুল জব্বার খানের সহায়তায় ‘ইকবাল ফিল্ম’-এ সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এরপর কামাল আহমেদের ‘উজালা’ ও ‘পরওয়ানা’ সিনেমায় সহকারী হিসেবে কাজ করতে করতে তার স্বপ্নের পথ ক্রমে উন্মুক্ত হয়। প্রতিটি ধাপ তাকে আরো কাছে নিয়ে যায় চলচ্চিত্রের শিখরের দিকে। এ সময়ে তিনি শিখলেন সিনেমার জটিল দিকগুলো, পরিচালনার নানা কলাকৌশল এবং চরিত্রের গভীরতা অনুধাবন করতে।

রাতারাতি সুপারস্টার

১৯৬৬ সালে মুক্তি পায় রাজ্জাক অভিনীত জহির রায়হানের ‘বেহুলা’। লখিন্দরের চরিত্রে অভিনয় করে রাজ্জাক রাতারাতি সুপারস্টার হয়ে ওঠেন।

দর্শকরা তাকে নতুন আলোয় গ্রহণ করে। প্রথম সাইনিং মানি মাত্র ৫০০ টাকা হলেও তার প্রতিভা আকাশচুম্বী ছিল। এরপর ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘স্মরলিপি’, ‘মনের মত বউ’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘অবুঝ বউ’ সিনেমাগুলোয় তিনি দর্শকের হৃদয় জয় করেন। সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যে তার অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা ও সংলাপের ধারাবাহিকতা দর্শককে মুগ্ধ করত।

সমৃদ্ধ চলচ্চিত্রজীবন

সত্তর ও আশির দশকে শাবানা, ববিতা ও কবরীর সঙ্গে তার রসায়ন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ২০১৩ সালে আজীবন সম্মাননা এবং মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা—সবই তার অবদানের স্বীকৃতি। উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘অবাক পৃথিবী’, ‘অলংকার’, ‘অবকাশ’, ‘অবুঝ মন’, ‘আলোর মিছিল’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘আশার আলো’, ‘অশিক্ষিত’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘চোখের জলে’। প্রায় ৬০০ সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি, যা তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অমর নায়কের মর্যাদা দিয়েছে।

নায়ক থেকে প্রযোজক

রাজ্জাক শুধু অভিনয়েই নয়, প্রযোজক হিসেবেও নিজের ছাপ রেখেছেন। নায়ক হিসেবে তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল শফিকুর রহমান পরিচালিত ‘মালামতি’। চলচ্চিত্রজগতে তার পদচারণ সবসময়ই সমৃদ্ধি ও প্রেরণার উৎস। তিনি প্রযোজক হিসেবেও নতুন অভিনেতা ও শিল্পীদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

চিরন্তন স্মৃতি

২০১৭ সালের ২১ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজ্জাক চলে যান অনন্তের পথে। তবে বাংলা চলচ্চিত্রে তার অবদান, অভিনয় ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আজও জীবন্ত। ‘আমি এক দুরন্ত যাযাবর’, ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’, ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’, ‘নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তা চলেছি একা’—এ গান ও সংলাপগুলো আজও দর্শকের মনে বেঁচে আছে। তার অভিনয় আজও তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।