পৃথিবীতে মাত্র নয়জন পরিচালক আছেন যারা তাদের জীবদ্দশায় দুবার পাম ডি’অর পেয়েছেন। কেন লোচ তাদের মধ্যে একজন। লোচ শুধু একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চলচ্চিত্র নির্মাতাই নন, তিনি নিজেই এক আদর্শ, যে কিনা মাঝসমুদ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদম্য শিলাখণ্ড। যাকে কোনো ঝড় বা জোয়ারের আঘাত টলাতে পারে না।
কেন লোচের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৭ জুন নিউটন ওয়ার্কশায়ারে। তার বাবা ছিলেন একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। তাই হয়তো তার সিনেমায় ব্রিটেনের নিম্নবিত্ত শ্রেণীর লোকদের নির্মম বাস্তবতা বারবারই ফিরে আসে। কেন লোচ ‘কিং এডওয়ার্ড গ্র্যামার স্কুল’ শেষ করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সেন্ট পিটারসন কলেজ থেকে আইনে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা চলাকালীন তিনি কলেজের থিয়েটার গ্রুপে যোগ দেন। তার অভিনয় ও নির্দেশনার হাতেখড়ি সেখানেই। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬০-এর দশকে তিনি একজন ট্রেইনি পরিচালক হিসেবে বিবিসিতে যোগ দেন। বিবিসির ‘ওয়েনেসডে প্লে’তে কাজ করে তিনি পরিচালক হিসেবে পরিচিতি পান। সেই থেকেই সিনেমায় সাফল্যের যাত্রা।
লোচ পরিচালিত টিভি নাটক ‘ক্যাথি কামস হোম’ (১৯৬৬) সেই সময় ব্রিটেনে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ১৯৬৯ সালে আসে ‘কেস’। এটি একটি কোমল হৃদয়বিদারক কাহিনী, যেখানে একজন অবহেলিত কিশোর একটি পাখির মধ্যে জীবনের সৌন্দর্য ও স্বাধীনতার স্বাদ খুঁজে পায়, কিন্তু সমাজের নির্মমতা তাও শেষ করে দেয়। তার প্রথম চলচ্চিত্র ব্যারি হাইন্সের উপন্যাস ‘আ কেস্ত্রেল ফর আ নেভ’ থেকে নির্মিত। সিনেমাটি আজ ব্রিটিশ ক্ল্যাসিক হিসেবে পরিচিত।
‘কেস’ সিনেমাটি তাকে পরিচালক হিসেবে খ্যাতি এনে দিলেও এ সময় তার নির্মিত কিছু টিভি নাটক যেমন ‘দ্য বিগ ফ্লেম’ (১৯৬৯), ‘দ্য র্যাংক অ্যান্ড ফাইল’ (১৯৭১) ও ‘দ্য ফ্যামিলি লাইফ (১৯৭১) তার দৃঢ় সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রকাশ করে। এ কারণে সে সময়কার টিভি ও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কর্তাব্যক্তিরা অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেন। ফলে ইন্ডাস্ট্রি থেকে তাকে বয়কট করা হয়। এমনকি তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ (১৯৭১) ৩০ বছর আটকে রাখা হয়।

এ সময় কেন লোচ তার রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে সিনেমাকেই বেছে নিয়েছিলেন। দীর্ঘ ১৫ বছর পর তার দ্বিতীয় সিনেমা ‘ফাদারল্যান্ড’। সিনেমাটি একজন পূর্ব জার্মানির প্রতিবাদী সংগীতশিল্পীর যাত্রা ও ব্যক্তিগত অনুসন্ধান, যা তাকে বুঝতে সাহায্য করে, কোনো বিরোধী ব্যবস্থাই মানুষের স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতা ব্যতীত কোনো শোষণ থেকে মুক্ত করে না।
‘হিডেন এজেন্ডা’ (১৯৯০) সিনেমাটি তৎকালীন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের কাছে বিরাগভাজন হলেও আন্তর্জাতিকভাবে সিনেমাটি প্রশংসা অর্জন করে। এরপর প্রযোজক বেকা ও’ব্রায়েন ও চিত্রনাট্যকার পল লিভারটির সঙ্গে জুটি বেঁধে একে একে তৈরি করেন ‘রিফ রিফ’ (১৯৯১) ও ‘রেইনিং স্টোন’ (১৯৯২।
‘আই, ড্যানিয়েল ব্লেক’ (২০১৬) কেন লোচের একটি শক্তিশালী সোশ্যাল ড্রামা। এটি সাধারণ মানুষের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত। এটি লোচকে দ্বিতীয়বার পাম ডি’অর এনে দেয়। লোচের প্রথম পাম ডি’অর পাওয়া সিনেমা ‘দ্য উইন্দ দ্যাট শেকস দ্য বার্লি’ (২০০৬)। ১৯২০-এর দশকে আয়ারল্যান্ডে তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে চলছে স্বাধীনতার লড়াই নিয়ে সিনেমার গল্প। এ ধারায় সিনেমাটি অবিস্মরণীয়। গল্প, সিনেমাটোগ্রাফি, অভিনয় মিলিয়ে এ সিনেমা দর্শক মনে রাখবে বহুদিন। এতে উঠে এসেছে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিবাদ ও বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা।

কেন লোচের সিনেমা শুধু ব্রিটেনের শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের মধ্যেই আটকে থাকেনি, বরং দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কখনো স্পেনের ১৯৩৬ গৃহযুদ্ধের মধ্যে আদর্শিক লড়াইকে তুলে ধরে ‘ল্যান্ড অ্যান্ড ফ্রিডম’ (১৯৯৫)। নিকারাগুয়ার গৃহযুদ্ধে মার্কিনদের হস্তক্ষেপ ও গণতন্ত্রের নামে সহিংসতা এবং উন্নয়নশীল দেশে হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছেন ‘কারলা’স সঙ’ (১৯৯৬) ও ‘ব্রেড অ্যান্ড রোজেস’ (২০০০) সিনেমায়। শেষোক্ত সিনেমাটিতে ব্রেভার্লি হিলসের চাকচিক্য জীবনের অন্তরালে শ্রমিকদের জীবনের না জানা গল্প বলা হয়েছে। সিনেমার নামটি নেয়া হয়েছে ১৯১২ সালের আমেরিকান শ্রম আন্দোলনের স্লোগান থেকে, সেখানে স্লোগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট ব্রেড, বাট উই ওয়ান্ট রোজেস টু’।
২০০৯ সালে কেন লোচ তার ‘লুকিং ফর এরিক’ মেলবোর্ন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এ সিদ্ধান্তের পেছনে তার ও তার সহকর্মীদের (চিত্রনাট্যকার পল ল্যাভার্টি ও প্রযোজিকা রেবেকা ও’ব্রায়েন) মূল আপত্তি ছিল ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষের ইসরায়েলের সহায়তাকারী অর্থায়ন গ্রহণ করা। তারা দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলের ‘অবৈধ দখল, গৃহ নিষ্পত্তি ও গাজায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড’ প্রতিরোধে, সাংস্কৃতিক বয়কট একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। সিনেমা নির্মাণের নৈপুণ্যের পাশাপাশি সামাজিক রাজনৈতিক এ দায়বদ্ধতা তাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।










