রাজ কাপুর। বলিউডের অন্যতম ‘গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’। দীর্ঘ সময় তিনি বলিউডকে দিয়েছেন সেরা সব সিনেমা। চল্লিশের দশকে সিনেমায় এসে আশির দশক পর্যন্ত তিনি বলিউডকে দিয়েছেন সত্তরের বেশি সিনেমা। অভিনয় ছাড়াও পরিচালনা করেছেন ১০টির মতো সিনেমা। অভিনেতা ও পরিচালক উভয় ক্যারিয়ারে উত্থান পতন ছিল তার। কিন্তু বলিউডে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজের আসন। বলিউডকে তিনি সেট নির্মাণ শেখানো থেকে শুরু করে সিনেমার ধারাও তৈরি করে দিয়েছিলেন। তাই জন্মের শতবর্ষে এসেও বলিউড তাকে মনে রাখে।
রাজ কাপুরের জন্ম ১৯২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর, বর্তমান খাইবার পাখতুনখাওয়ার পেশোয়ারে। বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুর তার ছেলের নাম রেখেছিলেন সৃষ্টি নাথ কাপুর। পরবর্তী সময়ে সিনেমা ও অন্যান্য সূত্রে রণবীর রাজ কাপুর নামেও পরিচিত হন তিনি। কাপুররা পাঞ্জাবি ক্ষত্রী। ভারত ভাগের বেশ আগেই তারা পেশোয়ার থেকে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) চলে আসেন। হয়তো নিয়তিই টেনে এনেছিল, কেননা কাপুর হবেন ভারতের অন্যতম সেরা ‘শো-ম্যান’।

১৯৩৫ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে রাজ কাপুর সর্বপ্রথম অভিনয় করেন। এরপর আরো ছোটখাটো কিছু চরিত্র করেছিলেন তিনি। তবে ক্যারিয়ারের মোড় আসে ১৯৪৭ সালে। সে বছর তিনি কেদার শর্মার ‘নীল কমল’ সিনেমায় অভিনয় করেন। তার বিপরীতে ছিলেন বেগম পারা ও মধুবালা। একই সময় রাজ অভিনয় করেছিলেন জেল যাত্রা, দিল কি রানি ও চিতোর বিজয় নামের সিনেমায়। কোনোটিই ভালো করেনি।
থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পৃথ্বীরাজ কাপুরও। রাজ কাপুর অভিনয়টা পেয়েছিলেন বাবার কাছ থেকে। ফলে দ্রুতই বোম্বের বাস্তবতা ও দর্শকের মন বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। তাই ১৯৪৮ সালে শুরু করেন আরকে স্টুডিও। নিজেই সিনেমা প্রযোজনা শুরু করেন। সেখান থেকেই নিজের প্রযোজনা, পরিচালনা ও অভিনয়ে প্রথম সিনেমা ‘আগ’। বিপরীতে নার্গিস, প্রেমনাথ ও কামিনী কৌশল। সিনেমা হিট না হলেও সমালোচকরা প্রশংসা করেছিলেন। কাছাকাছি সময়ের আরেক সিনেমা ‘সুনেহরে দিন’ ফ্লপ করে। এরপর এনআর আচার্য পরিচালিত ‘পরিবর্তন’ কিছুটা ব্যবসাসফল। রাজ কাপুরকে ভাগ্য আর বলিউড যেন একটু পরখ করে দেখছিল এ সময়।

সাফল্য প্রথম এলো মেহবুব খানের হাত ধরে। ১৯৪৯ সালেই মুক্তি পায় ‘আন্দাজ’। রাজ কাপুরের সঙ্গে এ সিনেমায় ছিলেন দিলীপ কুমার ও নার্গিস। সিনেমা ব্লকবাস্টার। একই বছর মুক্তি পায় ‘বারসাত’। একই সঙ্গে পরিচালক ও অভিনেতা রাজ কাপুরের বিপরীতে নার্গিস। আন্দাজকেও বক্স অফিসে ছাড়িয়ে যায় সিনেমাটি। সে সময় তারকা ছিলেন অশোক কুমার। মূলত বারসাতের মধ্য দিয়ে অশোক কুমারকে টেক্কা দেন রাজ কাপুর। অশোক কুমারের ব্লকবাস্টার ‘কিসমত’কে ছাড়িয়ে যায় বারসাত। রাজ কাপুরের রাজত্ব শুরু হয়ে যায় এ সময় থেকেই।
১৯৫১ সালে রাজ কাপুরের একটাই সিনেমা মুক্তি পায়—‘আওয়ারা’। এ সিনেমায়ও তার বিপরীতে ছিলেন নার্গিস। সিনেমাটি সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়ার পাশাপাশি দর্শকেরও মনে স্থায়ী আসন নেয়। সেই সঙ্গে শঙ্কর জয়কিষণের সংগীতে এ সিনেমার গানগুলো ভারতের মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে শুরু করে। এর মধ্য দিয়ে রাজ কাপুর ভারত ছাড়িয়ে যান। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, তুরস্ক ও আফগানিস্তানেও তার সিনেমা প্রদর্শিত হতে থাকে। বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নে তার সিনেমা দারুণ জনপ্রিয় হয়। একটা সময় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক।
নার্গিসের সঙ্গে রাজ কাপুরের জুটি দর্শক সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছিল। ১৯৫৫ সালের ‘শ্রী ৪২০’ আজও জনপ্রিয়। ‘পেয়ার হুয়া ইকরার হুয়া’, ‘ইচাক দানা’ গানগুলো মুখে মুখে ফেরে। পরের বছর তাদের একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল ‘চোরি চোরি’তে। এছাড়া অমিত মৈত্র্য ও শম্ভূ মিত্র পরিচালিত ‘জাগতে রহো’তেও ক্যামিও করেছিলেন নার্গিস।
রাজ কাপুরের ‘আনারি’, ‘দো উস্তাদ’, ‘ছালিয়া’ও দর্শক গ্রহণ করেছিলেন। তার সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমা সম্ভবত ‘সঙ্গম’। এটি তার প্রথম রঙিন সিনেমা। পরিচালনায় রাজ কাপুরের সঙ্গে ছিলেন বৈজয়ন্তীমালা ও রাজেন্দ্র কুমার। এটা ছিল বলিউডের স্বর্ণযুগ। এর পরই যেন রাজ কাপুরের যুগের অবসান। ষাটের পর নতুন অভিনেতাদের আগমন ও নতুন ধারার সিনেমার ভিড়ে রাজ একটু পিছিয়েই পড়েন।
রাজ কাপুর যে ধারার সিনেমা নির্মাণ করছিলেন, তা দর্শক ওই সময় পছন্দ করেনি। যেমন ‘মেরা নাম জোকার’। সিনেমাটি বক্স অফিসে ব্যর্থ। কিন্তু আজ রাজ কাপুরের এ সিনেমাকে অসাধারণ বলা হয়। তিনি কিছু ক্ষেত্রে সময় থেকে এগিয়ে ছিলেন। তাই আজও তাকে নিয়ে আলোচনা হয়।










