ফেলুদা নিয়ে এখন পর্যন্ত এক্সমেরিমেন্ট হলো অনেক। এর মধ্যে মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ আয়োজনটি ছিল সৃজিত মুখার্জির। ফেলুদার গল্প থেকে তিনি নির্মাণ করেছেন ওয়েব সিরিজ ‘ভূস্বর্গ ভয়ংকর’। ফেলুদার চরিত্রে টোটা রায়চৌধুরী। এছাড়া তোপসে চরিত্রে কল্পন মিত্র ও জটায়ুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়। ভিজুয়াল জার্নি হিসেবে বেশ চমৎকার একটা কাজ উপহার দিয়েছেন সৃজিত। সেই সঙ্গে ছিল ফেলুদা চরিত্র, ফেলুদার অভিনেতা ও সিনেমাগুলোকে ট্রিবিউটও দিয়েছেন নির্মাতা।
ভূস্বর্গ ভয়ংকর ফেলুদা সিরিজের ছোট গল্পগুলোর মধ্যে একটি। কাশ্মীরের পটভূমিতে গল্পটি লিখেছিলেন সত্যজিৎ রায়। তবে কাশ্মীর সেখানে কোনো রাজনৈতিক গুরুত্ব রাখেনি। সত্যজিৎ রায় তার মতো করে কেবল প্লটটাই নিয়েছিলেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত জজের মানসিক দ্বন্দ্ব, তার ছেলের জুয়ায় আসক্তি ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ে গল্পটি। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে কাশ্মীরের রাজনৈতিক প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন সৃজিত। শুরুতেই তিনি সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটা ব্রিফ দেন সেনা ক্যাম্পে সৈন্যদের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। টিপিক্যাল বলিউড সিনেমার ধারার এ সংলাপ ও সিকোয়েন্সটি প্রথমেই ফেলুদা ভক্তদের ধাক্কা দেবে। তারপর অবশ্য ফেলুদার পরিচিত প্লটে ঢুকেছেন সৃজিত।
মেচেদায় জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে রাইটারস ব্লক কাটানোর টোটকা খোঁজেন লালমোহন বাবু। তাকে বলা হয়, হাওয়া বদল করতে হবে। যেকোনো জায়গায় যেতে পারেন তিনি, তবে জায়গার নাম শুরু হতে হবে ‘ক’ দিয়ে। এর পরই কাশ্মীর যাত্রা। যদিও ফেলুদার বক্তব্য, এটা জানার জন্য মেচেদায় যাওয়ার দরকার ছিল না।
দেখার জন্য সিরিজটা ভালো। ঝকঝকা চকচকা অর্থাৎ ভিজুয়ালি দর্শককে টানবে। কাশ্মীরের নানা লোকেশনে শুট হওয়া সিরিজের এমন অভিজ্ঞতা দর্শকের পাওয়াই স্বাভাবিক। এছাড়া সৃজিত খরচ করে সময় নিয়ে বানালে তার কাজ ‘দেখতে ভালো’ হয়। ফেলুদার এবারের সিরিজটিতে তেমন সব বৈশিষ্ট্যই আছে।
কিন্তু সে দেখার বাইরে আরো কিছু বিষয় চোখে লাগে। যেমন শুরুতেই সে পুরনো ‘জনাব জনাব’ ডাক। পাকিস্তান সবসময় ভারতের সঙ্গে লাগার জন্য বসে আছে। ফেলুদাকে সরাসরি ভারত-পাকিস্তান সমস্যার মধ্যে নিয়ে ফেলেননি সৃজিত, কিন্তু ফেলুদায় ওই বিষয় রাখারও প্রয়োজন ছিল না। সত্যজিতের মূল গল্প অনুসরণ করেই সিরিজটা নির্মাণ করা যেত। তাতে কোনো সমস্যা হতো না।
এছাড়া কিছু জায়গায় চরিত্রগুলোর অভিনয়, সংলাপ বেশি লাউড। মাঝে মাঝে অতি নাটকীয়। হইচইয়ের আর পাঁচটা সিরিজের মতো নাটকীয়তার আবহ রাখা হয়েছে। এটা নির্দেশকের ইচ্ছা না প্লাটফর্মের, সে প্রশ্ন থেকে যায়। এখানেই ফেলুদার চিরচেনা রূপ থেকে সরে গেছে ভূস্বর্গ ভয়ংকর।
অভিনয়ের দিকে তাকানো যাক। ফেলুদা চরিত্রে টোটা রায়চৌধুরী ভালো করেছেন। বিশেষত ইন্দ্রনীল, আবীরের চেয়ে। সত্যজিতের স্কেচে ফেলুদার চেহারা ও শারীরিক গড়নের সঙ্গে একেবারেই মিলে গেছেন তিনি। কিন্তু কিছু জায়গায় (সংলাপ ও হাঁটাচলা) তার আড়ষ্ট ভাবটা চোখে লাগে। বিশেষত যারা ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘বাক্স রহস্য’ ইত্যাদি বারবার দেখেছেন, তাদের চোখে লাগবে। তবে তোপসে হিসেবে কল্পন মিত্র ভালো। অন্তত ঋদ্ধি সেনের চেয়ে ফেলুদার স্যাটেলাইট হিসেবে তিনি সত্যজিতের তোপসে হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারেন। জটায়ু চরিত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্যর কাস্টিংটা এমন যে এর চেয়ে ভালো কিছু আপাতত পশ্চিমবঙ্গের ইন্ডাস্ট্রি থেকে আসা সম্ভব নয়।
সিরিজের ভালো কিছু দিকের মধ্যে একটা হলো সত্যজিৎ রায়ের গল্প থেকে কিছু সংলাপ হুবহু নেয়া। ওপর থেকে নেয়া কাশ্মীরের কিছু শট চোখে ধরে থাকে। থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের (ফেলুদা, তোপসে আর জটায়ু) একটা ফ্রেম দারুণ। সবার কস্টিউম ভালো। যেহেতু এটা সৃজিতের হাতে ফেলুদার সম্ভাব্য শেষ সিরিজ, একটা ট্রিবিউট ছিল। ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘টিনটরেটোর যীশু’, ‘গোরস্তানে সাবধান’, ‘হত্যাপুরী’র কয়েকটা ফ্রেম রিক্রিয়েট করেছেন।
কিছুদিন আগে টোটা জানিয়েছেন তার মন খারাপ। কেননা তিনি সম্ভবত ফেলুদা হতে পারছেন না আর। বাজেটের কারণে সৃজিত আর ফেলুদা সিরিজ নির্মাণ করতে চান না। সিনেমা নির্মাণের অধিকার সন্দীপ রায়ের। তিনি ফেলুদা চরিত্রে কাস্ট করে রেখেছেন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্তকে। তবে আসলে টোটা রায়চৌধুরীর মন খারাপ করা উচিত নয়। টিনটরেটোর যীশু (রাজশেখর নিয়োগী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন) থেকে ভূস্বর্গ ভয়ংকর পর্যন্ত ফেলুদার যাত্রা আর ক্যারিয়ারের মোড় একটা দারুণ বিষয়। তিনজন সেরা ফেলুদা অভিনেতার মধ্যে তিনি একজন হয়ে থাকবেন।










