চলচ্চিত্র শুধু যে নিছক বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা বা সুখ-দুঃখ-বেদনাকে তুলে ধরার একটা মাধ্যম হতে পারে—অল্প কয়েকজন নির্মাতা তা ভেবেছিলেন। ক্যামেরাকে তারা ব্যবহার করেছেন নিপীড়িত মানুষের মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে। ফলে তাদের চলচ্চিত্রে গল্পের পাশাপাশি এসেছে রাজনীতি, আদর্শ ও তত্ত্ব। সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলাই তাদের উদ্দেশ্য। মৃণাল সেনও এ ধারার একজন পথিক। শ্রেণী-সংগ্রাম তার চলচ্চিত্রের একটি প্রধান বিষয়। ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৯১) চলচ্চিত্রে পরিচালক দেখিয়েছেন, একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ কীভাবে একটি পরিবারকে প্রভাবিত করে এবং আদর্শের ধ্বংস সে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটায়।
দুই জার্মানি (পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি) একত্রীকরণের চারদিন আগে কলকাতায় একটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এটি কি নিছক একটি পারিবারিক দুর্ঘটনা, না এর সঙ্গে বিশ্বরাজনীতির কোনো যোগ আছে? সমাজতন্ত্রের পতন শুধু ইউরোপের কয়েকটা দেশেই ফাটল ধরায়নি, এর ঢেউ আছড়ে পড়েছিল কলকাতার মধ্যবিত্ত একটি পরিবারেও।

সিনেমার শুরুতেই কিছু প্রশ্ন পর্দায় দেখানো হয়। ‘সাম্যবাদের দুর্গ চুরমার?’ ‘পূর্বপুরুষের বিশ্বাসঘাতকতা?’ ‘পূর্ব ইউরোপ তোলপাড়।’ ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে লেনিন রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সূচনা করেন। তবে এ আদর্শ শুধু রাশিয়ায়ই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সমাজতন্ত্র গ্রহণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যে একটা শীতল যুদ্ধ আরম্ভ হয়। এর ছোঁয়া লাগে ভারতেও। সত্তরের দশকে কার্ল মার্ক্স, ভ্লাদিমির লেনিন, মাও সে তুং প্রমুখের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম করার জন্য কলকাতার একদল তরুণ-যুবক উঠেপড়ে লাগে এবং এর বিনিময়ে প্রাণও দেয়। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে নয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বদৌলতে সমাজতন্ত্রের ধারণা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যেতে থাকে আর পুঁজিবাদ নতুন রূপে বিকশিত হতে থাকে। তাহলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য যারা এতদিন সংগ্রাম করছিল, তাদের সে ত্যাগ কি বৃথা?
সংক্ষেপে সিনেমার গল্পটা যদি দেখি, নকশাল আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে পরিবারের মেজো ছেলে বুলু পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। আরেক ছেলে সমু (ভিক্টর ব্যানার্জি) পশ্চিম জার্মানিতে চলে যায় বেকারত্ব ঘোচানোর জন্য। ছোট ছেলে অনি (অঞ্জন দত্ত) বেকার এবং পরিবার, সমাজ ও নিজেকে নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগে। তাদের বাবা (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) কর্মজীবন শেষ করে অবসরে আছেন। ফলে সংসারের সব ভার এসে পড়ে বড় ছেলের বিধবা স্ত্রী সুতপার (অপর্ণা সেন) ওপর। এ পরিবারের মা (গীতা সেন) আত্মহত্যা করেন, কারণ তার সন্তান যে আদর্শ ধারণ করে প্রাণ দিয়েছিল, সে আদর্শ পৃথিবী থেকে অন্তর্হিত হতে যাচ্ছে। তাই তো স্বগতোক্তির মতো করে তিনি একটা প্রশ্ন করে যান, ‘তোরা সব মিথ্যে হয়ে গেলি? সব মিথ্যে?’
মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসেও দেখা যায়, সুজাতার ছেলে ব্রতী সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য পুলিশের অত্যাচারে মৃত্যুবরণ করে। বামপন্থীরা এক সময় সরকার গঠন করে। কিন্তু ব্রতীর স্বপ্নের কোনো প্রতিফলন সরকারের কাজে দেখতে না পেয়ে সুজাতা প্রবল দুঃখবোধে আক্রান্ত হন।
ক্যামেরার কিছু অসাধারণ কাজ রয়েছে এ সিনেমায়। সিনেমার শুরুর দিকে দেখা যায়, জার্মানি থেকে ফিরে সমু যখন ট্যাক্সি থেকে নামে তার হাতে ধরা বিখ্যাত ‘টাইম’ ম্যাগাজিন। প্রচ্ছদে মিখাইল গর্বাচেভের ছবি। শিরোনামের লেখার মধ্যে সমাজতন্ত্র ভেঙে যাওয়ার একটা ইঙ্গিত। আবার বুলুকে বাঁচানোর জন্য বাবা-মা তাকে যখন পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দেন, তার একটু পরই গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে ফ্রেম এবং শোনা যায় একটা হাহাকার ধ্বনি। এছাড়া ছবির মাঝে মন্তাজে সত্তরের দশকের আন্দোলন, বার্লিন প্রাচীর ইত্যাদি বিষয়ও দেখানো হয়েছে।
মহাপৃথিবীতে মা যে প্রশ্ন তুলেছিলেন ‘তোরা সব মিথ্যে হয়ে গেলি? সব মিথ্যে?’, সিনেমায় মৃণাল সেন দর্শকের উদ্দেশেও এ প্রশ্ন ছুড়ে দেন। কোনো একটা উদ্দেশ্য নিয়ে যখন কোনো বিপ্লব বা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, পরে যদি সে লক্ষ্য অর্জিত না হয়, তাহলে বিপ্লবীদের ত্যাগ কি বৃথা যায়? মহাপৃথিবীর মায়ের আত্মহত্যা শুধু একক কোনো ব্যক্তির আত্মহত্যা নয়, বরং একটা আদর্শের মৃত্যুও তার মধ্যে নিহিত ছিল। ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’ বলে একটা শব্দবন্ধ প্রচলিত আছে, তার একটা দৃষ্টান্ত এ চলচ্চিত্র। মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখায়, আবার মানুষই সে স্বপ্ন ভেঙে দেয়।










