১৯৮১ সালে মুক্তি পাওয়া মার্ক রাইডেলের ‘অন গোল্ডেন পন্ড’ ঠিক তেমনই এক অভিজ্ঞতা। এটি কেবল এক বৃদ্ধ দম্পতির গল্প নয়, বরং সময়, বার্ধক্য আর ক্ষয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলো নতুন করে ঝালিয়ে নেয়ার এক অসাধারণ আখ্যান। আমাদের যাপিত জীবনের অনেক গল্পই তো ডায়েরির পাতায় দিনলিপি হয়ে জমে থাকে। নরমান আর ইথেলের গল্পটাও তেমনই এক গোধূলিবেলার বিষণ্ন অথচ সুন্দর এক দলিল।
সিনেমার শুরুতেই আমরা দেখতে পাই সেই গোল্ডেন পন্ড বা লেক পাড়ের শান্ত জলে বুনো হাঁসদের (লুন) ফিরে আসা। ইথেল (ক্যাথরিন হেপবার্ন) পরম মমতায় সে ডাক শুনতে পেলেও নরমান (হেনরি ফন্ডা) তা কানেই তোলেন না।
গোল্ডেন পন্ড মূলত এক সোনালি স্মৃতির আধার, যেখানে তাদের জীবনের বহু বসন্ত কেটেছে। ৮০ বছর ছুঁইছুঁই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নরমানের স্মৃতি এখন আর আগের মতো সায় দেয় না। দেয়ালের পুরনো ছবিগুলো দেখে যখন তিনি চিনতে পারেন না, তখন বোঝা যায় এক অজানা বিস্মৃতি বা ডিমেনশিয়া কীভাবে তাকে ক্রমে গ্রাস করছে।

বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্র সমালোচক রজার ইবার্ট যেমনটা বলেছিলেন, পর্দায় খুব সাধারণ ভালোবাসা বা একটু লাজুক মুহূর্ত ফুটিয়ে তোলা সবচেয়ে কঠিন কাজ। নরমান খিটখিটে মেজাজের এক বৃদ্ধ, যিনি আসলে নিজের মৃত্যুভয় আর একাকিত্বকে আড়াল করতে চায় তীক্ষ্ণ রসবোধ আর তাচ্ছিল্য দিয়ে। ইবার্ট একে বলেছেন এক ধরনের ‘মুখোশ’, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর শূন্যতা। অন্যদিকে ইথেল যেন সেই শান্ত লেক, যে নরমানের সব অস্থিরতাকে নিজের ভেতরে শুষে নেয় পরম মমতায়।
গল্পে নতুন মাত্রা যোগ হয় যখন দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন মেয়ে চেলসি (জেন ফন্ডা) তার নতুন প্রেমিক বিল এবং তার ১৩ বছরের কিশোর সন্তান বিলিকে নিয়ে উপস্থিত হয়। নরমান আর চেলসির সম্পর্কটা যেন একটা জমাট বাঁধা বরফ। চেলসি লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকলেও মনে মনে আজও তার বাবার সেই বিচারকের মতো চাহনিকে ভয় পান। নরমান আজও তাকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি, হয়তো চেলসি তার প্রত্যাশিত সেই ছেলেসন্তান নয় বলে। বাস্তব জীবনের বাবা-মেয়ে হেনরি ও জেন ফন্ডার পর্দার রসায়ন এখানে অনন্য, যেখানে সিনেমার গল্পের সঙ্গে বাস্তবের টানাপড়েন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
অথচ কী অদ্ভুত! নরমান নিজের মেয়ের সঙ্গে দীর্ঘ জীবনে যা পারেননি, তা অনায়াসেই করে দেখালেন বিলি নামের এক কিশোরের সঙ্গে। লেকের সেই রহস্যময় বিশাল মাছ ওয়াল্টারকে ধরার নেশা যেন দুই অসম বয়সী মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। মাছটি যেন কোনো সাধারণ মাছ নয়, বরং স্থানীয়দের কাছে এক রূপকথার মতো রহস্য। পার্গেটরি কোভ বা নরককুণ্ডের মতো বিপজ্জনক পাথুরে খাঁজে নৌকা চালানো কিংবা মাছ ধরার সেই রোমাঞ্চ বিলির কাছে হয়ে ওঠে জীবনের প্রথম রোমাঞ্চকর পাঠ। আর নরমানের কাছে এটি ছিল জীবনের শেষ বেলায় এসে নতুন করে বাবা হওয়ার এক হাতেখড়ি।
কিংবদন্তি অভিনেতা হেনরি ফন্ডার অভিনয় এখানে কোনো পরীক্ষাগারে তৈরি করা কৃত্রিম চমক নয়, বরং এটি তার দীর্ঘ ৫০ বছরের অভিনয় জীবনের এক নির্যাস। অন্যদিকে ক্যাথরিন হেপবার্ন এখানে এক পরম আশ্রয়, যিনি নরমানের খিটখিটে স্বভাব আর তাদের একমাত্র মেয়ে চেলসির দীর্ঘদিনের অভিমানের মাঝে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেন।
বিলি উইলিয়ামসের ক্যামেরার কাজে লেকের শান্ত জল, বুনো হাঁসের ডাক আর পাইন বনের নির্জনতা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এসব দৃশ্যগুলো জীবনের শেষ বিকেলের একাকিত্বকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। তবে সিনেমার গল্পের গতি কিছুটা ধীর এবং এর আবহ সংগীত খুব সাধারণ মনে হতে পারে। আজকের যুগের দ্রুতগতির দর্শকের কাছে তাই সিনেমাটি কিছুটা একঘেয়ে মনে হতে পারে। তবে ধৈর্য নিয়ে গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায় জীবনের শেষবেলার এ ধীরতায় তো বার্ধক্যের আসল ছন্দ।
‘অন গোল্ডেন পন্ড’ শেষ পর্যন্ত কোনো বিষণ্নতার গল্প নয়। এটি ক্ষমার গল্প। চেলসির সেই ব্যাকফ্লিপ ডাইভ দেয়ার দৃশ্যটি ছিল প্রতীকী—বাবার চোখে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করার এক চূড়ান্ত প্রচেষ্টা। সিনেমাটি শেষ হয় নরমান আর ইথেলের একাকী দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যে, যেখানে লেকের জল আগের মতোই শান্ত। নরমানের সেই আকস্মিক বুক ধড়ফড়ানি আর ইথেলের অসহায়ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবন কতটা নশ্বর।
জীবন হয়তো এভাবেই বয়ে যায়—কিছুটা অভিমান আর অনেকখানি ভালোবাসা নিয়ে। স্ট্রেঞ্জার থিংসের হকিংস শহরের সেই রহস্যময় জগতের মতো না হলেও গোল্ডেন পন্ড বা এ সোনালি স্মৃতির পুকুরের শান্ত জগৎ আমাদের হৃদয়ে এক গভীর ছাপ ফেলে যায়। শেষ বিকেলে বুনো হাঁসদের বিদায়ী ডাক যেন আমাদের কানে কানে বলে দেয়, সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সম্পর্কের জমে থাকা ধুলোবালি মুছে ফেলা জরুরি। দিনশেষে আমরা সবাই তো জীবনের কোনো এক সোনালি পুকুর বা লেকপাড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজস্ব কোনো এক স্বপ্ন কিং বা অধরা ওয়াল্টার মাছকে খুঁজে ফিরি।










