তুমি আসবে বলেই জাকির হোসেন ভুল করে ফেলে তালে—গেয়েছিলেন নচিকেতা। কিন্তু জাকির হোসেন তালে ভুল করেছিলেন এমন খবর পাওয়া যায় না। তিনি তবলার সেরা বাদকদের একজন। বলা হয় তবলায় তার স্পর্শ জাদু সৃষ্টি করত। শাস্ত্রীয় সংগীতের আদি আমল থেকে সংগত করতে ব্যবহৃত এ বাদ্য নিয়েই এক জীবন পার করেছেন জাকির। নচিকেতা তার গানে আসলে জাকির হোসেনকে শ্রদ্ধাই জানিয়েছিলেন কেননা জাকির হোসেনের তালে ভুল করা কতটা অসম্ভব, যে ‘তুমি আসবে বলে’ তা হয়েছে।

সে জাকির হোসেন এবার বিদায় নিলেন পৃথিবীর মঞ্চ থেকে। দীর্ঘদিন ধরে রক্তচাপজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। দুই সপ্তাহ ধরে সান ফ্রান্সিসকোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। ভেন্টিলেশনে ছিলেন। অবশেষে রোববার রাতে প্রয়াণ হয় তার। জাকির হোসেনের মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে রোববার রাত থেকে নানা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। মৃত্যুর খবর আসার ২-৩ ঘণ্টা পর তার ভাতিজা জানিয়েছিলেন জাকির হোসেন মারা যাননি। এরপর সোমবার সকালের দিকে পরিবার থেকেই নিশ্চিত করা হয়েছে তিনি আর নেই।

জাকির হোসেনের জন্ম ১৯৫১ সালে মুম্বাইয়ে। তার বাবা ওস্তাদ আল্লা রাখা। তিনিও তবলার বিখ্যাত শিল্পী। একটা সময় তিনি ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খানের সঙ্গে সঙ্গত করতেন। সে সময় এ বিখ্যাত তবলাবাদকের জন্ম। জাকির হোসেনের ভাই তৌফিক কোরেশীর বরাতে জানা যায়, জাকিরের নাম রেখেছিলেন ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান।

তিন বছর বয়সে সংগীত নিয়ে শিক্ষা শুরু জাকির হোসেনের। তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি এমন বাড়িতে জন্মেছিলাম, যেখানে জন্মানোর পর থেকেই তবলা শুনছি। একজন শিল্পীর বাড়িতে আমার জন্ম। ফলে নার্সিং হোম থেকে আসা ইস্তক আমার শিক্ষা শুরু। আমার কাছে তো কোনো বিকল্প ছিল না। ফলে আমার শিক্ষা শুরু হয়েছিল কথা বলতে পারার আগে থেকেই।’ জাকিরকে কোলে নেয়ার পর নাকি আল্লা রাখা প্রার্থনাসূচক কিছু বলার বদলে বলেছিলেন, ‘ধাগে তেটে, ধাগে তেটে, ক্রিধা তেটে।’

বাবার কাছেই জাকির হোসেনের শিক্ষা শুরু। সংগীত শিক্ষার ক্ষেত্রে ছেলেকে তিনি ছাত্রের মতো দেখতেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের নিয়ম মেনেই ছেলেকে শিখিয়েছিলেন আল্লা রাখা। তার ফল তো সারা দুনিয়াই দেখেছে। তবলা, ভারতীয় সংগীতের সঙ্গে নিজেকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে গেছেন জাকির হোসেন।

শাস্ত্রীয় সংগীতে সে সংগত করার বাদ্যযন্ত্রটিকে মূল ধারায় এনেছিলেন জাকির হোসেন। কেবল তার তবলাবাদন শুনতে, হাজার মানুষ লাইন ধরে অপেক্ষা করেছেন। একবার তার একক বাজনা শুনতে গিয়ে টিকিট না পেয়ে নজরুল মঞ্চের মূল প্রেক্ষাগৃহের বাইরে লাগানো বড় জায়ান্ট স্ক্রিনে শীতের রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন দর্শক। সেখানেই পুরো বাজনা শুনেছেন তারা। তাকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাণোচ্ছল তালপুরুষও বলা হয় এ কারণে।

বাংলাদেশেও জাকির হোসেনের ভক্তর সংখ্যা অগণিত। ১৯৭১ সালে ম্যাডিসন স্কয়ারে কনসার্ট ফর বাংলাদেশে অংশ নিয়েছিলেন ওস্তাদ আল্লা রাখা। স্বাধীনতার ৪০ বছর উপলক্ষে ওস্তাদ আল্লা রাখাকে সম্মান জানিয়েছিল বাংলাদেশ। ২০১১ সালে বাবার সম্মাননা স্মারক নিতে ঢাকায় এসেছিলেন জাকির হোসেন।

জীবনে বহু পুরস্কার পেয়েছেন জাকির হোসেন। এর মধ্যে একটি সাম্প্রতিক। সংগীত দুনিয়ার অন্যতম সেরা গ্র্যামি পেয়েছিলেন তিনি ও তার ব্যান্ড শক্তি। এ ব্যান্ডের প্রধান ভোকাল শঙ্কর মহাদেবন। তবলায় ছিলেন জাকির হোসেন। বেহালায় গণেশ রাজাগোপাল অন্য তালবাদ্যে ভি সেলভাগণেশ। গিটারে জন ম্যাকলকলিন। ২০২৩ সালের ৩০ জুন ‘দিস মোমেন্ট’ অ্যালবামটি মুক্তি পায়। মোট আটটি ট্র্যাক রয়েছে এ অ্যালবামে। অ্যালবামের জন্য জাকির হোসেনের হাত ধরে গ্র্যামি গিয়েছিল ভারতে।

নচিকেতার পাশাপাশি জাকির হোসেনের নাম এসেছে কবির সুমনের গানেও। তিনি গেয়েছিলেন—তুই হাততালি দিলে জাকির হোসেন/ তবলা বাজানো ছেড়ে পায়রা পোষেন।

প্রেমিকাকে উদ্দেশ করে প্রেমিকেরা এমন কথা বলেই থাকেন। কিন্তু জাকির হোসেন কখনো তবলা ছাড়েননি। তবলার বোল উঠলে তাই জাকির হোসেনের নামও উচ্চারিত হবে।