দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের অনেকেই সীমানা পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। নিম্নবর্ণের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি অংশ আশ্রয় নেয় পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ পরগণা জেলার দ্বীপ মরিচঝাঁপিতে। সরকারি আশ্বাসে সেখানে বাসাও বাঁধে তারা।

তবে সে আশ্বাস ছিল যেন একটা রাজনীতির অংশ। ভোট শেষ হতেই শুরু হয় উদ্বাস্তু উচ্ছেদ কার্যক্রম। মরিচঝাঁপিতে খাবার-পানি বন্ধ করে দেয়া, ঘরে আগুন দেয়া, নৌকা ডোবানোসহ নির্বিচারে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে সে সময় ভারতের রাজ্য সরকার উদ্বাস্তু উচ্ছেদে মেতে উঠেছিল ।

পরিশেষে ১৯৭৯ সালের ১৬ মে উদ্বাস্তুশূন্য হয় মরিচঝাঁপি। সরকারি হিসাবে, সেখানে মোট নিহতের সংখ্যা মাত্র দুজন হলেও বিভিন্ন হিসাবে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়ায়। গণহত্যার ওই ইতিহাসটিই দৃশ্যমাধ্যমে চিত্রায়ণ করেছেন সুকর্ণ সাহেদ ধীমান। বানিয়েছেন ‘ফেউ’ নামের একটি ওয়েব সিরিজ। গত ৩০ জানুয়ারি চরকিতে মুক্তি পায় এটি।

ফেউয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে এই সময়ে যে কয়জন অভিনেতা নিজেদের দক্ষতা, মেধা ও শক্তিশালী অভিনয় দিয়ে দর্শকের মাঝে নিজের জায়গা গড়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের মধ্যে তিনি একজন। প্রতিটি ফিকশনেই যেকোনো চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার বিরল দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ফেউ তার অন্যতম। সুন্দরবনের মতো শ্বাপদসংকুল জায়গায় শুটিং হয়েছে সিরিজটির। ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। বণিক বার্তার সঙ্গে কথোপকথনে সেসব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।

শুরুতেই ফেউ নিয়ে বলেন, ‘এটা একটা ফ্যান্টাস্টিক আইডিয়া, যা নিয়ে ডিরেক্টর ধীমান কাজ করেছেন। দারুণ অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে কাজটা হয়েছে। এ সিরিজে লোকাল অভিনয় শিল্পীরাও দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। এছাড়া যারা প্রফেশনাল, তাদের কাজও বেশ ভালো হয়েছে। ফেউ ইতিহাসনির্ভর একটা জার্নি। সাইকোলজিক্যাল জার্নি হিসেবেও দুর্দান্ত। একজন অভিনেতা হিসেবে এ ধরনের একটা কাজকে আমি দুর্দান্ত বলে মনে করি। এ ধরনের কাজ আরো অনেক হোক, সেটাই প্রত্যাশা করি।’

মার্শাল নামের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর। এ সিরিজে তার চরিত্র নিয়ে বলেন, ‘একটা চরিত্র যখন আমি করি, তখন সে চরিত্রের আদ্যোপান্ত এক ধরনের সাইকোলজিক্যাল ও ফিজিক্যাল সব ধরনের চিন্তা ভাবনা অ্যানালাইসিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেটা ইতিহাসনির্ভর কাজের জন্য বা অন্য কাজের ক্ষেত্রেও ।

474163174_1142712904526366_7711129214466815991_n

আমি যে চরিত্র করেছি, এটা যে একেবারে ইতিহাসের মোটা দাগের কোনো চরিত্র, এমনটি নয়। আবার একেবারে বিচ্যুতি ঘটেছে, এমনটিও নয়। এ ধরনের চরিত্র আমাদের দেশের ইন্ডাস্ট্রিতে লেখা হয় না বললেই চলে।

ফেউ সিরিজের প্রতিটি চরিত্র ভিন্ন ও আলাদা। বিশেষ করে মার্শাল চরিত্রটি। মার্শালের মতো এমন দারুণ চরিত্র এর আগে আমার আর করা হয়নি।’

ফেউয়ে অভিনয় করতে গিয়ে পড়তে হয়েছে বিষধর রাসেলস ভাইপারের সামনে, জলে দেখতে হয়েছে কুমিরের আস্ফালন। শ্বাপদসংকুল সুন্দরবনে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে এ অভিনেতা বলেন, ‘অভিনয়ের জায়গাটা শ্বাপদসংকুল ছিল। আমরা একটা লঞ্চে থাকতাম। আমার ও তারিক আনাম স্যারের উচ্চতার কারণে সমস্যা হতো। আমরা যে জায়গায় থাকতাম, এটা কুমিরপূর্ণ এলাকা ছিল। কুকুরকে ধরে মুখে করে নিয়ে যাচ্ছে কুমিরের এমন ঘটনা আমরা দেখেছি। এগুলো আমাদের কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। আমরা পুরো টিম কাজের প্রতি এতটা ডুবে গিয়েছিলাম যে এসব কিছুই মনে হয়নি। একটা ভালো কাজের জন্য যখন সব মানুষ একত্র হয় আর একই রকম উদ্যম নিয়ে কাজ করে, তখন বাধাবিঘ্ন তুচ্ছ হয়ে যায়। ফেউয়ের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে।’ সিনেমাটির ক্ষেত্রে অভিনেতা মনে করেন, এর ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হলে দারুণ এক অভিজ্ঞতা হবে এ দেশের মানুষের। কারণ এদের বড় একটি অংশ এখনো জানে না ১৯৭৯ সালের মরিচঝাঁপির ইতিহাস।

এমন সিনেমা বাংলাদেশে আরো বেশি নির্মাণ করার কথা উল্লেখ করে নূর বলেন, ‘এ ধরনের কাজ আমাদের প্রচুর হওয়া উচিত। ভালোভাবে হওয়া উচিত। গবেষণা করে এবং সেটার ভালো প্রি-প্রডাকশন করে তারপর ভালো অভিনয়শিল্পীদের নেয়া উচিত। একটি-দুটি চরিত্রের ওপর ফোকাস না করে সব চরিত্রের ওপর ফোকাস করে যদি গল্পগুলো করা হয়, তাহলে সেটা মানুষের কাছে বেশি পছন্দের হবে।’