চলতি বছর নানা কারণে আলোচনায় ছিল মঞ্চনাটক। মঞ্চায়ন হওয়া নাটকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। এছাড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল কোনো কোনো দলের নাটক মঞ্চায়ন। ‘নিত্যপুরাণ’ মঞ্চে চলতে চলতে বন্ধ করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে বছরটা ভালো যায়নি মঞ্চনাটকের। তবে আগামী বছরের জন্য আশা দেখছেন মঞ্চসংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের প্রায় অর্ধেক সময় অর্থাৎ জুন পর্যন্ত নিয়মিত মঞ্চস্থ হয় নাটক। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পরে ধীরে ধীরে কমতে থাকে নাটক মঞ্চায়ন। সর্বশেষ গত ১৯ জুলাই শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল (পরীক্ষণ) থিয়েটার হলে ম্যাড থেটারের ‘আনা ফ্রাঙ্ক’-এর মঞ্চায়ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাটকটি রাজনৈতিক কারণে আর মঞ্চস্থ হয়নি। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে অবস্থায় থাকাকালে জারি হয় কারফিউ। এর পর থেকে বন্ধ হয়ে যায় শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন ও মহড়াকক্ষ। দীর্ঘ ৮৪ দিন বন্ধের পর গত ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় আবার জাতীয় নাট্যশালার মঞ্চে আলো পড়ে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর শিল্পকলাসহ নাট্যাঙ্গনে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। শিল্পকলার মহাপরিচালকের পদে নিযুক্ত হন জামিল আহমেদ। কিন্তু মঞ্চনাটকের সব স্বাভাবিক হতে শুরু করলে গত ২ নভেম্বর ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা।

11

দেশ নাটক প্রযোজিত নিত্যপুরাণ নাটকের প্রদর্শনী মাঝপথে বন্ধ করে দেয়া হয় সেদিন। কিছু সংখ্যক লোকের প্রতিবাদ ও মবের কারণে সংগঠনটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রদর্শনী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত দেন সৈয়দ জামিল আহমেদ।

এ ঘটনার প্রতিবাদে শিল্পকলা একাডেমির সামনে সমাবেশ করেন শতাধিক নাট্যকর্মী। সমাবেশ চলাকালে কয়েকজন লোক পেছন থেকে ডিম ছুড়ে মারেন। পরে বক্তব্যে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘সভা শেষ করব না। ভেতরে নাটক হবে, বাইরে আমরা পাহারা দেব।’ পরে গত নভেম্বরে একই মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় ‘নিত্যপুরাণ’।

দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মঞ্চে নাটক বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলিয়ে সমস্ত চড়াই-উতরাইয়ের মাঝেও চলতি বছর মঞ্চে এসেছে ২৪টি নতুন নাটক। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৩। তার আগের বছর অর্থাৎ করোনার পরের বছর ছিল ৩৪টি নতুন নাটক। গত দুই বছরের তুলনায় এবার অনেক কম নাটক এসেছে। এ বছর বলার মতো তেমন আলোচিত নাটক আসেনি।

চলতি বছর ঘুরেফিরে যে কয়টি নাটক এসেছে তার মধ্যে বাতিঘরের নাটক ‘প্যারাবোলা’ দেশ নাটকের ‘পারো’, আরণ্যকের ‘কম্পানি’, অনুস্বরের নাটক ‘মহাশূন্যে সাইকেল’ ও ‘বিবিধ শোক অথবা সুখ’, ‘প্রাঙ্গণেমোরের ‘টিনের তলোয়ার’, নবরস নৃত্য ও নাট্যদলের ‘উনপুরুষ’, অ্যাক্টোমেনিয়ার ‘দ্য ম্যান আউটসাইড’, নাট্যহীত চট্টগ্রামের ‘মেয়েটি’, ফেইমের ‘খোঁজ’ এবং স্বপ্নঘুরি রেপার্টরির নাটক ‘বোধ’। এর মধ্যে কিছু নাটকের শো হয়েছে একেবারেই কম।

এদিকে গত নভেম্বরে নাটকের শিক্ষক শাহমান মৈশানের নির্দেশনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হয়ে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গিয়ে শেষ হওয়া গণপরিবেশনা ‘লাল মজলুম’ বেশ সাড়া ফেলে। এতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত স্মৃতিসহ গণমানুষের ওপর নির্যাতন, সংগ্রাম ও গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে।

12

এ বছর এত হতাশার মাঝেও কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে নতুন কিছু নাটক। মঞ্চে এ বছর তুলনামূলক রেপার্টরি দলের কার্যক্রম বেশি ছিল। নাট্যাঙ্গনে তরুণরা এসেছেন নতুন উদ্যমে।

এসেছে নতুন নেতৃত্ব। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, সামনের বছর এ অঙ্গনে সুদিন ফিরবে। ২০২৪ সালের মঞ্চনাটকের সার্বিক মূল্যায়ন নিয়ে নাট্যকার, অভিনেতা ও পরিচালক মামুনুর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছরের শুরুটা ভালোই হয়েছিল, কিন্তু মাঝখানে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নাটক বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল। আমরা সবাই এ বিষয়ে খুব চিন্তান্বিত ছিলাম। এরপর নিত্যপুরাণ নাটকটি মঞ্চায়ন শুরু করেছিলাম, তারপর যা হলো সবাই জানে। নাটক নিয়ে আমি একটু চিন্তিত। কারণ এ সমস্ত ঘটনার পর দর্শকও প্যানিক হয়ে গেছে। প্রত্যাশিত দর্শক মঞ্চে নাটক দেখতে আসছে না। দর্শককে মঞ্চে ফেরাতে হলে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। এরই মধ্যে শুনেছি ঢাকা মহানগরের নাট্যদলগুলো গত ফেব্রুয়ারিতে একটা উৎসব করতে চাচ্ছে। যদি এটা হয়, তাহলে হয়তো নাটকে দর্শক বাড়বে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের সহযোগিতার প্রয়োজন। যদি জনজীবনে নিরাপত্তা ফিরে আসে, তাহলে আমরা আশা করি যে আগামী বছর মঞ্চনাটকে সুবাতাস ফিরে আসবে।’

শিল্পকলার মহাপরিচালক সৈয়দ জামিলের সহযোগিতা কামনা করে মামুনুর রশিদ বলেন, ‘মঞ্চ নিয়ে আমরা যে পদক্ষেপগুলো নিতে যাচ্ছি, আশা করছি এ বিষয়ে সৈয়দ জামিল আমাদের সহযোগিতা করবেন।’

২০২৪ সালের মঞ্চনাটকের অবস্থা মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাট্যনির্দেশক রামেন্দু মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে দর্শকের স্বল্পতা। দীর্ঘদিন মঞ্চনাটক বন্ধ থাকার পর মাঝখানে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যাওয়ায় শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকের দর্শক কমে গেছে। আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে শিল্প কলায় তিনটা হলে যেখানে প্রতিদিন নাটক হতো, এখন একটা হলেও প্রতিদিন নিয়মিত নাটক হয় না। নাট্যকর্মীরাও অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন, অনেকেই উদ্যম হারিয়ে ফেলছেন। মঞ্চসংশ্লিষ্টদের মধ্যে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি নাট্যচর্চার জন্য খুবই ক্ষতিকর। আমি চাইব, সবাই যদি খোলা মন নিয়ে একসঙ্গে নাট্যচর্চা করেন, তাহলে মঞ্চাঙ্গনের সংকটগুলো কাটানো যাবে।’