পুত্র হুমায়ূনের প্রবল অসুখের সময় তার বিছানার চারপাশে ঘুরে তিনি স্রষ্টাকে বললেন তার জীবন নিয়ে যেন পুত্রের জীবন ফেরত দেন মহামহিম। হুমায়ূন সেরে উঠলেন, অসুখে পড়লেন বাবর। মারা গেলেন তারপর। এ নিয়ে অনেক গল্প লেখা হয়েছে, কবিতায় এসেছে। শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতাটি এক্ষেত্রে অসাধারণ। তিনি লিখেছিলেন, ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও/ আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক। কিন্তু উইলিয়াম শেকসপিয়র এমন প্রার্থনা করতে পারেননি। তার ১১ বছর বয়সী পুত্র হ্যামনেট স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-এভনে যখন মারা যায়, শেকসপিয়র তখন লন্ডনে। বাবরের সঙ্গে শেকসপিয়রের মিল নেই। বরং যমজ বোন জুডিথকে বাঁচাতে হ্যামনেটই ঈশ্বরকে বলেছিল, আমার জীবন নাও, ওকে বাঁচতে দাও।
২০২০ সালে প্রকাশ হয় ম্যাগি ও’ফ্যারেলের উপন্যাস ‘হ্যামনেট’। প্রসঙ্গ—শেকসপিয়র পুত্র হ্যামনেট, শেকসপিয়র ও তার স্ত্রীর সম্পর্ক এবং শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’ লেখা। ফ্যারেলের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমায়ও এ বিষয়গুলোই এসেছে। সিনেমায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছেন অ্যাগনেস শেকসপিয়র। মূলত পরিচালক ক্লোয়ি ঝাও মাত্র ১৮৫ মিনিটের মধ্যে প্রথমে শেকসপিয়র-অ্যাগনেসের প্রেম, লেখক শেকসপিয়রের প্রতি তার দায়িত্ববোধ, অ্যাগনেসের মাতৃত্ব, শেকসপিয়রের লেখকসত্তা, হ্যামনেটের জন্য তাদের দুজনের শোকের ভিন্নতা ও সর্বশেষ লন্ডনের ওপেরা হাউজ উঠে এসেছে।

সিনেমা শুরু হয় অ্যাগনেসকে দিয়ে। বাজ হাতে সবুজ শ্যামলিমার মধ্য দিয়ে লাল পোশাকে হেঁটে আসা জেসি বাকলিকে দেখে প্রথমেই দর্শক একটা হার্টবিট মিস করবে। তার লাল পোশাকের মধ্যে আছে এক তীব্রতা। সবুজ প্রকৃতির মধ্যে স্বচ্ছন্দ সে। লোকে বলে সে নাকি জঙ্গলের এক ডাইনির কন্যা। হাত ধরে মানুষের ভবিষ্যৎ দেখতে পারে অ্যাগনেস। লতাপাতা বেটে তৈরি করতে পারে ওষুধ। সেই অ্যাগনেসের পোশাক প্রায় পুরোটা সময় লাল বা অরেঞ্জ হিউ। বিপরীতে উইলিয়াম পরে ছাইরঙা বা কালোর কাছাকাছি রঙের পোশাক। তাদের দুজনের বৈপরীত্য প্রকাশিত তাদের পোশাকেও।
অ্যাগনেসের সঙ্গে উইলের প্রেম তৈরি হয় দ্রুত। তারা প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ পেলে মিলিত হয়। উইলের পরিবার পছন্দ করে না অ্যাগনেসকে। কিন্তু সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়লে উইলের সঙ্গে অ্যাগনেসের বিয়ে হয়। তারা উইলের পরিবারের সঙ্গে থাকতে শুরু করে। অ্যাগনেস তার প্রথম সন্তানটিও জন্ম দেয় প্রকৃতির মধ্যে। কন্যা সন্তান।
দ্বিতীবার সন্তানসম্ভবা যখন অ্যাগনেস, উইলিয়াম ততদিনে তার লেখা নিয়ে ‘স্ট্রাগল’ করছে। উইলের বাবা চায় সে বাবার সঙ্গে কাজ করুক। ওই সময় অ্যাগনেসই উদ্যোগী হয়ে উইলিয়ামকে লন্ডন পাঠায়। একাই জন্ম দেয় যমজ দুই সন্তান, একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। মেয়েটি শারীরিকভাবে দুর্বল। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে অ্যাগনেসের চেষ্টার শেষ নেই। সে কারণে শেকসপিয়রের সঙ্গে লন্ডনেও যেতে চায় না অ্যাগনেস। তার ধারণা লন্ডনের আবহাওয়ায় মেয়েটা বাঁচবে না। কিন্তু ১১ বছর বয়সে একদিন প্রচণ্ড জ্বরে পড়ে সে। অ্যাগনেসের সব চেষ্টা ব্যর্থ হতে শুরু করে। শেষ রাতে যমজ বোন জুডিথের কপালে কপাল ঠেকিয়ে প্রার্থনা করে হ্যামনেট। জুডিথ বেঁচে যায়, চলে যায় হ্যামনেট।
এ সিনেমার প্রতিটা ফ্রেম অসাধারণ। প্রকৃতির চিত্রায়ণ থেকে শুরু করে চরিত্রগুলোর পরস্পরের সম্পর্কের রসায়ন কোনো উচ্চকিত স্বর ছাড়াই গভীরভাবে ধরা দেয় দর্শকের কাছে। জেসি বাকলি প্রথম থেকেই অ্যাগনেস চরিত্রে রহস্য ও সাবলীলতা নিয়ে অভিনয় করেছেন। উইল চরিত্রে পল মেসকাল তার সিনেমার চরিত্র অনুসারে কিছুটা নীরব। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্ক, সন্তানদের সঙ্গে তার যোগাযোগ সাবলীল এবং খুবই বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু এ সবকিছু ছাড়িয়ে যায় সিনেমার মাঝ বরাবর। জুডিথের অসুস্থ হওয়া থেকে হ্যামনেটের মৃত্যু অবধি সময়টা সম্ভবত ১০-১৫ মিনিটের। পুরোটা সময় জেসি বাকলি যে অসাধারণ অভিনয় করেছেন, দর্শকের পক্ষে চোখ সরানো সম্ভব নয়। আরো অবাক হতে হয় যখন ১২ বছর বয়সী জ্যাকবি জুপ ওই মৃত্যুর দৃশ্যকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। এ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও একটি মৃত্যুর দৃশ্য দর্শককে কাঁদতে বাধ্য না করলেও শ্বাসরোধ করে।
সন্তানের মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে তৈরি হয় টানাপড়েন। অ্যাগনেসের সঙ্গেও তা হয় উইলের। একে তো সন্তানের মৃত্যু। সেই সন্তানের জন্ম ও মৃত্যু দুই সময়ই দূরে ছিল স্বামীটি। অ্যাগনেস বুঝতে পারে না তার স্বামীর মধ্যে কী চলছে। বুঝতে চায়ও না সে। উইল ফের চলে যায় লন্ডনে।
হ্যামনেটের মৃত্যু পর্যন্ত সিনেমার গল্পটা অ্যাগনেসের। দর্শক এ সময় কিছুটা হলেও থমকে গিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য হবে, শেকসপিয়র কেন এত ইনঅ্যাক্টিভ? কিন্তু এখানেই ক্লোয়ি ঝাওয়ের মুনশিয়ানা। হ্যামনেটের মৃত্যুর পর গল্পটা উইলের হয়ে উঠতে শুরু করে। উপন্যাসে ম্যাগি লিখেছেন, লন্ডনে নিজের ঘরে স্বপ্ন দেখেন শেকসপিয়র। একটা পুরনো ঘরে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে হ্যমনেট। সিনেমায়ও এ দৃশ্য আছে, তবে শেকসপিয়রের স্বপ্ন সেখানে নেই। কিন্তু ক্লোয়ি দেখান, সন্তানের জন্য শেকসপিয়রের বেদনা। তিনিই ছেলেকে বলে গিয়েছিলেন, ‘তোমাকে সাহসী হতে হবে। মা ও বোনকে দেখে রাখতে হবে।’
পল মেসকাল খুবই পরিমিতিবোধ রেখে অভিনয় করেছেন। করেছেন জেসি বাকলিও। তবে তাদের অভিনয়ের পাশাপাশি পোশাক, চুলের স্টাইল, শরীরের ক্ষতচিহ্ন দিয়ে অনেককিছু বোঝানো হয়েছে। অ্যাগনেসের উজ্জ্বল পোশাকের বিপরীতে উইলের ছাইরঙা পোশাক তার অন্তর্মুখী চরিত্র ও পরবর্তী সময়ে লন্ডনের কালো সৈকত তার বেদনাকে প্রকাশ করে। সেই সঙ্গে রিহার্সেলে অভিনেতাদের সংলাপ শেখানোর সময় নিজের সংলাপ বলতে গিয়ে ওই সংলাপে মানসিক যাতনা প্রকাশ হয় তার। এ সবই ক্লোয়ি ঝাওয়ের পরিচালনার গুণ।
সিনেমাটি শেষ হয় হ্যামলেটের মঞ্চায়ন দিয়ে। অ্যাগনেস শুরুতে বুঝতে পারে না এ নাটকের সঙ্গে তার ছেলের সম্পর্ক কী। কেনই বা তার ছেলের নামের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখা হলো। কিন্তু স্ট্র্যাটফোর্ড আপন এভনের বাগান আর পুত্রের সঙ্গে কথা বলার জন্য প্রেতাত্মা হয়ে ফিরে আসা পিতার মর্মবেদনা অ্যাগনেসকে বোঝায় কিং হ্যামলেট আসলে শেকসপিয়র নিজেই। তীব্র বেদনাবোধ থেকেই এ নাটক রচনা করেছেন পিতা। তাই নাটকটির শেষ দৃশ্যে হ্যামলেটের মৃত্যুতে দর্শকের সঙ্গে অ্যাগনেসও একাত্ম হয় হ্যামলেটের সঙ্গে।










