১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা। বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষায় এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অংশেই হিট হয় সিনেমাটি। কিন্তু পরিচালক খান আতাউর রহমানের সিনেমাটি ছিল সাদাকালো। সে শূন্যতাটুকু পূরণেই রঙিন পর্দায় সিরাজউদ্দৌলাকে দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন পরিচালক প্রদীপ দে। কিন্তু দুই দশক আগে আনোয়ার হোসেন যেভাবে সিরাজ চরিত্রে নিজেকে কাল্ট হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন, সেখানে অন্য মুখ আনা যথেষ্ট কঠিন। সে কঠিন কাজটার জন্যই ডাক পেলেন প্রবীর মিত্র। ব্যক্তিগতভাবেই তিনি ক্যারিয়ারে আনোয়ার হোসেনকে ওস্তাদ মান্য করতেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেল দ্রুত। রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুক্তি পায় ১৯৮৯ সালে। অসাধারণ অভিনয়ের জন্য প্রশংসায় ভাসলেন প্রবীর মিত্র।
ঢাকাই চলচ্চিত্রের সে সিরাজউদ্দৌলা প্রবীর মিত্র গত রোববার রাতে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪। হাঁটুর সমস্যার কারণে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন। সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। তার সঙ্গে শেষবার আড্ডাও দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষমেশ তা আর হলো না। তার স্ত্রী নাজমুন্নাহার মারা গেছেন ২০০০ সালে আর ছোট ছেলে আকাশ মারা গেছে ২০১২ সালে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয় থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছিলেন প্রবীর মিত্র। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নামক চলচ্চিত্রেই ছিল তার শেষবারের মতো অভিনয়।

শুধু সিনেমাপ্রেমী দর্শকের কাছেই নয়, প্রবীর মিত্র সহকর্মীদের কাছেও ভীষণ প্রিয় ছিলেন। সবসময়ই সাদাসিধে জীবন পছন্দ ছিল তার। যে কারণে উচ্চাভিলাষ তাকে কখনই পেয়ে বসেনি। প্রবীর মিত্রর ভাষায় তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ‘রিমারকেবল’ ছবি ‘নয়নের আলো’। সুমিতা দেবী এ ছবিতে প্রবীর মিত্রর অভিনয় দেখে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না পাও তাহলে অভিনয় ছেড়ে, এ দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেও’। কিন্তু জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না মিললেও প্রবীর মিত্র তার দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে, ভালোবাসার জায়গা থেকে অভিনয়ই করে গেলেন আজীবন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সে ছবিতে না পেলেও পরে তিনি মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘বড় ভালো লোক ছিল’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পেয়েছিলেন।
একবার রাজেশ খান্না ও শাবানাকে নিয়ে প্রমোদ চক্রবর্তী ‘বিরোধ’ ছবিটি নির্মাণের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকায় এসে তিনি প্রযোজক হাবিবুর রহমানের কাছে ঢাকার কয়েকটি ছবি দেখতে চাইলেন। তখন তাকে ‘নয়নের আলো’ ও ‘ছুটির ঘণ্টা’ এ ছবি দুটো দেয়া হয়। দুটি ছবিই প্রমোদ চক্রবর্তী মনোযোগ দিয়ে দেখেন। ফেরার সময় বিমানবন্দরে হাবিবুর রহমানকে বলছিলেন, ‘নয়নের আলো ছবির সেকেন্ড হাফ আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। প্রবীর মিত্রকে আমাকে দিয়ে দেন।’ জবাবে তখন হাবিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘সে তো অনেক ব্যস্ত। যেতে পারবে না।’

পরবর্তী সময়ে প্রমোদ চক্রবর্তীর সঙ্গে বোম্বেয় শুটিং করতে শাবানাও যান। তার কাছেও প্রমোদ চক্রবর্তী প্রবীর মিত্রর না যাওয়া নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। একদিন এমএ সামাদ পরিচালিত ‘শিরী ফরহাদ’ ছবির শুটিংয়ের সময় বিএফডিসির ৪ নম্বর ফ্লোরের মেকআপ রুমে মেকআপ নিচ্ছিলেন প্রবীর মিত্র। তাকে দেখে শাবানা চিৎকার দিয়ে উঠলেন। প্রবীর মিত্র খানিকটা ভয় পেয়ে এফডিসির পুকুর পাড়ে শুটিংয়ে চলে গেলেন। সেখানে শাবানা তাকে দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, ‘প্রমোদ চক্রবর্তী আপনাকে ডাকলেন আর আপনি গেলেন না! এটা কী করে মেনে নিই!’ প্রবীর মিত্রকে ঘিরে এতসব ঘটনা বেলাল আহমেদের নয়নের আলো ছবির জন্যই।
চলচ্চিত্রে প্রবীর মিত্রের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। মূলত ছবিতে কাজের ব্যাপারে তার বন্ধু এটিএম শামসুজ্জামানই তাকে সহযোগিতা করেছিলেন। জলছবির পর নায়ক হিসেবে প্রবীর মিত্র ‘চাবুক’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘জালিয়াত’, ‘তীর ভাঙ্গা ঢেউ’, ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ‘রামের সুমতি’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’সহ আরো বেশকিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন। তবে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জীবন তৃষ্ণা’ ছবিতে শিল্পী আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘এ আঁধার কখনো যাবে না মুছে আমার পৃথিবী থেকে’ গানটি তাকে ব্যাপকভাবে পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৮২ সালে তিনি মহিউদ্দিন পরিচালিত বড় ভালো লোক ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এরপর আরো বহু চলচ্চিত্রে তিনি অনবদ্য অভিনয় করেছেন। ভাগ্যে জোটেনি আর কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। তবে চলচ্চিত্রে ‘আজীবন সম্মাননা’ পেয়েছেন তিনি ২০১৮ সালে। আরো পেয়েছেন প্রযোজক সমিতি অ্যাওয়ার্ড, জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট সম্মাননা, মাদার তেরেসা স্মৃতি পদক-২০১৭, বাবিসাস সম্মাননা ২০০৮ ও ২০১০, এজেএফবি স্টার অ্যাওয়ার্ড, জাগো বাংলা সম্মাননা, আমরা কুঁড়ি সম্মাননা, মহানগরী অ্যাওয়ার্ড, দর্শক ফোরাম অ্যাওয়ার্ড, ঢাকা কালচারাল রিপোর্টারস ইউনিটি অ্যাওয়ার্ডসহ আরো বহু সম্মাননা।
১৯৪১ সালের ১৮ আগস্ট চাঁদপুরে মামার বাড়ি জন্মগ্রহণ করেন প্রবীর মিত্র। তার নাম প্রবীর কুমার মিত্র। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। স্কুল জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তার পর থেকে বৃদ্ধাশ্রম সিনেমার মুক্তি পর্যন্ত তার সফর ছিল বর্ণাঢ্য, যিনি চলচ্চিত্রকে আপন করে নিয়েছিলেন। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তার নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে।










