সিনেমার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন বহু নির্মাতা। কেউ নির্মাণ, কেউ গল্প বলার মাধ্যমে। ইতিহাসের শুরু থেকেই সিনেমা বদলে গেছে ভিন্ন ধারা, দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গির নির্মাতাদের হাতে। এ নির্মাতাদের ইতিহাসে আবার বিশেষভাবে উল্লিখিত হয় বেলা তারের নাম। হাঙ্গেরির এ নির্মাতা তার নির্মাণ, গল্প বাছাই ও গল্প উপস্থাপনের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। সর্বশেষ তিনি সিনেমা (তথ্যচিত্র) নির্মাণ করেছেন ২০১৯ সালে। এবার বিদায় নিলেন জীবনের লাইট ক্যামেরা অ্যাকশনের জগৎ থেকে। হাঙ্গেরির এ চলচ্চিত্র নির্মাতা মারা গেলেন গতকাল।

হাঙ্গেরির জাতীয় সংবাদ সংস্থা এমটিআই গতকাল সকালে বেলা তারের পরিবারের পক্ষ থেকে চলচ্চিত্রকার বেঞ্চে ফ্লিগাউফের মাধ্যমে তারের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করে। ইউরোপীয় ফিল্ম একাডেমিও গতকাল বিকালে এক ই-মেইলে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। একাডেমির ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা তারের ‘দীর্ঘ ও গুরুতর অসুস্থতার পর’ মৃত্যু হয়েছে।

10

১৯৫৫ সালে হাঙ্গেরির পেচ শহরে জন্ম এ চলচ্চিত্র নির্মাতার। তিনি কর্মজীবন শুরু করেন বালাজ বেলা স্টুডিওতে। এটি হাঙ্গেরির পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্টুডিও। সেখানেই তিনি তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ফ্যামিলি নেস্ট (১৯৭৭) পরিচালনা করেন। ফ্যামিলি নেস্ট চলচ্চিত্রটির জন্য দার মানহাইম চলচ্চিত্র উৎসবে গ্রাঁ প্রি লাভ করেন। এরপর তিনি বুদাপেস্টের একাডেমি অব থিয়েটার অ্যান্ড ফিল্মে ভর্তি হন।

১৯৮২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর টারশুলাশ ফিল্ম স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন বেলা তার। সেখানে তিনি ১৯৮৫ সালে স্টুডিওটি বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত কাজ করেন। ১৯৮৮ সালে তার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ড্যামনেশন বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং ইউরোপীয় ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে তিনি ‘বেস্ট ইয়াং ফিল্ম’ পুরস্কার পান।

তার মোট নয়টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। তার শেষ ফিচার ফিল্ম দ্য তুরিন হর্স (২০১১) বার্লিনে জুরি প্রাইজ জিতে নেয়। তবে তিনি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পরিচিত ১৯৯৪ সালের চলচ্চিত্র ‘শ্যাতানতাঙ্গো’র জন্য। সিনেমাটি লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। দৈর্ঘ্য ৪৫০ মিনিট। সিনেমাটি বার্লিনে প্রদর্শিত হওয়ার পর দ্রুতই কাল্ট মর্যাদা লাভ করে। এটি প্রায়ই নব্বইয়ের দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং সমসাময়িক ‘স্লো সিনেমা’ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবেও বিবেচিত। ২০১৯ সালে সিনেমাটির একটি ফোরকে পুনরুদ্ধার সংস্করণ ৬৯তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়।

11

গত কয়েক বছরে তার একাধিক চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যার মধ্যে রয়েছে ফিল্ম একাডেমি বিএডব্লিউ লুডভিগসবুর্গ, লে ফ্রেনোয়া-স্টুডিও নাসিওনাল দে আর কঁতঁপোরাঁ, লিল ও ফ্রিস্‌জেফে বুদাপেস্ট। ২০২৩ সালে তিনি ইউরোপীয় ফিল্ম একাডেমির সম্মানসূচক পুরস্কার লাভ করেন।

বেলা তারের সিনেমা নিয়ে আলাদা করে আলোচনা করতে হয়। তার সিনেমা মূলধারার বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে মানবজীবনের নিরাশা, নিঃসঙ্গতা, সময়ের স্থবিরতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের গভীর অনুসন্ধান করে। ধীরগতির বর্ণনা, দীর্ঘ শট, সাদাকালো চিত্রগ্রহণ ও দার্শনিক আবহ এ বৈশিষ্ট্যগুলোর মাধ্যমে তিনি সমসাময়িক ‘স্লো সিনেমা’ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

বেলা তারের প্রারম্ভিক চলচ্চিত্রগুলো ছিল তুলনামূলক বাস্তবধর্মী ও সামাজিক বাস্তবতার কাছাকাছি। ফ্যামিলি নেস্ট (১৯৭৭) ও দ্য আউটসাইডার–এর মতো সিনেমায় তিনি হাঙ্গেরির শ্রমজীবী মানুষের পারিবারিক টানাপড়েন, দারিদ্র্য ও সামাজিক সংকট তুলে ধরেন। তবে আশির দশকের শেষ দিক থেকে তার চলচ্চিত্র ভাষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ড্যামনেশন (১৯৮৮) থেকে বেলা তারের সিনেমা ক্রমে আরো বিমূর্ত, দার্শনিক ও রূপকধর্মী হয়ে ওঠে।

বেলা তারের নির্মাণশৈলীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার দীর্ঘ টেক বা লং শট ব্যবহার। অনেক সময় একটি দৃশ্য কয়েক মিনিট ধরে চলতে থাকে, যেখানে ক্যামেরা ধীরে ধীরে চরিত্র বা পরিবেশকে অনুসরণ করে। এ কৌশল দর্শককে কাহিনীর চেয়ে সময়ের অভিজ্ঞতার ভেতর প্রবেশ করায়। তার সিনেমায় সম্পাদনা খুবই সীমিত; বরং ক্যামেরার চলাচল ও দৃশ্যের ভেতরের গতিই গল্প বলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সাদাকালো চিত্রগ্রহণ, যা তার সিনেমাকে আরো বিষণ্ন ও চিরন্তন আবহ দেয়।

শ্যাতানতাঙ্গো (১৯৯৪) বেলা তারের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র। কেবল দৈর্ঘ্যের জন্য নয়, বরং এর বর্ণনাশৈলী ও দার্শনিক গভীরতার জন্য চলচ্চিত্র ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সিনেমায় মানুষের আশা, বিশ্বাসভঙ্গ ও নৈতিক পতনের এক অন্ধকার জগৎ ফুটে ওঠে।

তারের শেষ ফিচার ফিল্ম দ্য তুরিন হর্স (২০১১) যেন এক প্রকার বিদায়ী বক্তব্য। এখানে জীবনের পুনরাবৃত্তি, ক্লান্তি ও অস্তিত্বের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর অনুভূতি অত্যন্ত সংযত ও শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এ সিনেমার পর বেলা তার ফিচার ফিল্ম নির্মাণ থেকে সরে দাঁড়ান।

সব মিলিয়ে, বেলা তারের সিনেমা সহজ দর্শন সুখের জন্য নয়; বরং ধৈর্য, মনোযোগ ও ভাবনার দাবি রাখে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে চলচ্চিত্র কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয়, বরং সময়, নীরবতা ও মানব অস্তিত্ব নিয়ে গভীর দার্শনিক অনুসন্ধানের এক শক্তিশালী শিল্পরূপ।